Select Language

[gtranslate]
২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বৃহস্পতিবার ( ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

।। কন্যাসন্তান ।।

কন্যাসন্তান:অন্তরা নন্দী
কিছুক্ষণ আগে দ্বিতীয় বারের মতো কন্যাসন্তানের মা হল চৈতি। প্রথমবার মা হবার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম হয়। প্রথম সন্তান আরশীকে দেখার পর যে অনুভূতি হয়েছিল সে স্বর্গীয় অনুভূতির সাথে যেন কোন কিছুরই তুলনা হয় না।
সেই অনুভূতি কখনো দ্বিতীয় সন্তানের বেলায় হয় না। তবু প্রথম বার এর মতো রোমাঞ্চ অনুভব না করলেও ছোট মেয়েটাকে দেখে বড্ড মায়া হল চৈতির।
আরো একজন এল পৃথিবীতে যে তাকে মা ডাকবে, তার উপর নির্ভর করবে, তার পরিচয়ে পরিচিত হবে ভাবতেই এতো ভালো লাগছে।
সবই মিলে যাচ্ছে আগের অভিজ্ঞতার সাথে।
সেই একই শারীরিক কষ্ট, যন্ত্রণা , বাচ্চার সুস্থতা নিয়ে দুশ্চিন্তা । এতো সবের মধ্যেও একটা চাপা
আনন্দ ।
শুধু বদলে গেল আশেপাশের মানুষগুলো।

আরশীর জন্মের পর হাসপাতালে তাদের এতো আত্মীয় স্বজন এসেছিল যে ডাক্তার , নার্স সবাই বিরক্ত হয়ে গেছিল।কি খুশি ছিল সবাই।
শরীরে তীব্র ব্যথা আর ক্লান্তি নিয়েও চৈতি সবার আনন্দটা উপভোগ করছিল।
ফোন এর পর ফোন, কে কাকে কার আগে খবর দেবে যেন একটা প্রতিযোগিতা।
বাচ্চার সাথে সেলফি তোলার হিড়িক। সোস্যাল মিডিয়ায় বাচ্চার সাথে তোলা ছবি এক এর পর এক আপলোড। দেশের বাইরে যারা ছিল তারা একটু পর পর ভিডিও কল দিয়ে বাচ্চাকে দেখছিল।

এবারে তার কিছুই নেই।

চৈতির মা, শাশুরী আর স্বামী সজীব ছাড়া আর কেউ নেই। কাউকে খবর দেওয়ার তাড়া নেই । ছবি তোলার প্রয়োজন নেই। মা আর শাশুড়ি দুইজনেরই মুখ ভার। যেন ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে।
তবে এবারে ছেলে না হলে যে এমন একটা পরিবেশ হবে তা একটু হলেও আঁচ করেছিল চৈতি ।

গর্ভের সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে আধুনিক যুগে সেটা আগে থেকেই জানা যায় ।
কিন্তু এই ব্যাপারটা একেবারেই অপছন্দ চৈতির । দুইবারের একবার ও সে নিজে ও জানেনি কাউকে জানতে দেয়নি।
স্বভাবতই এবার সবাই একটা পুত্র সন্তান আশা করেছিল । চৈতি নিজে ও চেয়েছিল । তাই সবার একটু মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক ।
কিন্তু তাই বলে এতো !
সদ্যজাত শিশুটার তো এখানে কোন ভূমিকা নেই । এই পৃথিবীতে তার আগমনটাও তো তার বোনের মতো সুন্দর হতে পারতো। ও ওতো এই একই পরিবারের সন্তান। একই বাবা মায়ের সন্তান। তাহলে কেন দুজনের জন্য দুরকম অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হল?

চৈতি সবচেয়ে বেশি অবাক হল সজীবকে দেখে। আরশীর জন্মের পর সে এতোটাই খুশি হয়েছিল যে কেঁদেই ফেলেছিল। এই পাঁচ বছরে সে আরশীর গায়ে একটা টোকাও লাগতে দেয়নি। এতো বেশি ভালোবাসে সে মেয়েকে।
অথচ এই মানুষটাই দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর এতো বদলে গেল ! মুখে একটা ম্লান হাসি ছাড়া যেন আর কোন অনুভূতিই নেই ।
কেন?
শুধুমাত্র বাচ্চাটা ছেলে নয় বলে!

