Select Language

[gtranslate]
২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বুধবার ( ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

।। বিজয়ার বিজয়া ।।

টুলু গাঙ্গুলী:-কলকাতা থেকে বিজয়া দুর্গাপূজা দেখতে এলো তার বৌদির সঙ্গে বৌদির বাপের বাড়িতে ৷


এতদিন ধরে তার বৌদি শুধু গল্প করে গেছে তার গ্রামের, তার বাপের বাড়ির দুর্গাপূজার যা আনন্দ যা ঘটা তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না ৷ ছোটোবেলা থেকে একই প্রবহমান আনন্দ ৷ অন্য পাঁচটা গ্রাম থেকে তাদের গ্রামে ঠাকুর দেখতে আসে কত লোকে।
তাদের গ্রামে একটা মাত্র দুর্গা ঠাকুর হয় ডাকের সাজের ৷

বিজয়ার বৌদি এই দুই বছর শহরের প্রাচুর্যের পুজো দেখেছে। দেখেছে কত ঠাকুর পুরস্কার পাচ্ছে, কত আলোর কাজ , কত রকমারি মন্ডপ এক কথায় পূজার চটকটা খুব বেশি কিন্তু এমন পূজা তাদের গ্রামের ঠাকুরের কাছে মলিন হয়ে যায় ৷এসব গল্প শুনতে শুনতেই বিজয়া আকৃষ্ট হয়েছিল তার বৌদির গ্রামের বাড়ির দুর্গা পুজোয় । তাই অনেক উৎসাহে আর আবেগে চলে এলো সে তার বৌদির বাপের বাড়িতে ৷ এসে সে সত্যিই আপ্লুত হল, দেখে মনে হল বৌদি খুব কমই বলেছে এই দুর্গা সম্বন্ধে ৷ দুর্গা পূজার বর্ণনা বাক্যে হয় না, মন কেড়ে নিল।


ঠাকুরের রূপ যেন ডাকলেই সাড়া দেবে ! আশেপাশে গ্রামের লোকের ঢল নেমেছে, মায়ের কাছে অঞ্জলি দেবে বলে ৷ ঢাকের আওয়াজ , ঢোল, কাঁসর , ঘন্টা দেবির আরতী ৷ চারপাশের পরিবেশ যেন এক গ্রাম্য সৌন্দর্য!
হঠাৎ চোখাচোখি হল এক বাইশ তেইশ বছরের ছেলের সাথে। তাকাতে না চাইলেও বারবার চোখ তার দিকেই ঘুরছে কারন বয়সটা তারও যে কম, মাত্র আঠারো উনিশ বছর ৷ ছেলেটিও বারবার তাকাচ্ছে। পুষ্পাঞ্জলীর মন্ত্রও সম্পূর্ণ করে বলতে পারছে না। অন্য ভাবনা ভাসছে মনে ৷ অঞ্জলি শেষ হলো ভিড় কমে আসতে লাগলো ৷ মন্ডপে ছেলেটির সান্নিধ্য ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না বিজয়ার ৷ কিন্তু বৌদির কথায় তখনকার মত বৌদির সঙ্গে বাড়ি ফিরল সে ৷

সন্ধ্যাবেলায় আবার সকলে মন্ডপে যাবে মন বাড়িতে টিকছে না । বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছে এক আবেগ এক আবেশ সে যে কি ভালো লাগা তৈরী হয়েছে বিজয়ার। তার জন্য ক্ষিদে ঘুম সব উড়ে গেছে । শুধু মনে হচ্ছে কখন মন্ডপে যাবে আবার তার গা ঘেঁষে দাড়াবে তার এলো চুল যখন ছেলেটির শার্ট ছুঁয়ে যাবে শিউরে উঠবে তার গোটা শরীর ৷


আর বিকাল হতে না হতেই বিজয়া বৌদিকে বলল আমার খুব মন্ডপের মায়ের কাছে থাকতে ইচ্ছা করছে। বৌদি ভাবল তার গ্রামের পূজা বোধহয় বিজয়ার খুব ভালো লেগেছে। সেই বিকালবেলা থেকে বিজয়া মন্ডপে বসে আছে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চললো, সেই চেনা জানা মুখ আর দেখতে পেল না খুব রাগ হলো তার । ভাবলো শুধু কি আমিই তাকাচ্ছিলাম ও ওতো আমার দিকে তাকাচ্ছিল। বৌদিরাও সবাই মন্ডপে এসেছে। আরতি শুরু হলো ধূপ ধূনার ধোঁয়ায় ঢাকের তালে মায়ের পঞ্চপ্রদীপের আরতি শেষ হল ।


