দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভূমিকা সম্পর্কে অবগত নন, এমন বাঙালি বিরল। সেই একই পরিবারে জন্মেছিলেন অন্যতম আর এক স্বাধীনতা কর্মী, তা বোধহয় আমরা অনেকেই জানি না। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদানও কোন অংশে কম ছিল না।তিনি শরৎ চন্দ্র বসু।
নেতাজীর মেজ ভাই ব্যারিস্টার শরৎচন্দ্র বসু ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহন করেন। পড়াশোনা প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডে যান ব্যারিস্টারি পড়তে।শরৎচন্দ্র ইংল্যান্ড থেকে ফিরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেন। এর আগে তাঁর বিবাহ হয়েছে বিভাবতী দেবীর সঙ্গে। তিনি ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার সম্পাদকও হন। প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়ে ভোটে লড়েন এবং জয়লাভও করেন। তিনি ছিলেন কলকাতা পুরসভার অল্ডারম্যান। তখন মেয়র ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এবং চিফ এক্সেকিউটিভ অফিসার সুভাষচন্দ্র বসু।
১৯২১ সালে সুভাষচন্দ্র যখন আইসিএস পরীক্ষায় দারুণ ফল করেও আইসিএস না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর আত্মীয়পরিজন এই সিদ্ধান্তকে পাগলামি বলেছিলেন। সুভাষচন্দ্র তাঁর মেজদাদা শরৎচন্দ্রকে চিঠিতে লেখেন— আমি কেবল আপনার অনুমোদন এবং আশীর্বাদ চাই। যে বিপদসংকুল পথে আমি এগিয়ে যেতে চাইছি, সেই সিদ্ধান্তের জন্যে আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দলে যুক্ত হয়ে তাঁর রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে। এরপর ১৯৩৬ সালে তিনি প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সমিতির সদস্য হিসাবে কাজ করেছেন। রাজনীতিবিদ হিসাবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা।
১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্রের নিষ্ক্রমণের পর শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রকে ডেকে পাঠান। নিভৃতে কবি তাঁকে বলেন, আমার কাছে সব কথা খুলে বলতে পারো। শরৎচন্দ্র সব কথাই কবিকে খুলে বলেন। পরে শরৎচন্দ্র বসু বলেছেন, কবির কাছে সত্য গোপন করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে শরৎচন্দ্র বসু কিছুটা তাঁর অনুজ সুভাষচন্দ্রের আড়ালে পড়ে গেছেন।
বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, ওকালতি করেছেন। কিন্তু শরৎচন্দ্র ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি।১৯৪৬ সালে শরৎচন্দ্র সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভের নেতা নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তিনিই হয়েছিলেন পার্লামেন্টে বিরোধী দলনেতা। কিন্তু ক্রিপস মিশন এবং ওয়াভেল পরিকল্পনা নিয়ে কংগ্রেস নেতাদের তীব্র মতপার্থক্য উপস্থিত হয়। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনারও তিনি কড়া বিরোধিতা করেন। তিনি বলেছিলেন— ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন চলবে না। তার চেয়ে বরং ভাষার ভিত্তিতে তোমরা বাংলার গঠন করো।
১৯৫০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জননেতা শরৎচন্দ্র বসুর প্রয়াণ হয়।আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ লিওনার্ড এ গর্ডন, শরৎচন্দ্র বসু ও তাঁর ভাই সুভাষচন্দ্র বসুর একটি যৌথ জীবনী লিখেছেন, যার নাম ‘ব্রাদার্স এগেইনস্ট দ্য রাজ’। হতে পারে বাস্তবায়িত হয়নি তাঁর স্বপ্ন, তবুও আপামর বাঙালির আবেগ ও দেশপ্রেমের পক্ষ নেওয়ার জন্য ভারতের এই দৃঢ়চেতা সন্তানকে এখন সংবাদ পরিবার কুর্নিশ জানাচ্ছে






