Select Language

[gtranslate]
২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বৃহস্পতিবার ( ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

।। পিয়া তোরা ক্যায়সা আভিমান।।

মহুয়া মন্ডল :- “তুমি গতরাতে ড্রিঙ্ক করে বাড়ি ফিরেছিলে?”

গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে আসতেই থমকে যায় গরিমা। মুখে ভরা খাওয়ার চিবাচ্ছিল সে। ঘড়িতে এখন সকাল ন’টা। সাদা রংয়ের ক্রপ টপ এর সঙ্গে চকলেট কালারের প্যান্ট পড়েছে ও। এক মাথা কোমর ছাপানো সিল্কি স্ট্রেট চুল ছেড়ে পরি পার্টি হয়ে নিচে নেমে এসে ড্রাইভার রবিনকে গাড়ি বের করার নির্দেশ দিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর এসে বসেছিল প্রাতরাশ করতে। ধোঁয়া ওঠা গরম সুপ এক চামচ মুখে দিয়েই ডিম টোস্টে কামড় বসায়। মোবাইলে গতরাতের এচিভমেন্টটা সংবাদ মাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটা সাড়া জাগিয়েছে সেটাই দেখছিল। ভক্তদের প্রশংসায় ছেয়ে আছে সোশ্যাল মিডিয়া, সে সবই স্ক্রল করে দেখতে দেখতে ঠোঁটের কোনায় গর্বের হাসি ফুটে উঠছে মাঝে মাঝেই। বহু পুরুষের হৃদপিন্ডে হিল্লোল তোলা লাস্যময়ী তহ্নী গায়িকা গরিমা সিংহ রয় কত পুরুষের যে রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ভক্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। সেখানে আট থেকে আশি সকলেই ওর গুণমুগ্ধ অন্ধ ভক্ত। বিয়ের প্রপোজালে চেয়ে গিয়েছে ওর ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুক আইডি। কিন্তু গরিমা যে মোটেই সহজলভ্য নয় সেটা কি আর তারা জানে? করুণা হয় ওর এই সমস্ত পুরুষদেরকে দেখে। পুরুষ কিছুটা ফেউয়ের মতো লাগে ওর কাছে। বিশেষ কিছু পরিচিত মানুষের প্রশংসা সূচক অভ্যর্থনার রিপ্লাই করতে করতেই কথাটা ভেসে আসে ও প্রান্ত থেকে।

টেবিলের ঠিক বিপরীত দিকে খবরের কাগজ মুখে নিয়ে বসে ছিল প্রফুল্ল সিংহ রয়। মেয়ের বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারীর জীবন দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সে। গতরাতে যখন গরিমা বাড়ি ফেরে তখন ঘড়ির কাঁটায় সময়সীমা দেখাচ্ছিল রাত তিনটে ছাব্বিশ। মেয়েটা ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিল না। ওর সেক্রেটারি কাম পিএ বরুনের কাঁধে ভর দিয়েই বাড়ি ফিরেছিল গরিমা। ওকে ছোট থেকে মানুষ করা সান্তনা ওই অবস্থা দেখে ছুটে এসে ধরাধরি করে ওকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। এটা আজকাল প্রায় দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুশ্চিন্তা হয় প্রফুল্লর। মেয়ের এই উশৃংখল জীবন যাপন একদিন না ওর চরম ক্ষতি করে দেয়। প্রথম প্রথম মানা করলে তর্ক করত, এখন বাবাকে এড়িয়ে চলে গরিমা। কোন কথাবার্তা সারা দিনে হয় না বললেই চলে। দুজনেই যে যার মত নিজের মতো থাকে। ছোট থেকেই রূপবতী আর ঈশ্বর প্রদত্ত সুন্দর কণ্ঠস্বরের অধিকারিনী হওয়ার কারণে তার অহংকার কম ছিল না। সকলের কাছেই একটা বিশেষ গুরুত্ব পেত গরিমা। স্কুল থেকে কলেজ প্রতিটা মানুষ ওকে বিশেষ গুরুত্বর চোখে দেখতো। যবে থেকে গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তবে থেকে গরিমার হাবভাব চালচলন আর ব্যবহারে সেই অহংকারের মাত্রা যেন আকাশচুম্বী করে তুলেছে। নিজের প্রতি এত বেশি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে ও কাউকেই পরোয়া করে না। তবে সন্তান যতই বাবা মায়ের প্রতি উদাসীন হোক না কেন, বাবা মা তো আর সন্তানকে নষ্ট হয়ে যেতে দেখতে পারে না। তাই আজ প্রফুল্ল মনে মনে সংকল্প করেই নিয়েছিল যে এই বিষয়ে সে কথা বলবেই।

