Select Language

[gtranslate]
১৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ সোমবার ( ২৯শে জুন, ২০২৬ )

।। জন্মমৃত্যুতত্ত্ব- বাজিকরের ভেলকি ।।

ঠাকুর শােক সম্বন্ধে এই সকল কথা বলিতেছেন, এদিকে ঘরের উত্তরের দরজার কাছে সেই শােকাতুরা ব্রাহ্মণিটি দাঁড়াইয়া আছেন। ব্রাহ্মণী বিধবা। তার একমাত্র কন্যার খুব বড় ঘরে বিবাহ হইয়াছিল। মেয়েটির স্বামী রাজা উপাধিধারী, — কলিকাতানিবাসী, — জমিদার। মেয়েটি যখন বাপের বাড়ি আসিতেন, তখন সঙ্গে সেপাই- শান্ত্রী আসিত, — মায়ের বুক যেন দশ হাত হইত। সেই একমাত্র কন্যা কয়দিন হইল ইহলােক ত্যাগ করিয়া গিয়াছে।

ব্রাহ্মণী দাঁড়াইয়া ভাইপাের বিয়ােগ জন্য শ্রীরাম মল্লিকের শােকের কথা শুনিলেন। তিনি কয়দিন ধরিয়া বাগবাজার হইতে পাগলের ন্যায় ছুটে ছুটে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করিতে আসিতেছেন, যদি কোনও উপায় হয়; যদি তিনি এই দুর্জয় শােক নিবারণের কোনও ব্যবস্থা করিতে পারেন। ঠাকুর আবার কথা কহিতেছেন —

শ্রীরামকৃষ্ণ (ব্রাহ্মণী ও ভক্তদের প্রতি) একজন এসেছিল। খানিকক্ষণ বসে বলছে, যাই একবার ছেলের চাঁদমুখটি দেখিগে।

“আমি আর থাকতে পারলাম না। বললাম, তবে রে শালা! ওঠ এখান থেকে। ঈশ্বরের চাঁদমুখের চেয়ে ছেলের চাঁদমুখ?”

(মাস্টারের প্রতি) “কি জানাে, ঈশ্বরই সত্য আর সব অনিত্য! জীব, জগৎ, বাড়ি-ঘর-দ্বার, ছেলেপিলে, এ- সব বাজিকরের ভেলকি। বাজিকর কাঠি দিয়ে বাজনা বাজাচ্ছে, আর বলছে, লাগ লাগ লাগ! ঢাকা খুলে দেখ, কতকগুলি পাখি আকাশে উড়ে গেল। কিন্তু বাজিকরই সত্য, আর সব অনিত্য! এই আছে, এই নাই!

“কৈলাসে শিব বসে আছেন, নন্দী কাছে আছেন। এমন সময় একটা ভারী শব্দ হল। নন্দী জিজ্ঞাসা করলে, ঠাকুর! এ কিসের শব্দ হল? শিব বললেন, ‘রাবণ জন্মগ্রহণ করলে, তাই শব্দ। খানিক পরে আবার একটি ভয়ানক শব্দ হল। নন্দী জিজ্ঞাসা করলে — ‘এবার কিসের শব্দ?’ শিব হেসে বললেন, এবার রাবণ বধ হল!’ জন্মমৃত্যু — এ-সব ভেলকির মতাে! এই আছে এই নাই। ঈশ্বরই সত্য আর সব অনিত্য। জলই সত্য, জলের ভুড়ভুড়ি, এই আছে, এই নাই; ভুড়ভুড়ি জলে মিশে যায়, — যে জলে উৎপত্তি সেই জলেই লয়।

“ঈশ্বর যেন মহাসমুদ্র, জীবেরা যেন ভুড়ভুড়ি; তাঁতেই জন্ম, তাঁতেই লয়। ছেলেমেয়ে, যেমন একটা বড় ভুড়ভুড়ির সঙ্গে পাঁচটা-ছটা ছােট ভুড়ভুড়ি। ঈশ্বরই সত্য। তাঁর উপরে কিরূপে ভক্তি হয়, তাঁকে কেমন করে লাভ করা যায়, এখন এই চেষ্টা করাে। শােক করে কি হবে?”

সকলে চুপ করিয়া আছেন। ব্রাহ্মণী বলিলেন, “তবে আমি আসি।”

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতঃ

Related News

Also Read