Select Language

[gtranslate]
১৮ই চৈত্র, ১৪৩২ বুধবার ( ১লা এপ্রিল, ২০২৬ )

শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শতকোটি প্রণাম।

সুস্মিত মিশ্র
‘‘রেখার রঙে তীর হতে তীরে

ফিরেছিল তব মন

রূপের গভীরে হয়েছিল নিমগন।

গেলা চলি তব জীবনের তরী

রেখার সীমার পার,

অরূপ ছবির রহস্য মাঝে

অমল শুভ্রতার।’’

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে যে সব উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ভারতের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির জগৎকে আলোকিত ও আলোড়িত করেছিলেন, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদের অন্যতম। পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ ও অনুজ অবনীন্দ্রনাথ যতটা সুপরিচিত, মেধায় সৃষ্টিশীলতায় ব্যক্তিত্বে কোনও অংশে কম না হয়েও গগনেন্দ্রনাথ কিছুটা অপরিচিত রয়ে গিয়েছেন।



১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নিয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথ।সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন গগনেন্দ্রনাথ ছবি এঁকে পুরস্কৃত হন। আর্ট স্কুলের শিক্ষক হরিচরণ বসুর কাছে তিনি ছবি আঁকা শেখেন। পরিণত বয়সেই তিনি প্রধানত ছবি আঁকার চর্চা করেছেন।

১৯০৫-এ জ্যেষ্ঠপুত্র গেহেন্দ্রনাথের অকালমৃত্যুর গভীর শোকাঘাত যখন তাঁকে অন্তর্মুখী করে দেয়, তখন ক্ষেত্রনাথ শ্রীমানির কথকতা ও শিবু কীর্তনিয়ার কীর্তনগান তাঁর চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনে। কালি কলম ও রংতুলির মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ থেকে তাঁর শিল্পীজীবনের প্রকৃত সূত্রপাত হয়।



গগনেন্দ্রনাথ বহু এবং বিচিত্র ছবি এঁকেছেন।কখনো প্রাচ্যধারায় নিসর্গচিত্র।জাপানি ওয়াশ পদ্ধতিতে মিস্টিক চিত্রকলা অথবা পাশ্চাত্য কিউবিক পদ্ধতিতে ‘দ্বারোকাপুরী’-মতো স্থাপত্যচিত্র।গগনেন্দ্রনাথ লিখতেন মূলত ছোটদের জন্য তার লেখা ‘ভোঁদরবাহাদূর’আজও সমান জনপ্রিয়।জাপানী কায়দায় জোড়াসাঁকোতে বাগান তৈরি করেছিলেন।ফার্নিচার বানিয়েছিলেন ভারতীয় ডিজাইনে। গগনেন্দ্রনাথ ছিলেন দক্ষ সংগঠক,মূলত তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট’।হস্তশিল্পদের এবং কুটির শিল্পীদের জন্য তৈরি হয়েছিল ‘বেঙল হোম ইন্ডাস্ট্রিজ’।


স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে বিলিতি পর্দা, বিলিতি আসবাব, বিলিতি তেল রঙের ছবি দূর করেছেন গগন। বদলে ঠাকুরবাড়িকে সাজিয়েছেন দেশীয় শিল্প-স্থাপত্যে। ‘বেঙ্গল হোম ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে বাংলার কুটির শিল্পকে প্রাণ দিলেন। এক দিকে যখন লাট রোনাল্ডসে শিল্পী গগন ঠাকুরের শিল্প ভাবনায় মুগ্ধ হয়ে ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টস’-এর জন্য মাসিক সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করছেন, অন্য দিকে সোসাইটির সম্পাদক তথা প্রতিষ্ঠাতা গগনও স্থির করে ফেলেছেন ইংরেজ সরকারের তাবেদারি করবে না তাঁর শিল্পবোধপ্রসূত সংস্থাটি।

গগনেন্দ্রনাথের নিদিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল।যদিও সেটিকে কোন ছাঁচে ফেলা যায় না।তিনি যে কোনও রাজনৈতিক স্ববিরোধ এবং ভণ্ডামিকে তার ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে আক্রমণ করেছেন।তাই তাঁর রং-তুলিতে সমালোচিত হয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ-চিত্তরঞ্জন-মহাত্মা গান্ধীরা।




এখানেই শেষ নয়,অনেকের জানা নেই ইংরেজদের দেওয়া ‘ব্ল্যাক আন্ড হোয়াইট ক্লাব’ নামের প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। ওই ক্লাব গড়লেন কলকাতায় বসবাসকারী ইংরেজ সাহেবরা। ভারতীয়দের দাক্ষিণ্য দেখিয়ে সাদা আর কালোয় ছাপা হল সভ্য কার্ড। ওই ক্লাবের সভ্য তিনিও। গগন রুখে দাঁড়ালেন। চলল প্রচার, আন্দোলন। শেষে সাহেবরা ওই নাম প্রত্যাহার করে নিল।

সেটিই এখন এ শহরের ‘ক্যালকাটা ক্লাব’। বাংলার বাবুদের বিত্ত হয়তো এ কালেও বজায় থাকত। তবে গগন ঠাকুর না থাকলে আত্মসম্মানটি থাকত না!



১৯৩০ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলেন।১৯৩৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের ছেড়ে গেলেন চীরতরে,শুধু বেঁচে রইল তাঁর রং-তুলি আর নামের সার্থকতা।



রবির আলোকে ঢাকা পড়ে যাওয়া গগনকে হারিয়ে ব্যাথাতুর কাকা রবীন্দ্রনাথ লিখলেন

‘‘রেখার রঙে তীর হতে তীরে

ফিরেছিল তব মন

রূপের গভীরে হয়েছিল নিমগন।

গেলা চলি তব জীবনের তরী

রেখার সীমার পার,

অরূপ ছবির রহস্য মাঝে

অমল শুভ্রতার।’’

হে শিল্পী জন্ম দিবসে আপনাকে কুর্নিশ জানায় এখন সংবাদ পরিবার

Related News

Also Read