এই বাড়িতে যে আরও একটি মানুষ বাস করে বা তার অস্তিত্ব আছে সেটা যেন মনেই থাকে না গরিমার। বাবাকে সে ব্যাকডেটেড হিসেবেই জানে। ওর স্বাধীনতার পথে সব থেকে বড় বাধা প্রফুল্ল। এত বড় সেতার শিল্পী হয়েও বাবার যে কেন সেকেলে ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন আজও হলো না সেটাই ভেবে পায় না গরিমা। মেয়ে মানেই তাকে সংযমী হতে হবে, পোশাক আশাকে রুচিশীলতা অবলম্বন করতে হবে, ভদ্র নম্র সভ্য মৃত ভাসি হতে হবে, এটা কোন বেদে লেখা আছে? আর এই চিন্তা ধারাতেই ঘোর আপত্তি গরিমার। সে আধুনিক যুগের উন্নতমনস্ক, সু প্রতিষ্ঠিত, স্বাবলম্বী নারী। কেন সংযমের বেড়াজালে ওর চিন্তাধারাগুলোকে শিকল পরানো হবে? ওর স্বাধীনতা, ওর জীবন, এতে অন্য মানুষ কেন হস্তক্ষেপ করে ওকে বুঝিয়ে দেবে যে তোমার কোনটা করা উচিত বা উচিত নয়। ও যথেষ্ট বড় হয়েছে এবং নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছে। সুতরাং এখন আর কারোর শাসনের সে ধার ধারবেনা। একই রকম ফোনের মধ্যে দৃষ্টি আবদ্ধ রেখেই নির্লিপ্তভাবে জবাব দেয়,

“জানোই যখন জিজ্ঞাসা করছ কেন?”

প্রফুল্লের ঘৃণায় মুখ কুঁচকে যায়। এত উদ্ধত্য সহ্য করতে পারে না মানুষটা। খবরের কাগজটা ছুঁড়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে টেবিলের উপর চাপড় দিয়ে ওঠে।

“ছি ছি, ছিঃ গরিমা! ছিঃ! এত উন্নতি হয়েছে তোমার? তুমি কোন বংশের মেয়ে ভুলে গেছো?
উঁচু সামাজিক প্রতিষ্ঠা বুঝি মানুষকে মানুষ থেকে অমানুষ বানিয়ে দেয়? কোন সাহসে এগুলো করার আস্পর্ধা পাও তুমি?”

গরিমা শান্ত ভাবে চোখ তুলে তাকায় ওর বাবার দিকে।

“ব্যক্তিগত জীবন বলে আমার একটা জীবন আছে বাপি। আর সেখানেই কিছু মেনটেনেন্স থাকে, তুমি এই সমস্ত বুঝবে না।”

“ভুলে যেও না আমিও কিন্তু প্রতিষ্ঠিত সেতার শিল্পী। আমাকে স্টাবলিশ হওয়ার সংজ্ঞা শিখিও না।”

“প্লিজ বাপি, সকাল সকাল আমার মুড নষ্ট করে দিও না। বাইরের জগতের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে কিছু নিয়ম বহির্ভূত কাজ করতে হয়। আর তাছাড়া গতকাল আমার জীবনের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাচিভমেন্টের দিন ছিল। তুমিও জানো নিশ্চয়ই? একবারও কিন্তু সেই জন্য আমাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করনি। বাবা মানেই শুধু শাসন, সেটাও কিন্তু নয়!”

“ছোট থেকে মা হারা বলে তোমাকে শাসন করিনি কখনো। তোমার সমস্ত অন্যায় আবদার জোর যেদ মুখ বুজে মেনে নিয়েছি, আর সেই কারণেই আজ তুমি এত উশৃংখল জীবন যাপন করছো। এর ভবিষ্যৎ কত ভয়ানক হতে পারে সেই ধারণা নেই তোমার।”

“বাপি প্লিজ, অ্যাপ্রিশিয়েট না করতে পারো এটলিস্ট আমাকে ডি মটিভেট করবে না। এখন মার্কেটে কত কম্পিটিশন তুমি জাননা। সব দিক বজায় রাখতে গেলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বে নিয়মী হতে হয়।”