হঠাৎই পঞ্চ প্রদীপ হাতে নিয়ে ছেলেটি বললো এ নাও তাপ নাও ৷ বিজয়ার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে ছেলেটি কিন্তু হেসে ফেলল এবার সকলে তাপ নিল। তাপ নিয়ে বিজয়ার বৌদি বিজয়ার মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে দিল। হাসি আনন্দে আবেগে কাটলো দুর্গাপূজার কটা দিন ৷ আজই তার শেষ দিন।
দশমীর দিন সকালবেলা বিসর্জনের নানা জিনিস সাজানো সিঁদুর খেলার সময় কে কি পড়বে? কতটা সিদ্ধি গোলা হবে সাদা পাতায় আলতা দিয়ে বাঁশের কলমে লিখতে হবে দূর্গা মাইকি জয় ।
এসব নিয়ে ব্যস্ত সকলে ৷ বৌদি একটা হলুদ জামদানি দিয়ে বিজয়াকে বললো তুই এটা ঠাকুর ভাসানের সময় পড়িস ৷

আজ সকালেও তো ছেলেটা এসেছিল তার বন্ধুর সাথে এখন আর কেন দেখতে পাচ্ছে না বিজয়া তাকে ৷ বারবার শুধু সেই আলগা হাসি মাখা মুখটা চোখে ভেসে উঠছে ৷খুব মন খারাপ লাগছে বিজয়ার ৷ সে কি করে বলবে তার মনের কথা ৷ ছেলেটিও খুব লাজুক যদি ছেলেটিও ওকে কিছু না বলতে পারে তো কি করে দুজনে আবার দেখা হবে ?


মনে মনে ভাবে বিজয়া যদি একবার দেখা হয় আর ও একেবারে আই লাভ ইউ বলে দেবে । প্রথম প্রেমের আবেগ অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছে সে ৷ ভাবনা আর কোন গন্ডিতে থেমে থাকে না কল্পনায় রাজ্যে সবকিছু উজার করে দিচ্ছে সে ৷


ঘোর কাটল বৌদির ডাকে, সন্ধ্যা গড়িয়ে এল সকলে মাকে বরণ করছে সিঁদুর খেলছে কিন্তু বিজয়ার মন ভালো নেই ৷ বিসর্জনের নানা আয়োজন, মাকে নিয়ে সকলে গাড়িতে তুলেছে বিজয়া সবকিছু এক পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল তখনই পিছন দিক থেকে কে যেন কাঁদে হাত রাখলো তার কানের কাছে এসে বলল কিগো আমাকেই খুঁজছো তো -সেই চেনা গলাটা ৷ যেটা বিজয়ার দূর্গা মন্ডপে থাকার মূল আকর্ষণ ছিল।

গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ! আজ সে বেপরোয়া আজ আর সে কোনো বাধা নিষেধ মানবে না । বিজয়ার ঠোঁট কাঁপছে, শরীর অসাড় নড়াচড়ার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। তার সেই কাঁধে রাখা হাতটা নিয়ে গেল তাকে এক নির্জন পোড়ো বাড়িতে ৷




ফিসফিসিয়ে বলল ছেলেটি আমাকে খুঁজছো তো ?
ছেলেটি ঠোঁটে ঠোঁট রাখে আস্তে আস্তে সব বাঁধ ভেঙে গেল। একে অন্যে দৈহিক সুখে ভেসে গেল সারা শরীর। কল্পনা গুলো সব বাস্তবতা পেল বিজয়ার। এখনো ঘোর কাটেনি। বিজয়া কোনমতে নিজেকে সামলে আবার মা দুর্গার কাছে ফিরে এল ৷
বিজয়া এবং সকলে দেখে পুলিশের গাড়ি সেখানে থামলো ৷

পুলিশ বললো – চারজন যুবক এক নয় বছরের শিশুকে গণধর্ষণ করেছে ৷দুজনকে পুলিশ অলরেডি ধরেছে ৷

একজন এই গ্রামেতেই তার বন্ধুর বাড়িতে গা ঢাকা দিয়ে আছে। একজন এখোনো অধরা ৷খানিক বাদে পুলিশ যে ছেলেটাকে গাড়িতে তুললো সে আর কেউ নয় বিজয়া যার কাছে তার সবকিছু উজার করে দিয়ে এসেছে সেই ছেলেটি ৷ গ্রামের সকলে তো হতবাক হয়ে গেল নানা কথা বলতে লাগলো ৷

আর একজন অচেতন পদার্থের মতো বাড়ি ফিরে এলো। সেদিন এক দুর্গার বিসর্জন হলো ঠাকুর পুকুরের জলে ৷ আর একজনের বিজয়া হল পাখায় টাঙ্গানো হলুদ জামদানিতে ৷

সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read