ব্ল্যাকমেল (সত্য ঘটনা অবলম্বনে) :-সোনালী মল্লিক
ও পুলিশ দাদা, জানো ওই ওপাড়ার দাশগুপ্তদের বুড়োটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
এই যে পাড়ার রিপোর্টার এসে গেছে । নে আর বকবক করতে হবে না তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নিয়ে বাড়ি যা আমাকেও বেরোতে হবে। আর্জেন্ট কল আছে।
শোন না একটু , আমি তো কাজ করতে করতেই বলছি এই তো আমার ঘর মোছা হয়ে গেল।। বড়মা মরে যাবার পর সব সময় জেঠু কেমন মনমরা হয়ে থাকতো , আগে যাও বা বিকেলে মোড়ের মাথায় পাড়ার ওই চায়ের দোকানটায় গিয়ে চা খেত , পাঁচ জনের সাথে গল্প গুজব করে সন্ধ্যের পর বাড়ি ফিরতো ।এখন আর ওমুখো হয় না। খালি বড়মার ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদে আর বলে কেউ না জানুক তুমি তো জানো আমি কোন দোষ করিনি ,তুমি তো আমায় বিশ্বাস করো,কিন্তু খোকা যদি না বোঝে !খোকা যদি আমায় খারাপ ভাবে আমি মানতে পারবো না আমার জন্য খোকার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারব না। সব শেষ করে দিতে হবে। আমি লোকসমাজের মুখ দেখাবো কি করে ?হে ভগবান আমায় তুমি তুলে নাও।
তুই কি করে জানলি এসব?
আমি তো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনিগো, আমাকে দেখতে পেলেই চুপ করে যায়। জিজ্ঞাসা করলেও কিছু বলে না । আমার কি ? আমার কাজ হয়ে গেলে আমি চলে আসি , ওই এক বেলাতেই ঘর দোর পরিষ্কার করে ,দুটি সেদ্ধ ভাত করে চলে আসি ।
মালতী, ভদ্রলোকের স্ত্রী তো কিছুদিন আগে মারা গেছে বললি , তার ছেলে মেয়ে নেই?
দাদাবাবু তো বিদেশে থাকে । বড়মা মরে যাবার পর জেঠুকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল। জেঠু কিছুতেই গেল না এই বাড়ি , বাগান ছেড়ে কোথাও যাবে না । বড়মা গাছপালা করতে খুব ভালবাসত , ওই বুড়ো গাছগুলোর গায়ে এমন করে হাত বুলিয়ে কথা বলে মনে হয় যেন বড় মার সাথে কথা বলছে।
বুঝলি একদিন যেতে হবে তো ওনার বাড়ি, বয়স্ক মানুষ কত রকম সমস্যা হতে পারে।
আমি অর্ক। ওই মোড়ের মাথার ডানদিকে নীলাশা অ্যাপার্টমেন্টে আমি থাকি। একাই থাকি বাবা-মা দেশের বাড়িতে থাকেন। আপনার বাড়িতে যে কাজ করে মালতি ও আমার বাড়িতেও কাজ করে।
কে মালু? আসুন আসুন ভেতরে আসুন।
ওর মুখ থেকে আপনার কথা অনেক শুনেছি তাই আলাপ করতে চলে এলাম। আপনি একা থাকেন , কিছুদিন আগেই স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে । আমিও একা থাকি জানেন , বাবা মার জন্য খুব দুশ্চিন্তায় থাকি। আপনি তো আমার পিতৃতুল্য আমি মাঝে মাঝে সময় পেলে আপনার কাছে আসবো। আর আপনার কোন সমস্যা হলে আমায় নির্দ্বিধায় ফোন করে জানাবেন আমার ফোন নাম্বার দিয়ে যাচ্ছি
জানো ছেলে ওর কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু কি বলতো বাবা চিরকাল স্বাধীনভাবে বেঁচে থেকে শেষ বয়সে এসে ওই দশ তলার ফ্ল্যাটের উপরে ছোট্ট খুপরি ঘরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। আর তাছাড়া আমার পেনশনের টাকায় আমাদের বুড়ো বুড়ির ভালোই চলে যেত কিন্তু উনি চলে যাবার পর বড় একা হয়ে গেলাম জানো? চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ভেবেছিলাম দুজনে আনন্দে বাকি জীবনটা কাটাবো খুব অভিমান ছিল ওর মনে চাকরি জীবনে ওকে ঠিকমত সময় দিতে পারিনি বলে। ছেলে চলে যাবার পর ও খুব একাকিত্বে ভুগত আর তাই বোধহয় আমায় একা করে দিয়ে চলে গেল। অসহায় হয়ে পড়লাম। তারপর ওই মালুই দুটো ভাত ফুটিয়ে দিয়ে যেতে লাগলো।ওর চলে যাওয়াটা মানতে পারছিলাম না যেদিকে তাকাই ওর স্পর্শ পাই ।ওর পোঁতা গাছের ফুল গুলো হেসে হেসে আমার অসহায়ত্ব একাকীত্বকে বিদ্রুপ করে। ঘরে থাকতে পারতাম না। চায়ের দোকানে গিয়ে আড্ডা দিতাম একটু রাত হলে তবেই ফিরতাম। ওখানে গিয়েই শুরু হল একটা বিপদ বড় ঝামেলায় পড়ে গেলাম জানো বাবা কি করে যে উদ্ধার পাবো!
আপনি আমায় বলতে পারেন কথা দিচ্ছি আমি আপনার পাশে থাকবো।
সত্যি বলছো বাবা!