“শিল্প কোন শর্তের উপর বাধা থাকে না। আর যদি সেটা বাধা হয় তাহলে সেটা শিল্প হয় না। তোমাকে সংগীত শিখিয়েছিলাম তোমার ঈশ্বর প্রদত্ত গলার কারণে। সংগীত শুধু মনোরঞ্জনের বস্তু নয়, এটা একটা সাধনা, একটা পুজো, প্রার্থনা, তাকে ভক্তি করতে হয়। তোমরা আজকালকার শিল্পীরা সংগীতকে বাজারি ব্যবসায় নামিয়ে নিয়ে এসেছো। এই শিক্ষা তো তোমায় আমি দিইনি গরিমা!
তুমি গতকাল শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পী পুরস্কার পেয়েছো এতে আমি খুবই গর্বিত, মানলাম তুমি যোগ্যতা রাখো। কিন্তু সব থেকে বেশি দুঃখ কোথায় লাগে জানো? যখন দেখি ভালোবেসে নয় তোমার নাম যশ অর্থ, সুখ্যাতি অর্জনের খাতিরে ব্যবহার কর। তুমি শাস্ত্রীয় সংগীত কত ভালো গাইতে। আমরা একসাথে কত রেওয়াজ করেছি। আর আজ তুমি শুধুমাত্র সিনেমার চটুল গান ছাড়া আর কিছুই গাঁও না। রেওয়াজ করো না বহুদিন। তানপুরা তারে জং ধরে গেছে এ সংগীত নয়, এর সাধনা নয়। আর জানবে সাধনা বিনা সংগীত হয় না।”

বিরক্ত লাগছে গরিমার এই সমস্ত ভুলভাল চিন্তাধারার একেবারে বিরোধী সে ও যে গলা ভালো রাখার জন্য অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ায় ভয়েস ট্রেনিং করে প্রত্যেক দিন সেটা আর ওর বাপি কিভাবে জানবে। সবার মত ওর গলা তো নয় গতে বাধা নয় সবার মত সুর ধরে রাখার জন্য ওকে এত পরিশ্রম করতে হয় না। অল্প ভয়েস ট্রেনিং করলেই ওর যথেষ্ট। ও জানে এসব কথা প্রফুল লোকে বলে কোন লাভ নেই প্রফুল্ল এসবের মানে বুঝবে না। বাবা সেই পুরনো আমলের মতই গাদ্ধারা অনুযায়ী তানপুরা নিয়ে বসার কথাই বলবে। একগাদা লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, গীতা দের উদাহরণ দেবে। এটা বুঝবে না যে সেকালে এই সুবিধা থাকলে তারাও এত খাটাখাটনি করত না। তাই কথা এড়িয়ে ও বলে,

“বাপি সাড়ে দশটা থেকে আমার রেকর্ডিং আছে, প্লিজ তোমার এই সমস্ত ইমোশনাল স্পিচ দেওয়া বন্ধ কর। আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি আর প্রতিষ্ঠাও পেয়েছি। আর এই প্রতিষ্ঠাকে ধরে রাখতে যা যা করা দরকার আমি তাই তাই করছি। তোমার এই সমস্ত ব্যাকডেটেড চিন্তাধারা গুলো প্লিজ পাল্টাও এখন সময় অনেক পাল্টেছে। এখনকার মেয়েরা পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শিখেছে। শুধুমাত্র পুরুষরাই লাইফ এনজয় করবে, আর মেয়েরা ঘরে বসে সংসার করবে এই সমস্ত থার্ড ক্লাস চিন্তাধারা এখন কিন্তু কেউ করে না।”

বিদ্রুপাত্মক হাসি রেখা ফুটে ওঠে প্রফুল্লর ঠোঁটে।

“হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। সমাজ পাল্টেছে, সময় পাল্টেছে, মেয়েরা এখন অনেক সাবলম্বী। ছেলেদের তোয়াক্কা তারা করে না, কিন্তু মা, একটা কথা মনে রাখবে, নারী কিন্তু নারীই আছে পুরুষ হয়ে যায়নি। তাদের শারীরিক গঠন গঠন তাদের চিন্তাধারার মতো পরিবর্তন হয়ে যায়নি। আজও একটা নারী বিয়ের পর স্বামীর হাত ধরেই তার ঘরে যায়। সময় পরিবর্তন হয়েছে বলে প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন কিন্তু হয়নি। একটা নারীকেই সন্তান ধারণ করতে হয়, পালন করতে হয়। এই ক্ষমতা কিন্তু পুরুষের কাছে ট্রান্সফার হয়ে যায়নি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।”

“এগুলো সব তোমার ভুল ধারণা বাপি। তুমি এই চার দেয়ালের বাইরের জগত সম্পর্কে কিছুই জানোনা। লিভ টুগেদার বলে একটা রিলেশনশিপ গভমেন্ট থেকে মান্যতা পেয়েছে জানো? সেখানে কাউকে কারো দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয় না। যতদিন পোষায় ততদিন একসাথে থাকে, না পোষালে আলাদা হয়ে যায়। বিয়ে থাওয়ার চক্করে কেউ যায় না। যে যার জীবন নিজের ইচ্ছামতো কাটাতে পারে।”

“তুমিও বুঝি সেই পথের পথিক হতে চাইছ?”

