পুষ্পিতা ভৌমিক :- মাত্র এক সপ্তাহ হলো বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসেছে সহচরী। ইতিমধ্যে একটা ব্যাপার বেশ চোখে লেগেছে ওর। বাড়ির হেঁশেলের সমস্ত দিকটা সামলান মণিঠাম্মা মানে সহচরীর স্বামী শুভ্রনীলের ঠাকুরমা জাগৃতিদেবী। আসলে নানারকম রান্না করতে , মানুষকে পেটপুরে খাওয়াতে উনি খুব ভালোবাসেন। সকাল থেকে উঠে বাড়ির কে কী খাবে সেইদিকে ওনার সদাসতর্ক দৃষ্টি। নাতি নীলের জন্য পাতলা লিকার চা তো নিজের ছেলের(সহচরীর শ্বশুরমশাই দেবরাজবাবু) জন্য ঘন দুধ দিয়ে চা; কারুর জন্য প্রাতরাশে লুচি, সাদা আলুর তরকারি তো কেউ বা আবার স্যান্ডউইচ আর ফ্রুট জুস। আর এই ব্যাপারে মণিঠাম্মাকে সাহায্য করেন কর্মসহায়িকা সাবিত্রীদি। সাবিত্রীদি যথেষ্ট দায়িত্বশীল হলেও হেঁশেলের দায়িত্ব পুরোপুরি ওর উপরে ছেড়ে দিতে পারেননি মণিঠাম্মা। মামণি মানে সহচরীর শাশুড়িমা অনুরূপা কিছু বলতে পারেন না ওনাকে। জাগৃতিদেবীর বয়েস হয়েছে, তাই ওনার ইচ্ছেকে সম্মান দিয়েই চলেন অনুরূপা। তাছাড়া অনুরূপার একটা নিজস্ব বুটিকের ব্যবসা আছে সেটা নিয়ে দিনের অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকেন উনি।
সহচরীও কর্মরতা। তবে বিয়ে উপলক্ষ্যে বেশ কদিন ছুটি নিয়েছে। একবারে অষ্টমঙ্গলা, মধুচন্দ্রিমা সেরে কাজে যোগ দেবে। ভালোই হলো কটা দিন সময় পেয়ে, নতুন বাড়ির পরিবেশ বুঝে নিতে পারবে। আগামীকাল অষ্টমঙ্গলা, ও বাড়ি যেতে হবে। টুকটাক গোছগাছ সেরে রাখছিল ও। এমনসময় কানে আসে মণিঠাম্মার গলা,”নাতবৌ খাবি আয়, ওসব গোছগাছ পরে হবে। তুই তো দেখছি বাপের বাড়ি যাবার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিস। কেনো রে মেয়ে আমরা কি ঠিকমত তোর যত্নআত্তি করতে পারছি না?”
ঈষৎ লজ্জা পেয়ে সহচরী বলে,”সেরকম কিছু নয় গো ঠাম্মা। তোমার নাতি নীল তো ব্যবসার কাজে বেরিয়ে গেলো বাবার সাথে সেই সকালে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে যাবে। তখন যদি এসে দেখে আমার ব্যাগ গোছানো হয়নি ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে ও নিজেই গোছাতে বসবে বেচারা। আমি তাই গুছিয়ে রাখছি। আগামীকাল সকালেই তো বেরোতে হবে আমাদের ও বাড়ি।”
__”হুম মেয়ের সবদিকে খেয়াল আছে দেখছি। নে এবার খেতে বোস। তোর বর আর তোর শ্বশুরের খাবার আমি আমাদের ইলেকট্রনিক শোরুমে পাঠিয়ে দিয়েছি সাবিত্রীর হাত দিয়ে। আর বৌমা অনুরূপা খেয়েই বেরিয়েছে আজ। বড়বাজার যাবে আজ কিসব শাড়ি কিনে আনতে।”, উনি বলেন। খেতে বসে সহচরী দেখে ভেটকি মাছের কাঁটাচচ্চড়ি, মাছের ডিমের বড়ার কালিয়া সহ বেশ কয়েকরকম লোভনীয় পদ পাতে শোভা পাচ্ছে। মিষ্টি হেসে ও বলে,”আচ্ছা ঠাম্মা এইকদিন ধরে দেখছি তুমি সবাইকে যত্ন করে খেতে দাও। কই তোমার নিজের জন্য তো কখনো সেভাবে কিছু রান্না করতে দেখিনি।”
