অপরিচিত :-দেবারতি আচার্য
চেম্বার শেষ করে তর্তরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো পৌলমী। নামতে নামতেই ড্রাইভারকে ফোন করছিলো, অনেকটাই দেরী হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে আসেনি তাই পেশেন্টও কিছু বেশি ছিলো আজ। এদিকে মা ফোন করছে,
–“কখন আসবি?”- জিজ্ঞেস করছে বার বার।
এক বছর হলো, প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবারে পৌলমী চেম্বার করে এই ব্যারাকপুরে। ওর ছোটবেলার শহর এটা। ওর প্রাণের শহর। মেয়েবেলার অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি জড়িয়ে আছে এই শহরের অলিতে গলিতে। তাই হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও একদিন করে সময় বার করে নেয় ও। তারপর চেম্বার শেষ করে বাবা, মায়ের সাথে দেখা করে আবার ফিরে যায় কলকাতায়, নিজের সংসারে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই একেবারে মুখোমুখি দেখা, সস্ত্রীক অতনুর সাথে – আবারো। নিমেষের মধ্যেই চোখটা সরিয়ে নেয় পৌলমী। ব্যস্ততার মধ্যেও তাকানোর সময় ছিল না, এমনটা নয়, অভিমানের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে অতনুর ভীরু চাহনিতে ধরা দিতে ইচ্ছে করলো না আর। পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে পৌলমীর মনে হলো,অতনু হয়তো কিছু বলতে চাইছিলো।
পৌলমী যখন এগারো ক্লাসে পড়ে তখন থেকেই পরিচয় অতনুর সাথে। অতনুরা থাকতো পৌলমীর মামার বাড়ীর পাড়ায়, রেলগেটের ঠিক ওইপারে। মামার বাড়ী যাওয়ার সূত্র ধরেই আলাপ, ক্রমশ তা প্রেমপর্যায়ে চলে যায়। অতনু ছিলো পৌলমীর চেয়ে প্রায় সাত/আট বছরের বড়ো। অতনু কোনোরকমে গ্রাজুয়েশন করে চাকরীর চেষ্টায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল ততদিনে। দোকান-ঘর কিনে ব্যবসা শুরু করবে বলে মনস্থির করেছে। তারপর পৌলমীকে নিয়ে একটা সুখী গৃহকোণের স্বপ্ন লালিত হচ্ছিলো ওর দু’চোখ জুড়ে।
এদিকে, পৌলমী ছোট থেকে স্বপ্ন দেখেছিলো ডাক্তার হওয়ার। খুব সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্রী পৌলমী, হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার সাথে ডাক্তারীর প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে থাকে।
তারপর একদিন সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত দিনটি আসে, পৌলমী প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পায়। পৌলমীর ছোট থেকে দেখা স্বপ্ন তখন সত্যি হতে চলেছে। এতো খুশী সর্বপ্রথম অতনুর সাথেই ভাগ করে নিতে চেয়েছিল ও। কিন্তু অতনু একটুও আনন্দ পায়নি সেদিন। পৌলমী লক্ষ্য করেছিল, অতনু কিরকম গুটিয়ে গেছিল খবরটা শুনে, মুখের হাসিও উধাও হয়ে গেছিল। পৌলমীর কাছে যেটা আকাশছোঁয়ার আনন্দ সেটা যে অতনুর কাছে নিরাপত্তাহীনতা; সেটা বুঝতে ওর কিছুটা সময় লেগেছিল। অতনু নানাভাবে ওকে ডাক্তারী পড়ার থেকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিল। অতনু ক্রমশ ওর কাছে অচেনা, অপরিচিত – কোন এক দূর গ্রহের মানুষ বলে মনে হচ্ছিলো। পৌলমী বুঝে গেছিলো, ও ডাক্তারী পড়লে অতনু আর সম্পর্ক রাখবে না, অতনু আর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন – এই দুটোর মধ্যে ওকে যে কোন একটা বেছে নিতে হবে।
অবশেষে একদিন অতনু ওকে বলেই ফেলে,
–“একজন সামান্য দোকানদারের ডাক্তার বৌ, সমাজে ব্যাপারটা খুব হাস্যকর না পৌলমী?”
আজ অতনু ওর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলো গাইনোকোলজিস্ট ডা: পৌলমী চ্যাটার্জির চেম্বারে। পৌলমীকে দেখেই খুব থতমত খেয়ে গেছিল, তা ও বুঝতে পেরেছে। পৌলমীও ভীষণভাবে অবাক হয়েছিল এতোদিন পরে ওকে দেখে। মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁচাপাকা চুলের সাথে সামঞ্জস্যহীন কুচকুচে কালো গোঁফ – চিনতে হোঁচট খেতে হয়েছিল ওকে, আজও। খানিক পরে পৌলমী বুঝেছিল, অতনুও ওকে চিনতে ভুল করেছিল – পৌলমীর পদবীটা বদলে গেছে যে…!
সৌজন্যে – প্রতিলিপি






