কেকা মিত্র
আবৃত্তিওয়ালার উদ্যোগে শিশির মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘আবৃত্তি পরব’। কবিতা, আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও সাহিত্যচর্চার সমন্বয়ে এই অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে এক স্মরণীয় সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠানের সূচনায় ‘আবৃত্তিজন সম্মাননা’ প্রদান করা হয় বিশিষ্ট লোকগায়ক অভিজিৎ বসু, আবৃত্তিশিল্পী পার্থ মুখোপাধ্যায় এবং নৃত্যগুরু সুজয় ঠাকুর-কে। তাঁদের শিল্পসাধনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই সম্মান প্রদান করে আবৃত্তিওয়ালা পরিবার।
এদিন প্রকাশিত হয় কবি অতীশ চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতা অবলম্বনে নির্মিত কবিতা–সিনেমা ‘বঙ্গদেশ’-এর পোস্টার। ছবিটিতে আবৃত্তি করেছেন আবৃত্তিওয়ালার ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায় এবং পরিচালনায় রয়েছেন ড. জনার্দন ঘোষ। পোস্টার উন্মোচন করেন সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক ড. ঋতব্রত ভট্টাচার্য।
অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল ‘আবৃত্তি আমার ভালোবাসা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের প্রকাশ। উদার আকাশ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত এই বইটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রকাশক ফারুক আহমেদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক ড. ইমানুল হক, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অলোক বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ঋতব্রত ভট্টাচার্য, অভিজিৎ বসু, ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ড. পৌলমী দাস, নৃত্যগুরু সাম্ব দাস ও সুজয় ঠাকুর, কবি অতীশ চট্টোপাধ্যায়, নজরুল গবেষক সোমঋতা মল্লিক, রাজীব মুখার্জী সহ বহু বিশিষ্টজন।
এদিন সাহিত্যিক ড. ইমানুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন ডিজিটাল অডিও অ্যালবাম ‘এক যে ছিল…’, যেখানে গল্পপাঠ করেছেন ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে আবৃত্তি ও কাব্যনৃত্যের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। ‘বৃষ্টির পদাবলি’, ‘ভূত ও মানুষ’, ‘রাম বনে ফুল পাড়ে’ সহ মোট সাতটি কবিতায় আবৃত্তি করেন ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ড. পৌলমী দাস-এর লেখা কবিতা ‘জীবন এখন’-এর নৃত্যরূপ এবং সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত-এর ‘দূরের পাল্লা’ কবিতার নৃত্য উপস্থাপনা। আবহসংগীতে ছিলেন সুদীপ্ত সাহা। কোরিওগ্রাফি ও পরিচালনায় ছিলেন সুজয় ঠাকুর, সুতর্ষা ঠাকুর এবং পৌলমী চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ড. পৌলমী দাস-এর কণ্ঠে সূচনা সংগীতের মাধ্যমে। পরে সোমঋতা মল্লিক-এর পরিচালনায় পরিবেশিত হয় আবৃত্তি আলেখ্য ‘কাজী নজরুল ইসলামের প্রাণপ্রিয় বুলবুল’। এদিন বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে ‘আবৃত্তি পরব সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন ড. ঋতব্রত ভট্টাচার্য, সোমঋতা মল্লিক, ড. ইমানুল হক, ফারুক আহমেদ, পৌলমী চৌধুরী, রাজীব মুখার্জী, ড. জনার্দন ঘোষ, সুতর্ষা ঠাকুর, অমৃতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অতীশ চট্টোপাধ্যায়, সৌমেন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে সৌমেন চট্টোপাধ্যায়-এর পরিচালনায় পরিবেশিত হয় সমবেত আবৃত্তি ‘আউল বাউল’। এছাড়া অমৃতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সুকুমার রায়ের কবিতা নিয়ে আবৃত্তি কোলাজ ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ পরিবেশন করে আবৃত্তিওয়ালার ছোটরা—প্রতিকৃতি চট্টোপাধ্যায়, মৌবনী সেন, ঋতশ্রী দাস ও বসুন্ধরা সিনহা। এই অংশটির পরিচালনায় ছিলেন ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আবৃত্তি ও যন্ত্রসংগীতের মেলবন্ধনে পরিবেশিত বিশেষ পরিবেশনা ‘কাব্যে সুরে’। এই পর্বে অংশ নেন বাপ্পা সেনগুপ্ত ও ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়। পিনাকীর কণ্ঠে লালন ফকির থেকে শাহ আব্দুল করিম, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শহীদ কাদরী ও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার অভিনব উপস্থাপনা দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের একটাই প্রতিক্রিয়া—আবৃত্তির অনুষ্ঠান এত বৈচিত্রময় ও মনোগ্রাহীও হতে পারে!
মঞ্চভাবনায় ছিলেন বামদেব সিনহা। সঞ্চালনায় ছিলেন প্রভাতকুমার সাহা ও ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়। সামগ্রিক পরিকল্পনায় ছিলেন ড. পৌলমী দাস, সিদ্ধার্থ দাশ ও বামদেব সিনহা। শিশির মঞ্চে এদিনের এই মনোমুগ্ধকর আয়োজন দর্শকদের মনে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে।