ছয় মাস পেরিয়ে গেল।

ছোট মেয়ের নাম চৈতি রেখেছে অর্নি।
রক্তের টান খুবই মারাত্মক। দ্বিতীয় বার ও মেয়ে হয়েছে বলে সজীবের যে মন খারাপ ভাবটা ছিল তা এখন আর নেই। দুই মেয়েকেই সে এখন সমানভাবে ভালোবাসে।
তবে সবার কাছে আরশীর যে আদরটা ছিল তা আর নেই। চৈতির শ্বশুরবাড়ি, বাপেরবাড়ি দুই বাড়িরই সবার চোখের মণি ছিল সে।
ছোট বোনটা আসার পর তার আদর কেন কমে গেল সেই হিসাবটা চৈতি বোঝে না। এমন না যে সবাই এখন অর্নিকে বেশি ভালোবাসছে। আরশী সবার কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছিল তার ছিটেফোঁটা ও অর্নি কারো কাছে পায়নি। এখন তো দুজনের কেউই কারো কাছে এতো আদরের না। অথচ আরশীর একটা ভাই হলে আদর তো কমতোই না । বরং
দুজনেরই বাড়তো ।

কি অদ্ভুত সব নিয়ম! অদ্ভুত মানসিকতা !

এর মধ্যেই ঈদ চলে এলো।
প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে সজীবের সাথে গ্রামের বাড়ি যায় চৈতি। চৈতির শ্বশুর, শাশুড়ি ওখানেই থাকেন। এবার ও গেল।
দুই মেয়েকে নিয়ে ভালোই কাটছিল সময়টা।

পরদিন বিকেলে পাড়াতো কাকি শাশুড়ি মঞ্জু কাকি আসেন চৈতিদের বাড়ি। চা, মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করে চৈতি।
সেই সময় সজীব ঘরে ছিল না। চৈতির শাশুড়ির কোলে অর্নিকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

“আহা ভাগ্য খারাপ আর কি ছেলেটার! “

“মানে? কি বলতে চাইছেন কাকি? “

“না আমাদের সজীবের কথা বলছি, এমন ভাগ্য দুইটাই মেয়ে হতে হল। শোন বৌমা বছর দুয়েক পর আমাদের জন্য একটা নাতি নিয়ে এসো। একটা ছেলে না হলে মা হওয়া সম্পূর্ণ হয় না। “

রাগে গা কাঁপতে থাকে চৈতির। এসব কি কথা!
দুই দুই বার কি দারুণ কষ্ট করে সে দুটো সন্তানের জন্ম দিয়েছে। আর এখন শুনছে সে না কি এখনো পুরোপুরি মা ই হয়নি।
নাহ্, আর চুপ থাকা যায় না ।
ঠাণ্ডা মাথায় এবার একটা জবাব দিতেই হবে। হাসিমুখে বলে,

“কাকি, আপনার দুই ছেলে না? কেমন আছে ওরা? “

“আছে ভালো। ”

“আপনার বড় ছেলে নাকি রোজ রাতে নেশা করে এসে বৌ পেটাতো? এখনো এমন করে? “

চৈতির মুখে এমন কথা আশা করেননি তিনি। হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।

তারপর আমতা আমতা করে বলেন, “না, ঐ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সামান্য ঝগড়াঝাঁটি। তেমন কিছু না। আমি আসি এখন। “

“আরে বসুন না। কতদিন পর আপনার সাথে দেখা। একটু গল্প করি। আর আপনার ছোট ছেলেতো মেয়েদের স্কুলের সামনে গিয়ে নাকি মেয়েদের বিরক্ত করতো? অশালীন মন্তব্য করতো? গ্রামের গুরুজনেরা তো ওকে এটার জন্য শাসনও করেছিল। কাজ হয়েছে কিছু? নাকি এখনো সেই বদ অভ্যাস আছে? “

আর কথা বলতে পারেন না মঞ্জু কাকি। একদম চুপ।

বৌমার এমন কড়া কড়া কথায় চৈতির শাশুড়ি ও বিব্রত।

চৈতি আবার বলে, “আপনার মেয়ের তো বিয়ে হয়ে গেছে। খুব লক্ষী একটা মেয়ে ও। গ্রামের সবাই ওকে কতো ভালোবাসতো। এখন শুনলাম প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। ওর শ্বশুরবাড়িতেও নাকি সবাই ওকে খুব ভালোবাসে? “

এবার একটু সহজ হন কাকি। বলেন,” হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। “

” তাহলে দেখুন তো কাকি আপনি কার জন্য সার্থক মা হলেন, ছেলেদের জন্য? না মেয়ের জন্য? “

একটু থেমে চৈতি আবার বলে, “কাকি সন্তান ছেলে না মেয়ে সেটা বড় কথা নয়, তাকে কেমন মানুষ করতে পারলাম সেটাই বড় কথা । “

চৈতির মতো নরম মেয়ে এভাবে কারো সাথে কথা বলতে পারে কেউ ভাবেনি। আস্তে আস্তে পুরো পাড়া এই কথা গুলো রটে গেল।
সজীবের কানেও গেল।

ঘরে এসেই চৈতিকে বলল, “কেন এভাবে বললে মঞ্জু কাকিকে। আমরা এখানে থাকি না। কি দরকার গ্রামের মানুষের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে”?

