দেবিকা মিত্র:-কি রে চাঁপা, দোর খোল। আর কতক্ষণ সাজতে সময় নিবি! ধনা বাবু যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতেছেন।
এই কথাগুলো বলে, পতিতালয়ের চামেলি ওরফে সবার চামু মাসি। আগে চামু মাসির খুব দর ছিল। এখন বয়স হয়েছে তাই বাবুরা আর ওর ঘরে ঢোকে না। চামু মাসিই এখন বাবু ধরে চাঁপা, কুমু, রানি, মুন্নিদের ঘরে পৌঁছে দেয়।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই এইসব মেয়েদের ধরে আনা হয় সেই ছোট্ট বয়সে। এদের ধরে আনার লোক আছে। তাকে টাকা দিতে হয় । তারপর তাদের তালিম দিয়ে তৈরি করা হয়। এরপর যখন একটু বয়স হয় মানে রজঃস্বলা হলেই নামিয়ে দেয় দেহ ব্যবসার কাজে।
চামুকেও এই ভাবেই দেহ ব্যবসার কাজে নামতে হয়। ছোট্ট চামুর মনেই পড়ে না ওর বাবা মায়ের মুখ। কোথায় থাকত তাও মনে নেই। মনে আছে রাধা মাসিকে, যে ওকে এখানে মায়ের আদর দিয়ে আগলে রেখেছিল। তবে বয়স হতেই দয়া মায়া না করে কাজে নামিয়ে দিতে ভোলেনি। এখানে সবাই একই রকমের।
চাঁপাকে টনি বাবু এনে দিয়েছিল সেই কুড়ি বছর আগে। তখন ওর বয়স ছিল দুই বছরের মতো। ভালো করে কথা পর্যন্ত বলতে পারত না। টনি বাবু টাকা নিয়ে বিদায় হয়েছে। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
চাঁপা নামটা চামুর দেওয়া। রোগা হালকা পাতলা চেহারার চাঁপা ছোটবেলায় সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করত আর চামুর আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াত। চামুর, ওর উপর খুব মায়া পড়ে গিয়েছিল। ভেবে ছিল ওকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করবে এই নোংরা পথে নামাবে না কিন্তু এই পতিতালয়ে সেটা সম্ভব নয় তবু অনেক দিন ওকে এই পথে নামতে দেয় নি। তাই নিয়ে এখানকার রানি, জবারা অনেক টিটকারি করে চামু মাসিকে।
ওরা চাঁপাকে দেখতে পেলেই টিটকারি করে বলত….,
ওই দেখ রে সতি লক্ষ্মীকে। দেখে পুণ্য অর্জন কর রে। উনি শরীর বেচবেন না রে। নরম শরীরে মরদের ছোঁয়া লাগতে দেবে না রে। দেখব দেখব কতদিন সতিপনা থাকে!!
আরও অনেক কথা চাঁপাকে শুনতে হতো ওদের থেকে তবু চাঁপা একদম ঠোঁট ফাঁক করত না। ওদের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা ওদের ছায়া পর্যন্ত মারাতো না।
চাঁপা নিজের ঘর থেকে একদম বের হতো না। ওর খুব ইচ্ছা করত পড়াশোনা করতে। চামু মাসিকে বলেও ছিল কিন্তু চামু লুকিয়ে বই খাতা এনে দিয়েছিল কিন্তু নিরক্ষর চামু মাসি পারেনি ওকে অক্ষর শেখাতে তাই চাঁপা অক্ষর না শিখলেও বেশ ভালো আঁকতে পারত বই দেখে দেখে। তবে মনে ছিল অদম্য ইচ্ছা পড়াশোনা করার।
চামুকে বেশিদিন বাবুদের থেকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি চামু। যখন ওর কুড়ি বছর বয়স তখন একদিন এখানকার পতিতারা অনশন করে। ওরা বলে চাঁপাকেও বাবুদের হাতে তুলে দিতে হবে তা নাহলে ওরাও এই কাজ আর করবে না। এটাই ওদের রোজগারের পথ ।সেটা বন্ধ হয়ে গেলে খাবে কি?
তাই চাঁপাকে জোর করেই এই পথে নামাতে হয় তবে চামু একজন ধরাবাঁধা বাবু জুটিয়ে দেয় ।উনিই হলেন ধনা বাবু ।
ধনঞ্জয় মুখুজ্যে ওরফে ধনা বাবুর বয়স তখন ছিল প্রায় ত্রিশের ঘরে। ধনাকে, চামুই জোর করে এখানে ধরে আনে। ধনা এমন মানুষ নয়।
ধনা আগে বিবাহিত ছিল। আরতি ওর বিয়ে করা বৌ ছিল। সেই ছোট্ট বয়স থেকেই আরতির সাথে ধনার পরিচয় । দুই বাড়ির সবাই জানত ওদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের কথা । কথাই ছিল পরিণত বয়স হলে বিয়ে করবে এবং বিয়েও হয়ে যায় কিন্তু এমন গোবেচারা শান্ত মানুষকে আরতির পছন্দ ছিল না। ভিতরে ভিতরে আরতি, ধনার এক বন্ধুর সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং একদিন তার সাথেই পালিয়ে যায়। সেদিন ধনা খুব কেঁদে ছিলেন।
নিপাট ভালো মানুষ পাগলপারা ধনা নিজের খেয়ালে বাসে উঠে অনেক দূরে চলে যায়। বাস থেকে নেমে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ্যা পাড়ায় চলে আসে আর তখনই চামু , ওনাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসে এবং সোজা চাঁপার ঘরে ঢুকিয়ে দেয়।
সেদিনই প্রথম চাঁপার ঘরে বাবু ঢুকল। চাঁপাকে দেখে ওনার খুব দয়া হয়। উনি ওর গায়ে হাত দেওয়া তো দূরের কথা ওর ধারেকাছে পর্যন্ত যাননি।
চাঁপা যখন কাঁদতে কাঁদতে বলে….,
বাবু আমাকে ছেড়ে দিন। আমি এই পথে রোজগার করতে চাই না। আমি পড়াশোনা করে চাকরি করতে চাই।
তখন ধনা বাবুর চোখে জল চলে আসে। উনি ওকে আশ্বস্ত করে বলেন….,
তোমার নাম কি? তুমি কি পড়াশোনা করতে চাও?
