কৃদন্তী ঘটক :- স্নান করতে যেতেই ফোন কলের শব্দটা কানে এলো। তাড়াহুড়ো করে এসে দেখি একটা মিসড কল। নামটা দেখলাম । হাসানদা।
ওহ !!! জুন মাস এসে গেছে তাই কল। লোকটা প্রতি বছর জুন মাসে একটা মিসড কল দেবেই। প্রতিবারের মতোই দোনোমনো করে শেষ পর্যন্ত কল করেই ফেললাম। হাসানদা যথারীতি অট্টহাসি হেসে বললো “শেষপর্যন্ত তুই ফোন করতে বাধ্য রে তিস্তা দেখলি তো”!! কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমিই বাধ্য হই। কেন ? কি জানি ? টান ? মায়া ? জানি না।
বছর পঁচিশ পিছিয়ে গেলাম বরাবরের মতো। আমাদের পাড়ার ডানপিটে হাসানদা। ওহ বলতে ভুলে গেছি হাসানদার একটা ভালো নামও আছে। অভিমন্যু ব্যানার্জি। ছোটথেকেই ডানপিটে। খেলাধুলা, গান , সাঁতার সবকিছুতেই ফার্স্ট। গান গাইতে পারতো অসাধারণ। ওস্তাদ মেহেদী হাসানের গজল আমরা তার কণ্ঠে শুনেই ওস্তাদজীকে চিনি।।সেই থেকেই অভিমন্যু পাড়ায় হয়ে উঠলো হাসান । আমাদের সবার হাসানদা।
কল করতেই হাসানদা বললো” কি রে মনে আছে তো”?
মনে আর থাকবে না? তবু অবাক হওয়ার ভান করে বললাম “কি মনে থাকবে গো” ? পাক্কা ভাজা মাছ উল্টে খেতে না পারা আমি।
হাসানদা ঠোঁটকাটা। “ন্যাকামি করিস না। দশ তারিখ আমার জন্মদিন । তোর মনে আছে জানি। কোথায় দাঁড়াবো বল”?
“কোথায় দাঁড়াবে ?মানে আমাকে কি যেতেই হবে”? একটু অনুনয় মাখানো স্বরে বললাম।
“তিস্তা তুই জানিস প্রতি বছর এই একটা দিন তোকে ডাকি । তোকে ভালোবাসি তাই ডাকি” হাসানদা একটু ব্রেক লাগিয়ে আবার শুরু করলো “তোর ইচ্ছে হলে আসবি নাহলে আসিস না। আমি পুঁটিরামের সামনে দাঁড়াবো দুপুর দুটোর পর ” বলেই ফোনটা কেটে দিলো। ফোন করে দেখলাম যথারীতি সুইচড অফ।
এই গরমে কলেজস্ট্রিট যাওয়া কি সাংঘাতিক। শ্বশুর বাড়িকে ম্যানেজ করে যেতে হবে। রাতুল অবশ্য সব জানে। তাই বাধা দেয় না। হাসে। বলে এই একটা দিন ই তো।
গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর মাস্টার্স করার প্রস্তুতি নিচ্ছি সেই সময় হাসানদা একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় আমাকে পাকড়াও করে। একটা আম গাছের তলায় টেনে নিয়ে যায়। হাতটা হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে বলে” তিস্তা তোকে আমি ভালোবাসি”।
আমি চাকরি করবো, বিদেশ যাবো এসব স্বপ্ন দু চোখে। হাসানদার প্রস্তাব শুনে হাঁ। আমার হাঁ দেখে তড়িঘড়ি হাসানদা বলে “তোর আমাকে ভালোবাসতে হবে না” ।
বলে কি লোকটা? খানিক পরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। মাস্টার্স করার পর জুন মাসের দশ তারিখে ডেকে আমাকে একটা গিফট প্যাক দিয়ে বলেছিল” আমার জন্মদিন আজ। তাই তোকে গিফট দিলাম। প্রতিবছর দেব”। আমার তখন বিয়ের সম্বন্ধ প্রায় পাকা।
আমি হেসে বলেছিলাম “আমার বিয়ে তো পাকা হয়ে গেছে। আর গিফট দেওয়ার সুযোগ পাবে কি” ?
“তোকে ফোন করে ডেকে নিয়ে দেব। প্রতিবছর একটা ফোন কল পাবি “। আমি যদি না ধরি ? প্রত্যুত্তরে হাসানদা বলেছিল “তুই ধরবি আমি জানি”।
সেই থেকে একটা মিসড কল প্রতি জুন মাসে।






