Select Language

[gtranslate]
১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ মঙ্গলবার ( ৩১শে মার্চ, ২০২৬ )

চুনোমাছ ।।

কাকলি মৌমিতা সরকার :-রিমিতার বাবার বাড়ি এবং শশুর বাড়ির খাওয়া দাওয়া, রীতিনীতি সব কিছুর মধ্যেই বিস্তর ফারাক । প্রায় এক বছর হতে চললো,, শত চেস্টা সত্বেও কোনো কিছুরই কুল কিনারা করতে পারছে না রিমিতা। বিয়েটা দেখাশুনো করেই। সরকারি স্কুল শিক্ষক অরুণ কে কারোর অপছন্দ হয় নি। কিন্তু সমস্যা ছিল অরুনের ঘর-বাড়ি না থাকা টা। সদ্য লোন নিয়ে জায়গা কিনে, কোনো রকমে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছে মাত্র।তাই রিমির বাকি আত্মীয় স্বজন – মামা ,কাকার পছন্দ ছিল না । কিন্তু অরুনের বাড়ির আগ্রহ দেখে ,শেষ মেশ বিয়েটা হল। দেখাশোনার তিন মাস পর বিয়ে হয় ওদের। আসলে নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে অনেক সংগ্রাম করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো অরুণ কে দেখে, রিমির বাবার নিজের কথা মনে পড়ছিল। উনি ও যে অনেক কষ্টে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ,এই জায়গা টা অর্জন করেছেন । একজন সফল পাট ব্যবসায়ী । তিনি বুঝেছিলেন পয়সা একটু কম থাকলেও মানুষ টা খাঁটি হবে। আর এখন বড়লোক পরিবার গুলোর , বধূ নির্যাতনের খবর , খবরের শিরোনামে থাকে ।যাক বাবা , এই ভালো ,চাকরি যখন করে ,একদিন ঠিক ই সব হবে , আর আমি তো আছি ই,সুবিধে অসুবিধা হলে।

রিমিতা বাড়িতে বেশ আদরেই বড় হয়েছে ,বাকি দুই ভাই বোনের সাথে । রিমিতা বড়,তারপর একটি ভাই ও বোন। শুশুর বাড়িতে কাঠে রান্না। গ্যাস ওভেন থাকা সত্ত্বেও শাশুড়ি মা ব্যবহার করতে দেন না, নিজের কথা বলতে থাকেন , খুব কষ্ট করেছি । রিমির ও কষ্ট হয় শুনে খুব। নিজের চেষ্টায় সব কাজ গুলো শিখতে থাকে । শাশুড়ি কখনো দেখিয়ে দেন না ,আবার নিজের সঙ্গেও অবিরাম তুলনা করতে থাকেন। একদিন উনোনে রান্না করতে গিয়ে রিমির শাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ায় ,ভীষন ভয় পেল ও । বাবার বাড়ি এসে মা কে যখন বলতো …ওর মা বলতো, সাবধানে কাজ করতে।মেয়েরা যতই শিক্ষিত হোক না কেন,যত বড় কিছুই হয়ে যাক না কেন ,, রান্না বান্না , ঘরকন্নার কাজ তো করতেই হবে ।বাড়ির কাজ তো করতেই হবে ।আর উনি বয়স্ক মানুষ, নিজে জীবনে কি ই বা পেয়েছেন, তাই তোকে অমন বলতে থাকেন ,এতে এত মন খারাপ করার কিছু নেই। ।

রিমির বাবা বিয়েতে গা ভর্তি গয়না সহ সমস্ত জিনিস পত্র রিমি কে দিয়েছেন। আবার নগদ টাকা ও ।কিন্তু ব্যাপার টা একটু ঘুরিয়ে, বিয়ের ঠিক কিছুদিন আগে ,অরুণ গিয়ে উপস্থিত হয় ,, নানা কথার পর বলে ,,,,,, আমার তো সদ্য সদ্য লোন ।জমানো টাকাও নেই। বৌ-ভাত ও করতে হবে, নাহলে খারাপ দেখায় , যদি কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন ,এই মুহূর্তে । রিমির বাবা ,সমরেশ বাবু বলেন, বেশ তো,,, আরে তুমি ওতো কিন্ত কিন্তু করছো কেন…কি রকম কি খরচ করছো, কত প্রয়োজন বলো । এই ভাবে দু লক্ষ টাকা অরুনের হাতে তিনি দেন ।

