তৃতীয় জাতীয় লোক আদালতে জেলা আদালতের দৃশ্য ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ (২য়) আদালতের বিচারক মন্দিপ সাহার পাশে মেম্বার জজ হিসেবে ছিলেন রূপান্তরিত এক মহিলা শিল্পা বেতাল। তিনি যেমন সঠিক দিকনির্দেশ দেন, তেমনই সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা শোনেন মন দিয়ে। আদালত চত্বরে উপস্থিত আইনজীবী থেকে শুরু করে মামলাকারী — সকলের কাছেই শিল্পার এই ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

নারায়ণপুরের কৃষিজীবী পরিবারের সন্তান বিক্রম বেতাল। বাবা সুদর্শন বেতালের চার সন্তানের মধ্যে ছোট থেকেই একটু আলাদা ছিল সে। সমাজ ও পরিবারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বিক্রম থেকে শিল্পা হয়ে ওঠেন তিনি। আজকের দিনে শিল্পা বেতাল শুধু পরিচয়ে নয়, কাজের মধ্য দিয়েও সমাজে নজির তৈরি করছেন। এইচআইভি–এইডস সংক্রান্ত সচেতনতামূলক প্রচারে তাঁকে আগেও বহুবার দেখা গেছে। তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করার পর বর্তমানে তিনি শান্তিনিকেতনে বিএসসি নার্সিং কোর্সে অধ্যয়নরত।

জেলা জুড়ে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের উপর ধার্য করা অতিরিক্ত জরিমানা দীর্ঘদিন ধরে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার ফলে জমে উঠেছিল মামলার পাহাড়, থেমে যাচ্ছিল বিপুল রাজস্ব আদায়। সেই পরিস্থিতিতেই জাতীয় লোক আদালত এগিয়ে আসে। শনিবার জেলার বিভিন্ন মহকুমায় একযোগে শিবিরের আয়োজন করা হয়। তমলুকে ১৫টি, কাঁথিতে ১১টি এবং হলদিয়ায় ৬টি বেঞ্চ গঠন করে মোট ৩২টি বেঞ্চে বিচারকাজ চলে।

ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী সহ মোটর এক্সিডেন্ট ক্লেম ও ব্যাংক সহ অন্যান্য মামলা মিলে প্রায় ৩৭ হাজার মামলার মধ্যে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নিষ্পত্তি হয় ২০ হাজার ১১৩টি মামলা।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সচিব সুদীপা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এই বিশেষ লোক আদালতের মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোটর এক্সিডেন্ট ক্লেম কেস ২৫৩টি মামলার নিষ্পত্তিতে উঠে এসেছে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণের ১৪০৩ টি মামলায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার সমাধান হয়েছে। এছাড়া রূপান্তরিত মহিলাদের নিয়ে সমাজে ভালো বার্তা দেওয়ার জন্য একটি বেঞ্চে একজন রূপান্তরিত মহিলাকে বসানো হয়েছে।
এদিন বিচার প্রক্রিয়ার তদারকি করতে তমলুক আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ পরিদর্শন জেলা জজ কোর্টের বিচারপতি প্রিয়ব্রত দত্ত ও সচিব সুদীপা বন্দ্যোপাধ্যায়।
জেলা জজ প্রিয়ব্রত দত্ত জানিয়েছেন, লোক আদালতের মাধ্যমে বিগত তিন বছরের জমে থাকা মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় ব্যাপক সাড়া পড়েছে জেলাজুড়ে। বিশেষত ট্রাফিক আইন ভঙ্গের মামলাগুলিই ছিল সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষও খুশি যে দীর্ঘদিনের বোঝা থেকে অবশেষে মুক্তি মিলেছে।





