Select Language

[gtranslate]
২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বৃহস্পতিবার ( ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

লিপস্টিক

ড.দেবানী লাহা(মল্লিক):-“সারাদিন এরকম ছম ছম আওয়াজ করে বেরিও না তো বৌমা একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোবার জো নেই।”

বিরক্তি প্রকাশ করে আশালতা বলে উঠলেন।

বৌমা সুরুচি কোনো উত্তর করলো না নিঃশব্দে নিজের ঘরে চলে গেল।কেননা মুখে মুখে তর্ক করার শিক্ষা সে পায়নি। বিয়ের সময় বড় সাধ করে এই নূপুরজোড়া বাবার কাছ থেকে নিয়েছিল সুরুচি। মুখ ফুটে যে মেয়ে কোনোদিন কিছূ চায় না তার এই একটা আবদার ফেলতে পারেননি মৃন্ময়বাবু। বেশ ভারী মোটা একজোড়া নূপুর বানিয়ে দিয়েছিলেন তার সু মায়ের জন্য। সুরুচির বিয়ের সবে তিনমাস হয়েছে। এর মধ্যেই সুরুচি বেশ বুঝে গেছে কোনোমতেই শাশুড়ীর মনের মতো বৌ সে হয়ে উঠতে পারবে না।কেবল স্বামী বিজন যেন একেবারে মাটির মানুষ।বৌকে যে কেউ এতটা ভালবাসতে পারে বিজনকে না দেখলে সুরুচি তা কখনও বুঝতেই পারতো না। গত রবিবার গয়না গোছানোর সময় মলজোড়া বিজনের চোখে পড়াতে বলল-

“এই পায়েল জোড়া তো পায়ে পরে থাকতে পারো সু।বেশ সারাক্ষণ একটা ছম ছম আওয়াজ হবে। আমার এই মলের আওয়াজটা খুব ভালো লাগে জানো। পায়ে নূপুরজোড়া পরে থাকলে দূর থেকে আমি তোমার আসার খবর পাবো।”

এইকথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল সুরুচির পানপাতার মতো ফর্সা মুখখানা। কিন্তু আশালতা যে সে সোহাগরাঙা লজ্জায় জল ঢেলে দেবেন সেকথা সে বুঝতে পারেনি।

আশালতা একটা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধানা শিক্ষিকা। অবসর নিলেও এই সংসারটাকে তিনি এখনও স্কুলই ভাবেন। তাই বিশ্বপৃথিবীর সব কিছুতেই তিনি নানা ইনডিসিপ্লিন দেখতে পান। তার ওপর তিনি নিজে কতটা পারফেক্ট আর শ্রেষ্ঠ সেটা বোঝাতেই তার দিনের সিংহভাগ সময় কেটে যায়। তার সুখ শ্রেষ্ঠ, তার দুঃখ শ্রেষ্ঠ, তার আত্মত্যাগ শ্রেষ্ঠ এক-কথায় আশালতা যেন জগতের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেয়েছেন। আসলে সে শিরোপা নিজেই নিজেকে দেওয়া। শুনতে- শুনতে সুরুচির মাথা দপ্ দপ্ করে। কেবল আমি আমি আর আমি । আশালতার ডিক্সনারী থেকে তুমি বা তোমার শব্দটা যেন ডিলিট হয়ে গেছে চিরতরে। মা মরা সুরুচি ভেবেছিল শ্বশুরবাড়ীতে এসে সে হয়তো শাশুড়ী মায়ের কাছ থেকে স্নেহ ভালবাসা পাবে। একটা মা পাবে। তার মা মা আকুলতাটা আশালতাকে পেয়ে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু খুব শিগ্গির সে বুঝে গেল সে কতটা ভুল ভেবেছিল। বরং এখানে এসে সে দেখল সে বুঝি একটা জেলখানায় এসে পড়েছে।

“এমা হাতে কি অসভ্যের মতো মেহেন্দি পরেছো বৌমা।আমি কিন্তু মেহেন্দি পরা একেবারেই পছন্দ করি না।আমার বাড়ীতে এসব পরা চলবে না।”