__”ধুর পাগলি। নিজের জন্য আবার আলাদা কী রান্না করব? আমি বিধবা মানুষ। কখনো একটা নিরামিষ তরকারী, কখনো দুধ বা দই দিয়েই খাওয়া হয়ে যায় আমার। তোদের খাইয়েই আমার শান্তি।”, বলেন জাগৃতিদেবী।
শান্তভাবে এবার সহচরী বলে,”ওসব বললে শুনছি না আমি। সকলকে খাইয়ে তৃপ্তি যে দেয় তার নিজেরও তৃপ্তি করে খাওয়া উচিত। জানি সবার জন্য রান্না করে তোমার নিজের জন্য আর কিছু করতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু তার জন্য এবার থেকে আমি আছি। রান্নাবান্না আমারও একটা সখ। আমি ও বাড়িতে থাকতে প্রতিটা ছুটির দিনে কিছু না কিছু পদ রান্না করতাম। এখন থেকে প্রতিদিন তোমার জন্য আমি যে কোনো একটা পদ বানিয়ে দেব। দাঁড়াও আপাতত ঝট করে একটা কিছু বানিয়ে আনি। তারপর একসাথে খাব তুমি আর আমি মিলে। ফ্রিজে পনির, টকদই আছে তো দেখলাম। ওটা দিয়েই হবে। “
জাগৃতিদেবী বলেন,”দেখো মেয়ের কাণ্ড। দেরি হয়ে যাবে তো।”
__”হুম একটু দেরি হলেও আজ তুমি আর আমি খেতে বসে যে অমূল্য সময় কাটাবো সেটা সারাজীবন খুশির স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে ঠাম্মা। সেটুকু সুযোগ আমাকে দেবেনা তুমি?”; সহচরীর আবদারের কাছে হার মানেন জাগৃতি। সত্যিই তো কদিন পরে মেয়েটা যখন অফিস চলে যাবে তখন কি আর একসাথে বসে খেতে পারবেন, গল্প করতে পারবেন ওর সাথে। তার চেয়ে করুক ওর যেমন ইচ্ছে মন চায় রান্না। ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দেন জাগৃতি। বেশ কিছুক্ষণ পর সহচরী ডাকে,”চলো খাবে চলো। ভাত বেড়ে দিয়েছি ঠাম্মা।”
টেবিলে গিয়ে জাগৃতি দেখেন গরম ভাত, বেগুনির সাথে বেশ মাখো মাখো দই পনির। অল্প মুখে দিয়ে চোখটা বন্ধ হয়ে আসে ওনার। সহচরী বলে,” পনীরের এই পদটা লুচি বা পরোটার সাথে ভালো যায়। কিন্তু দুপুর বলেই ভাত দিয়ে দিলাম। রাতে খানকতক পরোটা ভেজে দেব তোমার জন্য।”
__”ওরে এই বুড়ো বয়েসে আর লোভ দেখাস না মা। সত্যি তোর হাতে জাদু আছে। আজকাল তো হোম ডেলিভারির ব্যবসা ভালো চলে শুনেছি। তুই ভবিষ্যতে ওরকম কিছু শুরু করলেও মন্দ হবেনা কিন্তু। নামটাও ভেবে ফেললাম ‘ সহচরীর স্বাদঘর।’ কেমন বল?”; বলেন জাগৃতি।
“পারফেক্ট”বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে সহচরী। খাবার টেবিলে আড্ডায় মেতে ওঠে দুই অসমবয়সী নারী। আসলে সময়টাকে নিজেদের মত করে উদযাপন করতে জানতে হয় যেমনটা করতে পেরেছে সহচরী। সামান্য সময় বের করে বয়স্ক মানুষটার জন্য একপদ রান্না করেছে, তাতেই কত্ত খুশি মণিঠাম্মা। আর এই ছোট্ট খুশিগুলোই সদাব্যস্ত জীবনের ভালো থাকার পাসওয়ার্ড। জাগৃতিদেবীর চোখমুখেও আজ সব পেয়েছির সুখ। শুধু বাহ্যিক নামে সহচরী নয় বাস্তবেও ওনার সহচরী হয়ে বন্ধু হয়ে জীবনটাকে পরিপূর্ণ করে তুললো মেয়েটা।।।
সৌজন্যে প্রতিলিপি






