কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস বিরোধী আন্দোলনের আধুনিক পথিকৃৎ ডক্টর নরেন্দ্র অচ্যুত দাভোলকরের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর, মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে। তিনি তাঁর মা তারাবাই ও বাবা অচ্যুত দাভোলকরের দশ সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ।
তার পড়াশোনা শুরু হয় সাতারার নিউ ইংলিশ স্কুলে। মাধ্যমিক পাশের পর সাঙ্গলির উইলিংডন কলেজ হয়ে ডাক্তারি পড়ার জন্য মরাজ-এর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভরতি হন এবং সেখান থেকেই এমবিবিএস পাশ করেন। নরেন্দ্র শিবাজী ইউনিভার্সিটি কাবাডি দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং ভারতের কাবাডি দলের হয়ে তিনি বাংলাদেশ সফরে যান। কাবাডিতে সাফল্যের জন্য তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের ‘শিব ছত্রপতি যুবরাজ’ সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৭০ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি পান, তার পর থেকে ১৯৮২ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত একটি হাসপাতাল ও দু’টি ক্লিনিক চালাতেন। তার পর ওই বছরই হঠাৎ হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়ে ‘অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন’ আন্দোলনে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে যোগ দেন।
একটি সফল পেশা, সুখ-সমৃদ্ধি, বিত্ত-বৈভব— সব ছেড়ে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন ।স্বয়ং নরেন্দ্র দাভোলকর মনে করতেন, হাসপাতাল ও ক্লিনিক মানুষের শরীরের রোগ সারাতে পারে মাত্র, অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞতার অসুখ সারাতে পারে না। ভারতের মতো কুসংস্কার ও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত দেশে হাসপাতালের চেয়ে ঢের বেশি প্রয়োজন চেতনার বিকাশ।
ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’ আন্দোলনে। পানীয় জলের অপব্যবহার নিয়ে তিনি তৎকালীন ধর্মগুরু আসারাম বাপুর সরাসরি বিরোধিতা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। আসারাম বাপুর যৌন কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস তখনও হয়নি।
ধীরে ধীরে দাভোলকার কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ ওঠেন এবং “অখিল ভারতীয় অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি”-র সাথে যুক্ত হন। পরে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। কত ভণ্ড সাধু ধর্ম ও মোক্ষলাভের নামে ভাঁওতাবাজি বুজরুকির মাধ্যমে দুর্বলচিত্ত, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন কত মানুষকে প্রতারিত করে। এদের প্রতিহত করতে,সমাজে অন্ধবিশ্বাসের প্রকোপ আটকাতে এবং কুসংস্কার নির্মূল করে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তুলতে কাজ শুরু করে তার এই সংগঠন। পঁচিশ বছরে মহারাষ্ট্র জুড়ে ২২৫ টি এইরকম কেন্দ্র চালু করেছেন দাভোলকর।
বিবাহ করেছিলেন শৈল দেবীকে। তাঁদের এক পুত্র ‘হামিদ’ ও এক কন্যা ‘মুক্তা’। ছেলের নাম মারঠি মুসলমান সমাজকর্মী ও সংস্কারক ‘হামিদ দলবাই’এর নাম অনুসারে রাখেন। তিনি নাস্তিক ছিলেন বলেই তাদের বিবাহ পঞ্জিকা অনুসারে ও প্রথাগত রীতি মেনে করান নি।
দাভোলকার বিরাগভাজন হয়েছেন বহু ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ও তথাকথিত সমাজপতিদের। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ২০ আগস্ট মহারাষ্ট্রের পুনেতে যখন তিনি প্রাতঃভ্রমণে বের হন তখন সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদী কোন এক সংগঠনের নির্দেশে দু’জন আততায়ী তার উপর চার রাউন্ড গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তিনি পরলোক গমন করেন
নরেন্দ্র দাভোলকার সমাজসেবী হিসাবে যে অবদান রেখেছেন তার স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকার ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মরণোত্তর পদ্মশ্রী প্রদান করে। সর্ব ভারতীয় জনবিজ্ঞান নেটওয়ার্ক তথা অল ইন্ডিয়া পিপলস্ সায়েন্স নেটওয়ার্ক দাভোলকারের প্রয়াণ দিবসটি ন্যাশন্যাল সায়েন্স টেম্পার ডে তথা জাতীয় বৈজ্ঞানিক মনন দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস বিরোধী আন্দোলনের আধুনিক পথিকৃৎ ডক্টর নরেন্দ্র অচ্যুত দাভোলকরকে এখন সংবাদ পরিবার জানায় শতকোটি প্রণাম