প্রথম থেকেই ,তবুও তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না , রিমির শাশুড়ি ।সব সময় বলতে থাকতেন , অরুনের জন্য কত দিদিমণির সম্বন্ধ এসেছে ,,,,,, একজন তো বলেছিল বাড়ি ঘর সব করে দেব । আমাকেও হাতের বালা ,গলায় হার দেব । রিমি কষ্ট পায় খুব। অদ্ভুত ভাবেই উনি অরুনের সামনে ভালো ব্যবহার করেন ।আর ওর স্কুল চলে যাবার পর এরকম বলতে থাকেন ।তাতে সাথে জোট বাড়ির পাশেই থাকা ননদ লিপিকা। উনি অরুনের বড় দিদি। রিমি মা কে জানায় … মা বলে ,আসলে উনি অভাবের সংসারে কখনো নিজের শখ পূরণ করতে পারেন নি তো ,তাই হয়ত অমন বলেছেন। একটা কাজ কর আপাতত, তোর তো দুই জোড়া বালা ,,, এক জোড়া ওনাকে দিয়ে দে । তোকে কিছুদিন পরে বাবা কিনে দেবে । রিমি বলে আর দিতে হবে না মা ,, থাক । রিমি গিয়ে ওর শাশুড়ি কে বালা জোড়া দিয়ে দেয় ।

পরের দিন সকালে ওর ননদ এসে বলে ,ভাইয়ের বিয়েতে দিদিরা কত কিছু উপহার পায় ,আমার কপাল দেখো ,আমি ই কিছু পেলাম না । এই কয় মাসে রিমি আর কিছুর সাথে খাপ খাওয়াতে না পারুক এদের মানসিকতা বেশ বুঝেছে । রিমি ওর মামার দেওয়া নেকলেস টা ,ননদের হাতে তুলে দেয় । রিমি ভেবেছিল এবার হয়ত সবাই কে ও খুশি করতে পেরেছে ।

রিমির আসলে অভিযোগ করা পছন্দ নয়। আর অরুনের সাথে তেমন ভাবে ওর কোন কথাও হয় না। অরুণ একটু কেমন যেন, কথা খুব কম বলে। প্রয়োজনের বাইরে কোন কথা হয় না ওদের। প্রথমে অদ্ভুত লাগলেও রিমি বুঝেছে এটাই ওর ধরন। কথা ও সবার সাথেই কম বলে ।

মোটামুটি অবস্তাপন্ন ঘর থেকে আসা রিমির এই নিম্মমধ্যবিত্ত পরিবারে মানিয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ,কোথাও যেন গিয়ে ও কিছুতেই পেরে উঠছে না। সবেতেই ভুল ধরেন শাশুড়ি মা। এদিকে ননদ নিজের রান্না নিজে করে না, রোজ সবটাই এই বাড়ি থেকে যায় । সবাটাই মেনে নিয়েছে ও ।কারণ সমরেশ বাবু বলেছেন-ছেলেটা বড্ড ভালো রে মা ,নাহলে আজকাল এরকম করে কেউ করে , তোর যদি কোনো অসুবিধা থাকে ,তোর ভাই তোকে দেখবে না,বল……রিমি চুপ থাকে ।ভেবে দেখে ঠিকই তো …….

রিমির ভীষন কষ্ট হয় , সব কাজ কর্ম গুছিয়ে করতে । তার ওপর ওর বি এডের তৃতীয় সেমিস্টার এর পরীক্ষা চলে আসে । পড়তেও হবে । রিমির বাবার মেয়েদের চাকরি করা পছন্দ নয়। শিক্ষিত হোক , সন্তানের পড়াশোনার দিক টা ভালো ভাবে দেখতে পারবে । তাই ওনার রিমির বি এড করাতে খুব একটা আগ্রহ ছিল না, রিমির মুখের ওপর না বলতে পারেন নি তাই। কখনো মেয়েটা তো শখের জিনিস কিনবো বা জেদ করে এই লাগবে সেই লাগবে বলেনি, বড় ভালো মেয়েটা ,তাই উনি রাজি হয়েছিলেন।