সুরুচি লাল রঙটা বড্ড পছন্দ করে । এই তো কদিন আগে একটা টুকটুকে লাল শাড়ী পরে বিজনের সাথে বেড়াতে যাচ্ছিল তার আদরের সু । আশালতাকে” মা আসছি” কথাটা বলতে আসাতে তাকে দেখেই –

” এবাবা একি রঙচঙে দেশওয়ালীদের মতো শাড়ী পরেছো বৌমা। হাল্কা রঙ পরবে। এত কটকটে কালারে আমার চোখে যন্ত্রণা হয় । “

বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়ীতে আসা ইস্তক এইরকম নানা কথা শুনতে- শুনতে আশালতা কেমন তা বুঝে গেছিল সুরুচি। প্রথমদিনই একরাশ বিরক্তি নিয়ে শ্বশুরবাড়ীতে প্রবেশ করেছিল সে। বিজন ফুলশয্যার রাতে একান্তে সুরুচির কানে- কানে বলেছিল-

” মায়ের কথায় কিছু মনে কোরোনা সু। অল্পবয়েসে বাবা চলে যাওয়ায় মা একটু খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছে । তোমার যা অসুবিধা তা তুমি আমাকে বলবে। ”

তারপর থেকে ছোটখাটো সব ব্যাপারেই আশালতার হেডমিস্ট্রেসগিরিতে সুরুচির মনে তিক্ততা জড়ো হতে শুরু হয়েছিল।

ডিপ করে লিপস্টিক পরবে না। সময়মতো বাড়ী ফিরবে। পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে বেশী ভাব জমাতে যাবে না। আমি ঘরে এলে বিছানায় শুয়ে না থেকে উঠে দাঁড়াবে এইরকম নানারকম ফিরিস্তি।এইটা বাড়ী নাকি স্কুল এইটাই সুরুচির কাছে একটা বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। সুরুচি ভাবে স্কুলে পড়ার সময় এইরকম নানা নিয়মকানন মেনে চলতে হতো। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ী এসেও কি এসব থেকে রেহাই মিলবে না?

সুরুচির বাবার কদিন আগে হঠাৎ বুকে ব্যথা হয়।সুরুচি তো ফোন ধরেই হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে।

” শোনো বৌমা অল্পতে এত হাঁউ মাঁউ করে কাঁদলে চলে না। আমার বাবার যখন বুকে ব্যথা হল আমি কিন্তু স্কুল কামাই করিনি । স্কুলের সব দায়িত্ব পালন করে তারপর সেই সন্ধেবেলা বাবাকে দেখতে গেছিলাম । স্কুলের কেউ কিছু জানতে পর্যন্ত পারেনি।তারপর বাবাকে সুস্থ করে তোলা, ঘর সামলানো, স্কুল সামলানো সব আমি একা করেছি। সুতরাং বাবার একটু বুকে ব্যথা হয়েছে বলে সব দায় দায়িত্ব ছেড়ে বসে- বসে কাঁদবে এইটা চলে না। “

আশালতার এই লম্বা লেকচার শুনে সুরুচি হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায়না। এমনিতেই সুরুচি বড় নরম মনের মানুষ। মা হারা সুরুচির বাবাই সব। বাবার সামান্য কিছু শরীর খারাপ শুনলে উতলা হয়ে পড়াটা তার পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। তাই শাশুড়ীর এমন অমানুষের মতো কথা শুনে সে বাক্যহারা হয়ে যায়।ফোনে কান্নাকাটি শুনে বিজন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে আসে। বিকেলে সুরুচিকে নিয়ে ওর বাপের বাড়ী যায়। সেখানে গিয়ে দেখে বাবা ঠিক আছে। সামান্য একটু গ্যাস অম্বল থেকে বুকে ব্যথা হয়েছিল।