“প্রয়োজন পড়লে তাই।”

“গরিমা!” প্রফুল্ল রাগে ফুঁসতে থাকে। কথা বলতে বলতে গরিমার গলার স্বরে সেই অদ্ভুত বেপরোয়া সুর বাজছে যেন। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু হলেই ও আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

“তোমার সাথে বৃথা তর্ক করতে চাই না। এই সমস্ত নোংরা কথা কানে শোনাও আমার জন্য পাপ। শুনে রাখ গরিমা, আমার এই দেহে প্রাণ থাকতে তুমি ওই শিয়াল কুকুরদের মত নোংরা জীবন যাপন করার কথা কল্পনাতে আনবে না। তোমাকে যখন জন্ম দিয়েছি তখন বাবা হিসেবে আমার তোমার প্রতি অধিকার আছে, আর সেই অধিকার থেকেই আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি। আর তুমি সেটা মানতে বাধ্য। বাবা হয়ে তোমার জীবনটা এইভাবে নরক হয়ে যেতে দেখতে আমি পারবো না।”

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে গরিমা। ওর ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠেছে। ভুরু দুটো কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,

“তুমি কি কথা বলবে আমি জানি। আর তুমি আমার উত্তরটাও জানো, তাই খামাখা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমায় বেরোতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

“জীবনে প্রতিষ্ঠা ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ আছে। বয়সটা কিন্তু থেমে নেই তোমার। আমার পিতৃ ধর্ম আমাকে পালন করতেই হবে, তুমি চাও আর না চাও। আর আমি আমার মেয়ের জন্য যেটা ঠিক সেটাই করব।”

রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে গরিমার। নিজের খাওয়ার প্লেটটা ছুঁড়ে মারে রান্নাঘরের দেয়ালের গায়। সঙ্গে সঙ্গে সেটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মেঝের উপর। সান্তনা ছুটে আসে। গরিমার তিন বছর বয়সে মা মরে যাওয়ার পর থেকে ওর গভর্নর হিসাবেই এসেছিল এই বাড়িতে। তারপরে কখন যে গরীমা ওর নিজের নাড়ী ছেঁড়া ধন হয়ে গেছে সে হিসাব নেই শান্তনার। ছুটে যায় মেয়ের কাছে।

“শান্ত হ মা, শান্ত হ।”গরিমার পিঠে ক্রমাগত হাত বোলাতে বোলাতে বলে শান্তনা, গরিমা তখন রাগের চোটে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সান্তনা প্রফুল্লর দিকে তাকিয়ে মিনতি সুরে বলে, “বাবু আপনি এখন থামুন না! জানেন তো মেয়ের কেমন রাগ। সকাল সকাল কি শুরু করলেন বলুন তো আপনারা? একটা কাজেই তো বের হচ্ছিল মেয়েটা, কেন ওকে রাগানো?”

“তুমি থাম! জীবনে গান গাওয়া ছাড়াও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। যেভাবে ও জীবন যাপন করছে তাদের দুদিনে ও শেষ হয়ে যাবে, তুমি দেখতে পাচ্ছ না?”

“বাপি আমি কিন্তু অ্যাডাল্ট, তুমি আমাকে জোর করতে পারো না। তাছাড়া এখন কম্পিটিশনের যুগ এই সময় অহেতুক কোন ভুলভাল ডিসিশন নিয়ে আমি লাইফটা বরবাদ করতে চাই না। তুমি তো তোমার কাজ সেরে চলে যাবে, সারাটা জীবন আমাকে তার মাশুল গুনতে হবে।”

“সারা জীবন কারও সময় একই রকম যায় না গরিমা। পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম,আজ তোমার সময়, কাল ওই জায়গায় অন্য কেউ বসবে এটাই স্বাভাবিক। এটাকে যে মেনে নিয়েছে সে জীবনে সুখী যে মানবে না সে হতভাগ্য।”

“ভাগ্যকে ধরে রাখা একটা ট্যালেন্ট, আর সেটা কিভাবে আমি খুব ভালো করে জানি বাপি।”

