নিজ গুরু এবং শিক্ষা স্থল দ্বারা প্রদত্ত গুরুদ্বায়িত্বকে নিজের জীবনের বাজী রেখে কিভাবে সম্পূর্ণ করা যায় তারই অন্যতম আদর্শ প্রতিস্থাপন করেছিলেন একনাথ রামকৃষ্ণ রানাডে। সংঘের অনুশাসন এবং বিচারধারায় নির্মিত ইস্পাতের ন্যায় শক্তিশালী সব দুর্গম দুর্যোগকে হারিয়ে জয়ী ব্যক্তিত্বই হলেন একনাথ রানাডে।
তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারীতে আজকের বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল বা বিবেকানন্দ শিলা স্মৃতিসৌধ স্থাপনের অন্যতম ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিত্ব হলেন একনাথ রামকৃষ্ণ রানাডে।
মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার ছোট্ট গ্রাম তিতিলা । সেখানে না ছিল কোনো সুযোগ না ছিল কোনো সুবিধা।সেখানেই সরসংঘচালক একনাথ রানাডে ভূমিষ্ঠ হন ১৯১৪ সালের ১৯ নভেম্বর ।
ছোট্ট সে গ্রামে শিক্ষার আলো বলতে কিছুই ছিলনা। একারণে একনাথজী নাগপুরে চলে আসেন ।
নাগপুরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কাশীনাথের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করেন। ভ্রাতার বাড়ির কাছেই ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শাখা। ছাত্রাবস্থায় সহজাত কৌতূহল নিয়ে শাখার ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করতেন। সংযোগবশত সঙ্ঘ প্রধান ডক্টর কেশব বলিরাম হেগডগেওয়ারের সাথে পরিচয় ঘটে এবং সংঘের বালক শাখায় তার দেশসেবার শিক্ষা শুরু হয়।
জব্বলপুরে কাজ করার সময় তিনি একটি অদ্ভুত পন্থা নেন। তিনি কংগ্রেসের প্রতি অধিবেশনে যেতেন। এমনকি তাঁকে ত্রিপুরী কংগ্রেসের অধিবেশনেও দেখা যায়। কি করতেন সেখানে ? কংগ্রেসের মত সুবিশাল শক্তিশালী দলের শক্তিকে নিজের দিকে আকর্ষণ ক্রতে যেতেন। সেখানে তাঁর কথার মাধুর্যের বন্ধু বানাতেন এবং তাঁদের ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকের দিকে আকর্ষন করে নিয়ে আসতেন।
১৯৪৮ সাল , গান্ধীজী হত্যা হলেন। তখন একনাথজী মধ্যপ্রদেশে কাজ করছেন। নেহেরুর কংগ্রেস সরকার সংঘকে নিষিদ্ধ করেছিল। সংঘ এই কালানিয়মের বিরুদ্ধে যে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। ভিতর থেকে তারও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন একনাথজী।
১৯৪৯ সালের ১১ জুলাই নিষেধাজ্ঞার অবসানে সংগঠনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাসিত হিন্দুদের পুনর্বাসনের জন্য সংঘ কলকাতায় ‘বাস্তুহারা সহায়তা কমিটি’ গঠন করে। এই প্রকল্পের সমস্তকাজ একনাথ পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫২ ক্ষেত্রীয় প্রচারক হিসাবে বাংলা,আসাম,উড়িষ্যা,দিল্লি,পাঞ্জাব সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন।
নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে একনাথ রানাডে ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে মূল ভূখণ্ড হতে ৪০০ মিটার দূরে বিবেকানন্দ শিলার উপর অপরূপ সুন্দর ‘বিবেকানন্দ শিলা স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ করে তিনি নিজ আদর্শের প্রতি তার একাগ্র সাধনা, কঠোর সংকল্প ও সকল কাজে পরম উৎকর্ষের প্রতি তার তীক্ষ্ম আগ্রহের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। স্থানীয় ধর্মান্তরিত খ্রীষ্টান মানুষের আপত্তি, রাজ্য সরকারের বিরোধিতা, কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতিতে দীর্ঘসূত্রতা সহ স্মারক নির্মানের প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান প্রভৃতির জন্য তার মত এক সমন্বয়কারী ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল সেই মুহূর্তে। বিবেকানন্দর জন্মশতবর্ষে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করে যে প্রভূত খ্যাতি তিনি অর্জন করেছিলেন সেটির সাথে তার রাজনৈতিক অলিন্দে অবাধ বিচরণ,রামকৃষ্ণ মিশনের সান্নিধ্য সর্বোপরি সঠিক কর্মযোগ দীক্ষিত হওয়ার কারণে সব কিছু যেন তার কাছে সহজ হয়ে গিয়েছিল। স্মৃতি সৌধ নির্মাণের জন্য ১.২৫ কোটি টাকার অর্থ সংগৃহীত হয় ও বিবেকানন্দ জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় ১১৯৭০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে। এখন এটি তীর্থক্ষেত্র হিসাবে সমগ্র ভারত ও বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের কাছে আকর্ষণ স্থল হিসাবে পরিণত হয়েছে।
একনাথ রানাডে সংঘের কাজ, সমাজ সেবা মূলক কাজকর্ম ছাড়াও পত্রিকা সম্পাদনার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন। বিবেকানন্দ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘যুবভারতী’ নামে ইংরাজী মাসিক, ‘ব্রহ্মবাদিন’ নামে ইংরাজী ত্রৈমাসিক ও ‘বিবেকানন্দ কেন্দ্র পত্রিকা’ নামে ইংরাজী ষান্মাসিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। একসময় তিনি ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রকের অধীন ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস এর সদস্য ছিলেন।
১৯৬২ সালের ২২ আগস্ট গণেশ চতুর্থীর দিন একনাথ রানাডে প্রয়াত হন।আজও অধিকাংশ ভারতবাসী তথা বাঙ্গালী জানেই না যে কন্যাকুমারিতে বিবেকানন্দ স্মৃতি সৌধ কার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় নির্মিত বা বাস্তুহারা উন্নয়ন সমিতির কাজ কে করেছিলেন? তবুও একনাথ জী অমর হয়ে আছেন তাঁর কর্মযোগ দ্বারা। আদন্ত বিবেকানন্দ অনুগামী এই মানুষটিকে এখন সংবাদ পরিবার জানায় শতকোটি প্রণাম