“এতো অল্পে এমন উতলা হলে চলে কি মা?দেখ তো বিজন কত কাজের ক্ষতি করে দৌড়ে দৌড়ে এল।”

“আমার খুব ভয় করে বাবা। আমার যে মা নেই।আমার তো শুধু তুমি আছো বাবা।”

“মা নেই কেন?বিজনের মা কেই তো ভালবাসবি।দেখবি মনটা ভালো থাকবে।”

“তোমার ভাবনায় জগত চলে না বাবা। ভালবাসা দিলেই হয় না ভালবাসা গ্রহণ করারও যোগ্যতা থাকা চাই।”

মৃন্ময়বাবু বুঝলেন পরিস্থিতি সুবিধের নয়। বিজনের সামনে কি অনভিপ্রেত বিষয় এসে পড়বে তাই তিনি চুপ করে গেলেন।

একদিন সুরুচির শরীরটা ভালো ছিল না।সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী হয়ে গেল। অন্যদিন সুরুচি অনেক সকালেই ওঠে।

” একি বৌমা কটা বাজে দেখেছো। এত বেলায় ঘুম থেকে উঠলে তো সংসার লাটে উঠে যাবে। আমি তো সেই কোন ভোর পাঁচটা থেকে উঠে পড়ি। এতো বছরেও সে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। তোমরা কি করে সংসারের হাল ধরবে ভেবে পাইনা। জীবনে খাওয়া আর ঘুম ছাড়াও আরো অনেক কাজ আছে। “

কিন্তু যিনি নিজে রাতদিন বলেন খাওয়া আর ঘুম ছাড়া অন্য অনেক কাজ আছে তিনি নিজে কিন্তু সারাদিন খাওয়া ঘুম আর অন্যের মানে বিশেষ করে সুরুচির দোষ ধরা ছাড়া আর কোনো কাজই করেননা।সকালের চা টা সুরুচি ধরে মুখের সামনে। তারপর পুরোনো কাজের লোক সন্ধ্যাদি এসে যায়। সে ব্রেকফাস্ট তৈরী করে দিয়ে আসে। আশালতা শুধু এইটা করতে হবে ঐটা করতে হবে বলতে বলতেই ক্লান্ত হয়ে যান।

তার অর্ডারের আর শেষ নেই।সুরুচিকে একটু বসে থাকতে দেখলেই ওনার এক একটা কাজের কথা মনে পড়ে যায়। একদিন সুরুচি বিকেলবেলা ঘরে বসে নেলপালিশ পরছিল। হঠাৎ দরজার দিকে চোখ পড়াতে দেখে আশালতা বিস্ফারিত চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। যেন কি বিরাট একটা অন্যায় করে ফেলেছে সুরুচি।

“বাইরের রঙ দিয়ে কখনও ভেতরকে রঙীন করে তোলা যায়না বুঝলে বৌমা।এই সব বাহ্যিক লোকদেখানিপনায় তোমাদের বড় বেশী আগ্রহ।আমার বড় বিরক্ত লাগে।”

সুরুচির কান্না পেয়ে যায়। বাবা তাকে বলেছিল-

” একটা কিছু চাকরি বাকরির চেষ্টা কর সু মা। কাজের ভেতর থাকলে মনটা ভালো থাকবে।”

তখন সুরুচির মনে হয়েছিল মন দিয়ে সংসার করবে।শ্বশুরবাড়ীর সকলকে নিয়ে আনন্দ করে থাকবে। কিন্তু কপালে যে এমন হিটলারনী জুটবে সেটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

একদিন সুরুচির ছোটবেলার বন্ধু মৈত্রেয়ী এল সুরুচির বাড়ী। বিয়ের সময় আসতে পারেনি। তার সঙ্গে আশালতা এমন ব্যবহার করলো যে সে তো আশালতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

“অনেক ভাগ্য করে শাশুড়ি পেয়েছিস সু।”