চৈতি বলে, “কথাগুলো এখন আমি শুধু ওনাকে বলেছি। এখন থেকে যে আমাকে আমার মেয়েদের নিয়ে কথা শোনাবে তাকেই আমি দু’চার কথা শুনিয়ে দেব। “

“মানে? “

“মানে বুঝতে পারছো না? কেন আমার ছোট দুটো নিষ্পাপ শিশুকে এভাবে অপমানিত হতে হয় বার বার? কেন ওদের মা, বাবা হয়েছি বলে আমাদেরকে কথা শুনতে হয়? ওরা মেয়ে বলে? এটা কি ওদের দোষ না আমাদের? কোন শিশু কি ইচ্ছে করে ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্মায়? নাকি কেউ ছেলের মা বাবা হলে তাদের মধ্যে কোন অলৌকিক ক্ষমতা চলে আসে, যে তাদের সম্মান অনেক বেড়ে যায়।
অবশ্য মানুষের কথা কি বলব। অর্নির জন্মের পর তোমার যা চেহারা হয়েছিল। “

“অন্যের দোষ দিচ্ছ কেন? তুমি ও তো চেয়েছিলে দ্বিতীয় বারে আমাদের একটা ছেলে হোক। “

“হ্যাঁ চেয়েছিলাম। কারণ আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে। প্রথমটা যদি ছেলে হতো দ্বিতীয়টা মেয়ে চাইতাম। প্রায় সব মানুষেরই শখ থাকে তাদের ছেলে মেয়ে দুজন সন্তানই থাকুক। এটা কোন অপরাধ না। কিন্তু সেই শখ পুরণ হয়নি বলে তার শাস্তি এই বাচ্চাগুলোকে পেতে হবে? আর আমি তো একবার ও বলছি না যে ছেলে সন্তানের কোন প্রয়োজন নেই। অবশ্যই ছেলে সন্তানের ও প্রয়োজন আছে। কিন্তু স্বার্থপরের মতো শুধু নিজেদের প্রয়োজনের কথা ভেবে নিজেদের সন্তানদের মানসিকভাবে আঘাত করতে হবে? তাদের অপমান মেনে নিতে হবে? আমাদের যদি দুটো মেয়ে না হয়ে দুটো ছেলে হতো তাহলে কি কেউ এভাবে বলতো ?”

“দেখো একদিনে আমরা কারো পুরোনো ধ্যান ধারণা পরিবর্তন করতে পারব না। বলছে বলুক না। ইগ্নোর করলেই হয়। “

” না হয় না। প্রতিবাদটা একদিন শুরু করতেই হয়। আমিই না হয় করলাম। আমার মতো অন্য মায়েরাও যদি এভাবে জবাব দিয়ে দিতো তাহলে কোন কন্যাশিশুকে কেউ কখনো হেও করতো না। “

সজীব আর কিছু বলে না। বুঝতে পারে চৈতি ভুল কিছু বলছে না। তাই কথা না বাড়িয়ে সে বেরিয়ে যায়।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমাতে যায় চৈতি।
সজীব গ্রামে আসলে অনেক রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। এখনো ফেরেনি।

বিছানায় শুয়ে আজকের দিনটার কথা ভাবতে থাকে চৈতি। মঞ্জু কাকির সাথে ওভাবে কথা বলার জন্য তার শ্বশুর , শাশুড়ি দুইজনই তার উপর বিরক্ত ।
অবশ্য চৈতির এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই।
একদিন সবাই ঠিকই বুঝতে পারবে কেন সে আজকে এতো কঠিন হয়েছিল।

সে বুঝতে পারে না আসলে সমস্যা টা কোথায়? কেন কন্যা সন্তানে মানুষের এতো অনীহা?
ছেলে হলে বৃদ্ধ বয়সে বাবা মা কে দেখবে। এই কারণে?আচ্ছা মেয়েরা কি বাবা মায়ের খুঁটি হতে পারে না?
নাকি মেয়েদের জন্য পৃথিবীটা নিরাপদ নয়। সেই কারণে?তাও যদি হয়ে থাকে তবে তার জন্য তো মেয়েরা দায়ী নয়। অনেকে তো সেই দোষটাও আবার সেই মেয়েদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়।
কেন?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মনে হয় কারোরই জানা নেই।

ঘুমন্ত মেয়ে দুটোর দিকে চোখ যায় চৈতির।
কি সরল, নিষ্পাপ দুটো মুখ । প্রচন্ড মায়ায় দু চোখ জিজে উঠল তার।
ইচ্ছে করছে এক্ষুনি চিৎকার করে সবাইকে বলতে, দেখো,
ওরা আমার সন্তান। আমার অংশ। সৃষ্টিকর্তার সেরা উপহার,
দুজন মানব শিশু।

সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read