পরীক্ষার আগে রিমির শাশুড়ি অসুস্থ হন। তাই ওর বাবার বাড়ি গিয়ে থাকা হয় না। কলেজ বাবার বাড়ির কাছে হওয়ায় ভেবেছিল কটা দিন ওখানে থেকে পরীক্ষা টা দেবে ।সব কাজ গুছিয়ে রিমি পরীক্ষা দিতে যায় ।এক ঘন্টা বাস জার্নি করে। আবার ফিরে এসে রাতের রান্না । একদিন পাশের বাড়ির এক কাকিমা বলে ,,,, তোমার শাশুড়ির কিছুই হয়নি ,উনি দিব্যি তো সারাদিন মেয়ের বাড়ি গিয়ে গল্প করছেন, মেয়ে আসে । রিমি গুরুত্ব দেয় না। অসুস্থ মানুষ তাই হয়ত চলে যান,দিদির বাড়ি।

পরীক্ষা শেষ হয় ,,রিমি বাড়ি ফেরে। আজ একটু আগেই ফিরে এসেছে। দেখছে শাশুড়ি মা এবং ননদ গল্প করছে, ,, বড়লোকের মেয়ে,যত কিছু আদায় করা যায় বুঝলে , ভাই টা ও হয়েছে বোকা, ওর বাবা তো বলেইছিল সুবিধা অসুবিধা দেখে দেবে , তাহলে ভাই দাবি করতে পারছে না…….

আজ প্রথম বার নয়, এরকম কথা রিমির কানে আগেও ভেসে এসেছে । অরুনের ফোনালাপ ও কানে এসেছে । পুরোনো প্রেমিকা। যিনি কলেজে লেকচারার হয়ে যাওয়ায় , গরিব অরুণ কে আর বিয়ে করেন নি ।সাত বছরের প্রেম নিমেষেই ভুলে যান। অরুণ নাকি অনেক কাকুতি -মিনতি করেও প্রেয়সী কে ফেরাতে সক্ষম হয় নি । অনেক চিঠি পেয়েছে রিমি বই এর তাক থেকে, বই এর মধ্যে থেকে , কষ্ট পেয়েছে খুব , কিন্তু,গুরুত্ব দেয় নি। থাকতেই পারে মানুষের ।কিন্তু পুরোনো প্রেম বিয়ের পর জেগে উঠলে মুশকিল। এই একটাও কারন হয়ত অরুনের কম কথা বলার ।বিয়ে টা হয়ত আবেগের বশে করে নিয়েছিল । বিয়ের আগেও তো রিমির সাথে তেমন কথা বলেনি। শিক্ষক স্বামী তো আর পাঁচ জনের মত সারাক্ষন ফোনে কথা বলবে না, রিমি তাই ভেবেছিল। সব কিছুর পিসিটিভি দিক দেখে এসেছে এত দিন…….।

রিমির কষ্ট হয়নি সেটা নয়। মনে হয়েছে বাবা বেশি উদারতা দেখাতে গিয়ে ওর জীবনটা নিয়ে ছিনিমিনি খেললো। মা কেও বলতে গেলে.. মা বলেছে,,, জীবনে অনেক খারাপ সময় আমিও পার করেছি । তুই ও একদিন ভালো থাকবি খুব।একটু আধটু মানিয়ে নিতেই হয়। তোর বাবার একটা মান সম্মান রয়ে ছে, সেটা বজায় রাখিস ,বুঝলি ….।

