তাপসী বিশ্বাস
-” হ্যাঁগো,নন্দ ঢাকী তো এ বছরও এলো না! পঞ্চমীর বিকেল গড়াতে চললো।”
রাজলক্ষ্মী দেবী যাঁর উদ্দেশ্যে বললেন সেই হরনাথ বাবু খবরের কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বললেন,
” তাই তো দেখছি।পরপর দু বছর এলো না।আর হয়তো কলকাতায় বাজাতে আসবে না। বাজানো ছেড়ে দিতেও পারে। চাষবাস নিয়েই আছে নিশ্চয়ই। আমাদের মোবাইল নম্বর তো ওর কাছে নেই।ল্যান্ড লাইন ছেড়ে দিয়েছি।হয়তো তাই কোনো খবর দিতে পারে নি “
প্রত্যেক বছর নন্দ ঢাকী পাড়ার বারোয়ারী পুজোয় ঢাক বাজাতে আসে। হরনাথ বাবুর সাবেকী বাড়ির একতলার একটি ঘরে ঐ ক’দিন রাত্রি বাস করে। একসময়ে একতলার ঐ অংশে চাকর বাকরেরা থাকতো।দশমীর বিসর্জনের পর নন্দ তার পোঁটলা পুঁটলি ঐ ঘরে রেখে আরো অন্য কোথাও বাজানোর বরাত খুঁজতে বের হয়।অনেক পুজো কমিটি একাদশী, দ্বাদশীতে বিসর্জন দেয়।তারা তখন বাড়তি ঢাকী নেয়।লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন নন্দ পোঁটলা নিয়ে বিদায় নেয়।নন্দর মতো অনেক ঢাকী সংগ্রহ করা জামা কাপড় , টাকা পয়সা নিয়ে ট্রেনে উঠে গ্রামে ফিরে যায়। ঐ ক’দিনের রোজগার ওদের মুখে হাসি ফোটায়। হত দরিদ্র সংসারে ক’দিনের জন্য লক্ষ্মীর আগমন ঘটে।
হরনাথ বাবুর বাড়িতে আগে জগদ্ধাত্রী পুজো হতো।তখন বাড়ি ছিলো জমজমাট।সেই সময়ে ছিদাম ঢাকী আসতো মুর্শিদাবাদের গ্রাম থেকে।নন্দ তখন বাপের সাথে কাঁসি বাজাতো।নিতান্তই ছোট ছেলে।বাপের হাত ধরে আসতো।হরনাথের বাবার মৃত্যুর পর ঐ পুজো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।তবে নন্দর আসা বন্ধ হয় নি।ছিদাম মারা গেলো।নন্দ কাঁসি ছেড়ে ঢাক ধরলো। ।পুজোয় কলকাতায় ঢাক বাজাতে আসতে শুরু করলো।
হরনাথ বাবুর বাড়ির লোক সংখ্যা কমতে কমতে এখন মাত্র দুজনে এসে ঠেকেছে।হরনাথ বাবুর দাদা শম্ভুনাথ মারা গেছেন।ভাইপো বিদেশ বাসী।দেশে আর ফিরবে বলে মনে হয়।নিজের ছেলে হায়দরাবাদ আর মেয়ে আমেরিকায়। বাড়ি আগলে বসে আছেন হরনাথ বাবু।তবে এ বাড়িও আর বেশিদিন নেই।হরনাথের পর কে আর দেখাশোনা করবে? বিক্রি হয়ে বহুতল হবে এখানে।
ছেলে সৌমাভ হায়দরাবাদে ফ্ল্যাট কিনেছে।ভাইপো নীলাভ মা মারা যাবার পর আর দেশে আসেনি।ওদেশের মেয়ে বিয়ে করে ওখানের স্থায়ী বাসিন্দা।মেয়ে তিন চার বছর পর একবার আসে। সৌমাভ তিন বছর আসে নি।এবার খুব আশা ছিলো পুজোয় আসবে।কিন্তু শেষ সময়ে জানালো ওরা মালদ্বীপ বেড়াতে যাচ্ছে। নাতনি খুশীর জন্য মন খারাপ লাগে।পাঁচ বছরের মেয়ে কথায় পন্ডিত। দেখতে যেন পরীটি।ওরা আসলে বাড়িটা আলো হয়ে যায়।তিন বছর আগে এসেছিলো।হরনাথ আর রাজলক্ষ্মী গিয়েছিলেন এই বছরের গোড়ার দিকে। পাখির ডানায় ভর করে দিনগুলো কেটেছিলো।পুজোয় ওরা আসবে বলে রাজলক্ষ্মী খুশীর কত জামা কিনেছেন,খেলনা কিনেছেন।আসবে না শুনে মন ভেঙে গেছে।পুজোয় কোন আনন্দ নেই।এই বয়সে আপন জনরা কাছে থাকলেই আনন্দ।