চাঁপা বলে….,
আমার নাম চাঁপা ।হ্যাঁ আমি পড়াশোনা করে চাকরি করতে চাই আর মাকে নিয়ে এখান থেকে অনেক দূরে চলে যেতে চাই।
ধনা বাবুর, ওর উপর খুব করুণা হয়। ওকে বলেন…,
তবে আজ থেকেই শুরু হোক তোমার অন্য জীবন। আমি প্রতিদিন তোমার ঘরে আসব। সবাই জানবে অন্য কথা কিন্তু তুমি জানবে আমি তোমাকে পড়াতে আসছি । তুমি আমার উপর ভরসা করতে পারো। দেখো, একদিন তোমাকে আমি শিক্ষিত করে তুলব।
ঘন্টা দুয়েক ওই ঘরে থাকার পর চাঁপার ঘর থেকে বের হওয়ার আগে চামু মাসি যে পারিশ্রমিকের কথা বলে দিয়েছিল সেই টাকাটা চাঁপার হাতে দিতে গেলে, চাঁপা বলে….,
আপনি তো আমাকে ছুঁয়েও দেখেননি। আমি কি করে এটা নেব!!
ধনা বাবু বলেন….,
এই টাকাটা না নিলে যে সব জানাজানি হয়ে যাবে!!
এরপর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে ধনা বাবু, চাঁপার ঘরে আসেন ঘন্টা তিন চারেকের জন্য। ওকে বই খাতা পেন ইত্যাদি কেবল এনে দিয়েই ক্ষান্ত হননি। ওকে হাতে ধরে লেখাপড়াও শেখান।ওর যাবতীয় খরচা উনিই বহন করেন।
দিনে দিনে চাঁপা শিক্ষিত হয়ে ওঠে। ধনা বাবুর সাথে মাঝে মাঝে বেড়াতে যায়। চামু, সব জানতে পেরে খুব খুশি। চামু, ওকে সবরকম সাহায্য করে। ধনা বাবু আর চামুর চেষ্টায় চাঁপা প্রাইভেটে মাধ্যমিক পাশ করে।
চাঁপা, ধনা বাবুকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে ।ধনা বাবু চান, চাঁপাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনতে। তবে চামু মাসি চাইলে ওদের সাথে চলে যেতে পারে।মনে ভাবে, ওই পতিতালয় থেকে ওর বাড়িতে এনে কি পরিচয়ে তুলবে!! তাই চাঁপাকে স্ত্রীর স্বীকৃতি দিতে চায় ধনা।
চামু যেন হাতে চাঁদ পেল। এমনটাই চামু চাইছিল। চাঁপাকে নিয়ে যেদিন ওখান থেকে বেরিয়ে আসবে সেদিন হঠাৎ করেই ওখানে আরতিকে দেখতে পায় ধনা বাবু। আরতি, ধনা বাবুকে দেখেই নিজের ঘরে চলে যায়। ওর চলার গতি দেখতে থাকে ধনা।
চামু বুঝতে পারে ধনা বাবু নিশ্চয়ই আরতিকে চেনেন তাই নিজেই যেচে বলে….,
ও আমাদের এখানে নতুন বাবু!! ওকে এক বাবু অনেক টাকায় এখানে বেচে দে গেছেন। নতুন পাখি কেবল পালাবার ধান্দা করে তাই তো এখানকার সবাই ওকে চোখে চোখে রাখে।
ধনা বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চামু জানতে চায় ওকে কিভাবে চিনলেন ধনা বাবু!!
ধনা তখন সব কথা খুলে বলে। তখন চাঁপা বলে….,
তাহলে আপনি ওনাকে নিয়েই সুখে ঘর করুন। আমি কোনও কষ্ট পাবো না। আপনি আমার কাছে ভগবান। আপনি যা করবেন ভালোর জন্যই করবেন।
ধনা বাবু একটু চুপ থেকে বলেন….,
এঁটো জিনিসে আমার আসক্তি নেই!! ওর স্বভাব আমার জানা। আমি আর পিছনে ফিরে দেখতে চাই না। বলেই চাঁপার হাত ধরে সেই পতিতালয় থেকে বেরিয়ে যান।
চামু কিন্তু এইখান থেকে যেতে চায় নি। ও যে এখন এখানকার মাসি। ওর যে অনেক দায়িত্ব। তাছাড়া এই নোংরা শরীর নিয়ে ওদের পবিত্র সংসারে যেতে মন চায় নি চামুর।
বেলাশেষে পরিণত বয়সের এই দুই ছেলেমেয়ে এখন স্বামী স্ত্রী। ওরা দুজন এখন সুখি দম্পতি।ওনার প্রতি চাঁপার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। এমন সুস্থ জীবন ওনার জন্যই ফিরে পেল চাঁপা।
পরিণত বয়সের দুই কপোত কপোতি এখন সুখের সংসারে ভাসছে।
সৌজন্যে – প্রতিলিপি