রিমি বেশ বুঝতে পারে,বাড়িতে কিছু বলে আর লাভ নেই। এদিকে রাত জাগা ওর প্রায় অভ্যেস হয়ে গেছে। দিনে সময় নেই। বই নিয়ে বসলেই শাশুড়ি মা নানা কাজের কথা বলতে থাকেন ।তাই আর বসা হয়না। ফর্সা রঙ টা তামাটে হয়ে গেল। চোখের নিচে কালি। এদিকে অরুনের লেকচারার বান্ধবীর ফোনে কথা নিয়ে ,, একদিন রিমি থাকতে না পেরে বলেই ফেললো,,, তোমার উচিত হয়নি , এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করা, আরো সময় নিয়ে বোঝাতে পারতে । আমার জীবন টা এভাবে নষ্ট না ও করতে পারতে। অরুণ রেগে যায়…. বলে ,কেন তোমায় কি মারধোর করছি না, না কিছু .., রিমি আর কিছু বলে না, শুধু ভাবতে থাকে ,এরকম টা ওর সাথে কেন হচ্ছে ..….. এই জন্য অরুণ প্রথম থেকে এমন। এত কম কথা বলে , এত খাপছাড়া ভাব, উদাসীনতা, কোন কেয়ার না করা রিমির। কোন কিছুতেই তো কখনো আগ্রহ দেখায় নি জানার…. কি করে রিমির হাত পুরলো ,বা কেটে গেল ।বা রিমির কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা, বা ও কি পছন্দ করে ,করে না, বা ওর কিছু প্রয়োজন কিনা। রিমি ও তাই আর বলতে যায় নি কখনো।সেই প্রথম বিয়ে হলে ,নতুন নতুন যে একটা… দুজন দুজনকে জানার বা কাছে পাবার যে আগ্রহ ,সেরকম কিছুই হয়ত নেই তাই।

রিমি কখনো কিছু না বলে সব চুপ করে মেনে নিচ্ছে। জোরে কথা বলা তার আসে না। ঝগড়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। যখনই ওর পরীক্ষা থেকেছে , শাশুড়ি অসুস্থ হয়েছে এবং তার চুনো মাছের ঝাল, চুনো মাছের টক এসব ছাড়া মুখে রোচে নি কিছু । রিমি সবই বোঝে। এখনো আর কিছু দিন পর নেট পরীক্ষা। রিমি অনেক দিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে । আর এখন তো জেদ, পারতেই হবে। অরুণ যে তুলনা করেছে , কখনো পারবে চন্দনার মত লেকচারার হতে।
মা বাবা কে এসব আর জানায় নি রিমি।কষ্ট পাবে। এমনিই আত্মীয় স্বজন সবাই গর্ব করে রিমি কে নিয়ে।কি সুন্দর সংসার করছে মেয়েটা,সব মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে। তারপর এসব কথা যদি জানাননি হয়ে যায়, রিমি নিজেই অপমান বোধে ভুগতে থাকে।

রিমি ভাবে , যে মানুষ টা ভালো চাকরি পেয়ে ছেড়ে যায় তাকে ভালোবাসা যায় , আর যে সব টা মানিয়ে নিয়ে , ভালোবাসে , তাকে ভালোবাসা যায় না। কি অদ্ভুত। রিমির মনে পড়ে,, ওর কাকিমারা ওকে বলতো, তুই এত সুন্দর দেখতে, শান্ত লক্ষী মেয়ে আমাদের , তোকে দেখবি তোর বর খুব ভালোবসবে, যত্নে রাখবে ………. রিমির চোখে জল আসে ।

সকালে বাজার থেকে এসে , অরুণ ছাদে চলে যায়। রিমির বাবার করে দেওয়া ছাদ। রিমিও ছাদে যায়, বাসি জামা কাপড় ধুয়ে মেলতে, শুনতে পায় …. অরুণ ফোনে বলছে ,,, তুমি তো তখন আমার কোনো কথা শুনলে না, চলে গেলে ,,, এখন কান্না করছো,,, আমি কি করতাম, , কিছু দিন সময় দাও। ওতো সহজ নয় ব্যাপার টা। ডিভোর্স কি ওতো সহজে দেওয়া যায় ……..

রিমির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল ….. কাঁদতে কাঁদতে নেমে এলো,, সিঁড়ি বেয়ে। নেমেই শাশুড়ি মা ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলো,,, মাছ গুলো ব্যাগ থেকে বের না করে, বরের পেছন পেছন গেলে যে …… রিমি রান্না ঘরে গেল। সেই চুনো মাছ । ওর যে আর ক দিন পর পরীক্ষা, এবার তো শাশুড়ি অসুস্থ হবেন, মুখে রুচি নেই তাই আজ থেকেই । চোখের জল ধরে রাখতে পারে না, অঝোরে কাঁদতে থাকে । টপ টপ করে চোখের জল চুনো মাছ ভর্তি গামলায় পড়তে থাকে। ।

সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read