“দেখ মা, তুই বোঝার চেষ্টা কর। এই নাম যশ এর বাইরেও একটা জীবন আছে। নাম যশ সুখ্যাতি আলেয়ার মত। এখন আছে, কিন্তু বাস্তবে মহাশূন্য। সেই রুপালি আলেয়ার পিছনে ছুটতে ছুটতে দেখবি কবে জীবনটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। আর সেই শূন্যতা পূরণের জন্য একটা সময় পর একটা অবলম্বনের দরকার পড়বে । নয়তো যেদিন এই সমস্ত কিছু আর থাকবে না, সেদিন একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতা তোকে গিলে খাবে। মানসিক রোগী হয়ে যাবি তুই।”

আবার বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠে গরিমার মুখে।

“আচ্ছা, তোমার কথা যদি মেনেও নেই, তাহলে কে হবে সিঙ্গার গরিমা সিংহ রায়ের অবলম্বন? তোমার ওই গোবর গণেশ মার্কা গেঁও ভূতটা?”

“গরিমা!”প্রফুল্ল হাত উঁচিয়ে কয়েক পা এগিয়ে আসে গরিমার দিকে। তারপর নিজেকে সংবরণ করে বলে, “মুখ সামলে কথা বল, ওর একটা নাম আছে। গৌরব একজন কলেজের প্রফেসর।”

“হোয়াট এভার, আই ডোন্ট কেয়ার! দেখো বাপি, তুমি আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে ওই আমার চূড়ান্ত আনকম্পার্টেবল এক আনস্মার্ট কবিতা লিখে বেড়ানো ভেগাবেন্ড লোককে আমার ঘাড়ে চাপাতে পারবে না।”

“গরিমা এত অহংকার ভালো না মা। এই অহংকার ই তোর পতনের মূল হবে একদিন।”

“প্রথমত আমি এখন বিয়ে করছি না। আর তাছাড়া যদি করি আমার জীবন সঙ্গী হবে সংগীত জগতেরই কেউ। যে আমার প্রফেশনকে বুঝবে, মর্যাদা দেবে এবং আমার সমকক্ষ হবে। তোমার বন্ধুর ছেলের মত মাঠে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে বাউন্ডুলেদের মতো ছড়া লিখে বেড়াবে না।”

“তোর যোগ্য জীবনসঙ্গী বুঝি আয়ুষ্মান চ্যাটার্জী? যে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার টোপ ফেলে হাজার একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে?”

“যেটা জানো না সেটা নিয়ে কথা বলবে না বাপি। জানো তো সেলিব্রিটিদের নামে বদনাম করতে পারলেই মিডিয়ার বেশি আনন্দ পায়।”

“তুই যাকে অযোগ্য বলছিস তার যোগ্যতা সম্পর্কে তোর কোন ধারণা নেই। গৌরব বাংলা আধুনিক কবিতার উপর পিএইচডি করেছে। একটা কলেজের প্রফেসর সে। আর ভবঘুরে বাউন্ডুলে যাদেরকে বলছিস সে বীরভূমের বর্মন জমিদার বংশের একমাত্র উত্তরসূরী। বর্তমানে জমিদারি না থাকলেও যা আছে তা এখনো সাত পুরুষ বসে খেতে পারবে। অত্যন্ত নম্র ভদ্র একটা ছেলে, আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছি, ওই তোর যোগ্য জীবনসঙ্গী হবে মিলিয়ে নিস।”

“আদেও তোমার পছন্দ আমার যোগ্য হবে কি হবে না তা টেস্ট করার জন্য আমি আমার জীবনটাকে গিনিপি বানাতে পারবো না। আর জমিদারি! বাপি এইসব পয়সার গরম ওদের দেখাতে বারণ করো। আমি যা রোজগার করি তাতে অমন জমিদারি আমি দশটা কিনতে পারব। আমার লাইফস্টাইল এর সাথে ওর তুলনা করবে না।”

“হে ঈশ্বর!” চেয়ারের উপর ধপ করে বসে পড়ে প্রফুল্ল। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, আর ওর শক্তি নেই বাগবিতণ্ডা করার। চোখ জোড়া ছল ছল করছে। নিজেকে একজন ব্যর্থ পিতা মনে হচ্ছে। মা মরা মেয়ে বলে ছোট থেকে শাসন না করে করে আজ তার ফল ওকে ভুগতে হচ্ছে।”

গরিমা দুই হাত দিয়ে মাথার চুল গুলো খেমচে ধরে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিল থেকে মোবাইল তুলে গট গড করে বেরিয়ে যায় দরজার বাইরে।

সেই দিকে তাকিয়ে প্রফুল্লের দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।

Related News

Also Read