—” মা জননী, দরজা খোলো। ” দরজায় কড়া নাড়লো নন্দ।
” ঐ নন্দ এলো।”
হরনাথ বাবু দরজা খুললেন।
নন্দ ঘরে ঢুকলো।সাথে বছর ছয় সাতের ছোট একটি মেয়ে। রোগা পাতলা।শ্যামলা গায়ের রঙ।লাল আর হলুদ ফুল ছাপা ছিটের ফ্রক গায়ে।বোতাম নেই জামায়।সেফটিপিন আটকানো।জামার ঝুল হাঁটু ছাড়িয়ে।মাথার চুলে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। লালচে চুলে তেল পড়েনি।রুক্ষ।
–” এলাম গো মা।”
হরনাথ বললেন,
” এই মেয়েটি? “
“আমার মেয়ে গো, কাকা।ওর মা মরে গেলো গত বছর। জ্বর আর শ্বাসকষ্ট ছিলো। কিছু করতে পারলাম না। মা মরা মেয়ে। সাথে করে নিয়ে এলাম। “
নন্দর গলায় মুর্শিদাবাদী টান।
–“তুই তো মাঠে কাজ করিস।ওকে দেখে কে?”– রাজলক্ষ্মী জিজ্ঞেস করলেন।
—” আমার দাদার বাড়ি পাশেই।আমার বৌদি মানে ওর জ্যেঠিমা ওকে দেখে।কিন্তু এবার বৌদি বললো,’ নন্দ,ওকে সাথে করে নিয়ে যা।আমি এতো দায়িত্ব নিতে পারবো না।’ মা নেই।কার কাছে রাখবো! তাই নিয়ে এলাম।আমার সাথে কাঁসি বাজাবে।”
–” ততোটুকু মেয়ে,ও আবার কি কাঁসি বাজাবে? ওর নাম কি? “
–“ওর নাম উমা গো, মা। দেশের অবস্থা ভালো না।পরাণের মেয়েটা কেলাস টেনএ পড়তো।নিখোঁজ। পরে পাওয়া গেলো পাট খেতের মধ্যে।মেয়েটাকে নিয়ে খুব চিন্তা গো মা।সাথে করে নিয়ে এলাম। তুমি ক’টা দিন রাতে থাকতে দাও।আমার সাথে নীচের ঘরে থাকবে।তোমার কোন অসুবিধা করবে না গো মা।মেয়েটা আমার খুব শান্ত।”
রাজলক্ষ্মীর খুব বিরক্ত লাগছিলো।অতো ছোট মেয়ে।কি করে পুজোয় কাঁসি বাজাবে! পুজোয় বাজাতে গেলে ভোরে উঠতে হবে,রাত হবে ঘুমোতে।নন্দর আক্কেলের বলিহারি! তাছাড়া এই বয়সী বাচ্চা মেয়ের ঝক্কি আছে।এই ঝক্কি সামলানোর বয়স তাঁর নেই।বাচ্চাটার যা চুলের অবস্থা, উঁকুন আছে কি না কে জানে!
–” যা নন্দ, হাত মুখ ধুয়ে আয়।মেয়েটাকে হাত পা ধুইয়ে নিয়ে ওপর তলায় আয়।আমি খাবার ব্যবস্থা করি।”
রাজলক্ষ্মী দেবী প্রেসার কুকারে ভাত বসালেন।ডাল তরকারি আছে।দুটো ডিম সেদ্ধ বসালেন।
বাপ আর মেয়ে হাত পা ধুয়ে খেতে বসলো। ওপরের টানা বারান্দায় আসন পেতে খেতে দিলেন।খাওয়া দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে এদের খুব খিদে পেয়েছিলো। সকালে রওনা দিয়েছিলো। কলকাতায় আসতে বিকেল গড়িয়েছে।পেটে কিছু থাকে!