মৈত্রেয়ী বলল।

সুরুচি মৈত্রেয়ীর কাছে কেঁদে ফেলল আর সমস্ত বিষয়টা খুলে বলল।

“শোন সু আমি যেটুকু বুঝলাম উনি অল্প বয়েসে সব হারিয়েছেন। ওনার যেগুলো করার ইচ্ছা ছিল সেগুলো উনি করতে পারেননি। সেই অবদমিত ইচ্ছা গুলো থেকে ওনার চরিত্রে এই হিংসুটে পরশ্রীকাতরতার জন্ম হয়েছে। যেগুলো উনি নিজে করতে পারেননি সেগুলো চোখের সামনে অন্য কেউ করবে এইটা উনি সহ্য করতে পারেন না।”

মৈত্রেয়ী আরো বলে-

“অনেকে থাকে যারা নিজের না পাওয়া গুলো অন্যের ভেতর পূর্ণতা দিতে চায়। অনেকে আবার নিজের অপ্রাপ্তিগুলো অন্য কাউকে পেতে দেখলে সহ্য করতে পারে না। তখন নানাভাবে তাকে উত্যক্ত করে। উনি যে কাজগুলো করতে তোকে নিষেধ করেন সেগুলো এখন করিস না। বরং উনি যেগুলো ভালবাসেন বিজনের থেকে জেনে নিয়ে সেই উপকরণগুলো মাঝে-মাঝে ওনার হাতে তুলে দে তাহলেই উনি অনেকটা পরিবর্তিত হবেন।”

সুরুচি শুনল শাশুড়ি মা ভালবাসতেন সাজতে।লিপস্টিক নেলপালিশ ছিল ওনার নিত্য সঙ্গী। এছাড়া ভালবাসতেন সিনেমা দেখতে।

একদিন চুপি- চুপি দুপুরবেলা কয়েকটা হাল্কা কালারের লিপস্টিক আর নেলপালিশ কিনে আশালতার ড্রেসিংটেবিলে রেখে আসে সুরুচি।

বিকেলবেলা চোখে পরতেই –

“কে আমার ঘরে এইসব ছাই পাঁশগুলো রেখে গেল বৌমা?”

“আমি জানি না তো মা।”

তারপর সব চুপচাপ। এই নিয়ে আর জলঘোলা হল না।

পরদিন অনেক গভীর রাতে সুরুচি দেখল আশালতার ঘরে আলো জ্বলছে। আশালতা অনেক ভোরে ওঠেন তাই রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন। সুরুচি পা টিপে- টিপে আশালতার ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দেখে আশালতা নেলপালিশ পরছে। ঠোঁটে হাল্কা রঙের লিপস্টিক পরেছেন। সুরুচির খুব হাসি পেল।তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ফিরে এল।

এরপর মাঝে- মাঝেই কখনও ব্যাগ, কখনও শাড়ী, কখনও ভালো পারফিউম ড্রেসিংটেবিলে আবিষ্কার করতে থাকেন আশালতা। দুজনেই জানে কার কাজ এসব। কিন্তু কেউই কাউকে কিছু বলেনা। তবে সুরুচির ওপর সেই কঠোর কঠিন ভাবটা অনেকটা নরম হয়ে আসে দিন- দিন।

একদিন দুপুরে সুরুচি আর আশালতা সিনেমা দেখে রেস্টুরেন্টে খেয়ে আসে।

সামনে সুরুচির জন্মদিন আশালতা মেহেন্দির লোক ডাকে।

“জন্মদিনে হাতে মেহেন্দী পরো বৌমা। আর পায়ে মলজোড়া পরো।মলের আওয়াজটা শুনতে বেশ ভালো লাগে।”

আশালতার কথা শুনে সুরুচি তো আকাশ থেকে পড়ে।শাশুড়ি মা নিজে পছন্দ করে লাল টুকটুকে একটা সালোয়ার কামিজ কেনেন সুরুচির জন্য। কেক কেটে পায়েস করে বৌমার জন্মদিন পালন করেন আশালতা। আনন্দে সুরুচির চোখে জল আসে। মনে- মনে ভগবানের চরণে প্রণাম জানায় সে।

সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read