স্বামী অচ্যুতানন্দ :- ১লা জানুয়ারি ১৮৮৬ । সেদিন ছিল একাদশী। প্রায় জনা ত্রিশেক ভক্তের সমাবেশ হয়েছে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে।
ঐদিন বিকাল তিনটায় ঠাকুর নিচে নেমে এলেন — বাগানের রাস্তার ওপর ফটকের মাঝামাঝি একটা মোড়ের মাথায় আমগাছের তলায় গিরিশ , রামবাবুদের দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। গিরিশকে প্রশ্ন করলেন , ” গিরিশ , তুমি যে সকলকে এত কথা বলিয়া বেড়াও , তুমি কী দেখিয়াছ ও বুঝিয়াছ ?” ভক্তদের কাছে তাঁর স্বরূপ আজ অনাবৃত করার জন্যই সম্ভবত এই পটভূমিকা। তাই ঠাকুরের এই প্রশ্ন।
হাঁটু গেড়ে তাঁর পদপ্রান্তে বসে গিরিশ করজোড়ে গদগদ কণ্ঠে বললেন , ” ব্যাস-বাল্মীকি যাঁহার ইয়ত্তা করিতে পারেন নাই , আমি তাঁহার সম্বন্ধে অধিক কী আর বলিতে পারি ?”
গিরিশের এই কথায় তাঁর ভক্তি-বিশ্বাস উপচে পড়ছিল। তাঁর এই অপরূপ স্তুতিতে ঠাকুরের দৈবী সত্তা যেন উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তাঁর পূর্ব পূর্ব অবতার-জীবনের কৃপার কথা বোধ হয় মনে পড়ে গেল।

দেখা গেল , তাঁর সর্বশরীর রোমাঞ্চিত হয়ে তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন। শান্ত স্থির শরীর , মুখে এক অপূর্ব আনন্দের ছটা !
তাঁর এই অনুপম ভাববিগ্রহ দেখে গিরিশেরও বিশ্বাসের দরজা হাট হয়ে খুলে গেল। উল্লসিত গিরিশ ‘জয় রামকৃষ্ণ’ , ‘জয় রামকৃষ্ণ’ বলতে বলতে বারবার তাঁর চরণে লুটিয়ে পড়ে তাঁর চরণধূলি মাথায় নিতে লাগলেন। সমবেত ভক্তেরা এই ঘটনা দেখে যে যেখানে ছিলেন ছুটে এলেন। তাঁর পদধূলি নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। কেউ ফুল ছুঁড়ছেন , কেউ জয়ধ্বনি দিচ্ছেন।
এই অবস্থায় প্রথমজন ঠাকুরের চরণ স্পর্শ করে পদধূলি নিতেই ভাবাবিষ্ট ঠাকুর ডান হাত দিয়ে তাঁর বুকের নিচ থেকে ওপর দিকে টেনে দিলেন , আর বললেন , “চৈতন্য হোক।” প্রত্যেক ভক্ত তাঁর চরণ স্পর্শ করা মাত্র ঐভাবে তাঁদের বুক স্পর্শ করে চৈতন্য জাগিয়ে দিয়ে কৃপা করতে লাগলেন। এই অদ্ভুত স্পর্শে প্রত্যেকের ভিতর ভাবান্তর উপস্থিত হওয়ায় কেউ কাঁদতে , কেউ হাসতে , কেউ ধ্যান করতে লাগলেন এবং আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেলেন।
কৃপাসিন্ধু ঠাকুর দেখিয়ে দিলেন , শরণাগত ভক্তের সব ভার তিনি নেন। জীবচৈতন্যের পরিবর্তে আত্মচৈতন্যে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁদের কাছে নিজের অভয়দাতার রূপ প্রকাশ করলেন।