খাবার পর বারান্দায় হরনাথের সাথে নন্দ কথা বলছিলো।হরনাথ ইজি চেয়ারে বসে আছেন। নন্দ মাটিতে।মেয়েটা মাটিতে বসে কথা শুনছিলো।রান্নাঘর গুছিয়ে এসে রাজলক্ষ্মী দেখেন মেয়েটা ঘুমিয়ে কাদা।
–” নন্দ,কাঁসি বাজানোর জন্য অন্য কোন মানুষের খোঁজ কর।ঐটুকু দুধের শিশু–ও পারবে না।”
” দেখি! আমিও ভাবছিলাম।তুমি যদি ওকে রাখো,তবে আমার আর চিন্তা নেই।”
নন্দ ঢাক কাঁধে বেরিয়ে গেলো ।ফিরতে অনেক রাত হবে।
উমার ঘুম ভাঙলো রাত দশটা নাগাদ।
রাজলক্ষ্মী ভাত খেতে ডাকলেন।ভয়ে জড়োসড়ো উমা মাথা নেড়ে জানালো আর খাবে না।
–” খাবি না কি রে! অতো বড়ো রাত!”
বিরক্ত লাগলেও রাজলক্ষ্মী বড় এককাপ দুধ দিলেন। নন্দ আসবে রাত করে।মেয়েটা একা কি করে থাকবে নীচে! রাজলক্ষ্মী খাবার ঘরের মেঝেতে বিছানা করে দিলেন। ছোট আলোটা জ্বালিয়ে দিলেন।
–” ভয় পাবি না।আমি পাশের ঘরেই আছি।”
নন্দ রাত এগারোটায় এসে নীচে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আজ ষষ্ঠী।নন্দ সকালে বেরিয়েও গেছে।আজ নন্দ ঘরের চাবি নিয়ে গেছে।
সকালে উমা উঠে বসে আছে।রাজলক্ষ্মী বললেন,
” মুখ ধুয়ে আয়।”
মেয়েটা তাও বসে আছে।রাজলক্ষ্মী একটা ব্রাশে করে পেস্ট লাগিয়ে দিলেন।
–” মুখ ধুয়ে নে।”।
চা আর পাঁউরুটি দিলেন।
–” খেয়ে চান করে নে।রুক্ষ মাথা।তেল মাখবি।জামা এনেছিস?তোর বাবা তো গছিয়ে দিয়ে কেটে পড়লো। ফিরবে সেই মাঝ রাত্তিরে।”
–” এনেছি ঠাকমা।”
‘ ঠাকুমা ‘ ডাক শুনে মনটা একটু নরম হলো।উমা পোঁটলা থেকে একটা জীর্ণ জামা বের করলো।
–” থাক, রেখে দে। আয়, মাথায় তেল দে।কতদিন চুলে তেল পড়ে না।না তেল থাক,আজ মাথায় শ্যাম্পু কর। এখনই লতিকা চলে আসবে। তোকে বরং স্নান করিয়ে দেবে।”
একটু পরেই লতিকা এলো।লতিকা সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত থাকে।কাল একবেলা ছুটি করেছিলো।লতিকা নন্দকে চেনে।সব শুনলো লতিকা।
” আহারে! মা নেই অতোটুকু মেয়ের।কে যত্ন করবে!”
রাজলক্ষ্মী খুশীর জন্য কেনা জামা প্যান্ট গুলো বের করলেন।খুশী আবার যখন আসবে তখন এগুলো আর হবে না।উমা খুশীর থেকে বড় হলেও রোগা পাতলা।এগুলো ওর গায়ে হবে।দোনোমনা হয়ে দুটো খেলনাও বের করলেন।খুশীদের ঘরটা খুলে খুশীর ছোট বিছানাটা ঝাড়লেন।ছেলে আসবে বলে ঘরদোর সব ঝেড়ে রাখাই ছিলো। ছোট মেয়েটা এ ঘরেই থাক পুজোর ক’দিন।

লতিকা উমাকে স্নান করিয়ে আনলো।এখন বেশ ভালো লাগছে দেখতে।লতিকাকে অবাক করে রাজলক্ষ্মী সুন্দর ফ্রিল দেওয়া জামাটা দিলেন পরতে।
–” বাঃ, সুন্দর লাগছে।”
উমার মুখে হাসি আর ধরে না।
আজ অনেকদিন পরে রাজলক্ষ্মীর মন তৃপ্তিতে ভরে উঠলো।
উমার হাত ধরে পুজোর প্যান্ডেলে যাবেন ঠাকুর দেখতে।আজ তো বোধন।