ওই চায়ের দোকানে আলাপ হয়েছিল তারকের সাথে। সেও মাঝে মাঝে আসতো চা খেতে। আমার সমবয়সী হয়তো বয়সে একটু ছোট হবে ।ক্রমশ আলাপ পরিচয় হলো তারপর মাঝে মধ্যে তারক আমার বাড়ি আসতো। গল্প আড্ডায় খানিকটা সময় কাটতো ওর বউ মাঝে মধ্যে রান্না করে এটা ওটা পাঠাতো ।মিথ্যে বলবো না আমারও ভালোই লাগত একসময় খাদ্য রসিক ছিলাম। আজ বহুদিন ও রসে বঞ্চিত। তারক না আসতে পারলে মাঝে মাঝে ওর বিধবা মেয়েটা এসে ভালো মন্দ রান্না করা খাবার টিফিন বাটি করে দিয়ে যেত। অগোছালো ঘরটা কিছুটা গুছিয়ে দেবার চেষ্টা করত , আমিও যথাসাধ্য দেবার চেষ্টা করতাম ওই সাহায্য করার। লকডাউনে তারকের কাজটা চলে গিয়েছিল মেয়েটা একটা কারখানায় কাজ করতো, তাও ঠিকমতো টাকাপয়সা পেত না। সবই ঠিক ছিল। একদিন একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। লোকাল থানার ওসি ফোনে বললেন আপনার নামে একটা কমপ্লেন আছে। জবা নামের মেয়েটিকে আপনি বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে তার শ্লীলতা হানি করেছেন পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিতে বললেন না হলে ওরা ওই ছবি আমার ছেলেকে পাঠিয়ে দেবে বলেছে ২ লক্ষ টাকা কোন মতে তুলে দিয়েছি। বাকি তিন লক্ষ টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমার কাছে এই মুহূর্তে অত টাকা নেই আমি কি করবো আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া কোন উপায় নেই আত্মীয়-স্বজন ছেলে বৌমার কাছে কি করে মুখ দেখাবো বিশ্বাস করো আমার কোন খারাপ মতলব ছিল না ওরা যেএত বড় মিথ্যা অপবাদ দেবে বুঝতে পারিনি এই বয়সে এসে এমন অপবাদ মেনেনিতে পারছি না। এসব ছবি কোথা থেকে পেল তাও বুঝতে পারছি না।
থানা থেকে কে ফোন করেছিল আপনাকে?
ও. সি
ঠিক শুনেছেন আপনি?
কি যেন নাম বলেছিল মিস্টার মুখার্জি না ব্যানার্জি, ঠিক মনে পড়ছে না সামনের বুধবার সন্ধ্যের সময় টাকাটা নিতে আসবে ,এখনো জোগাড় করতে পারেনি। আমার কাছে টাকা আছে কিন্তু সব ছেলের সঙ্গে জয়েন্টে। তোলার দরকার পড়ে না প্রয়োজন হলেই ও টাকা পাঠিয়ে দেয় কিন্তু আমি টাকা তুললেই ও জানতে পেরে যাবে কি বলবো ওকে!!
কিছু বলতে হবে না। যা বলার আমিই বলব সামনের বুধবার অফিসার আসার আগেই আমি আসবো আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।
কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দিলেন মিস্টার দাশগুপ্ত । ভিতরে অপরিচিত কে দেখে পুলিশ অফিসার একটু রেগে গিয়ে বললেন ইনি কে?
আমার পরিচিত, আমার শরীর খারাপ শুনে দেখতে এসেছে।
তা সব কথা কি এনার সামনেই বলবো? আপনি কি করেছেন সব বলেছেন এনাকে-
বিশ্বাস করুন আমি কিছু করিনি। ওনারা আপনার কাছে মিথ্যা অভিযোগ করেছে। জবা তারেকের মেয়ে, আমার ও সন্তান সম।
ঠিক আছে তাহলে থানায় চ, কে কার মেয়ে দেখেছি।
এক মিনিট আপনার পরিচয়? আপনি ওনার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেন?
আমার ড্রেস দেখে আপনি বুঝতে পারছেন না ! আমি লোকাল থানার ওসি । উনি একটা ক্রাইম করেছেন তা থেকে বাঁচানোর জন্যই আমি এসেছি ,কি করেছে আপনি ওনাকেই জিজ্ঞাসা করুন।
আপনি আগে কোন থানায় ছিলেন?
বাসুবাটী, সিঙ্গুর থানায়।
তা সিঙ্গুর থেকে আপনি এখানে বদলি হয়ে এলেন? এটাতো কমিশনারেট এলাকা- –
আপনার নামটা কি বলুন তো
আমি! আমিএখানকার লোকাল থানার ওসি।
আপনার আই কার্ড টা দেখি
আমার আই কার্ড চাইছেন আপনার সাহস তো বড় কম নয়
সাহসের আর কি দেখলি এবার দেখ বলতে বলতে কলার ধরে সপাটে চড়
তবে সাহস আছে বটে তোর আমার সামনেই কি না বলছিস তুই ওসি
এবার দেখ আমার আই কার্ড, ওসি অর্কজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়।
পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই ,বাইরে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করা আছে ।এবার বল কি উদ্দেশ্যে পুলিশের পোশাক পরে বাড়িতে এসেছিস। কে পাঠিয়েছে তোকে আর দলে কে কে আছে কতদিন ধরে এসব চলছে
বলছি বলছি স্যার আমি আমি এখানকার কোর্টের মুহুরী তারকবাবু আর ওনার মেয়ে প্ল্যান করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন ,লোভের বসে আমিও রাজি হয়ে যাই। আমি দু লাখ টাকা ফেরত দিয়ে দেব আমায় ছেড়ে দিন আর কোনদিন এসব কাজ করবো না।
আগে তো টাকাটা ফেরত দে ওনাকে তারপর তোরা সবাই থানায় চল দেখি কিভাবে জামাই আদর করা যায়।
সৌজন্যে – প্রতিলিপি






