তুহিন শুভ্র আগুয়ান
এ যেন চার্লি ও ধর্মার গল্প। বছরখানেক আগে কন্নড় ভাষায় তৈরি হওয়া ‘৭৭৭ চার্লি’ সিনেমার সারমেয় চার্লি ও ধর্মার সম্পর্ক গল্প চোখে জল এনে দিয়েছিল বহু পশুপ্রেমী মানুষের। ক্যান্সারে আক্রান্ত চার্লির মৃত্যু মনে দাগ কেটেছিল পশুপ্রেমীদের। সেই গল্পেরই যেন পুনরাবৃত্তি ঘন্টু ও কৃষ্ণেন্দুর জীবনে। একসময় ধর্মার মতোই সুতাহাটার দ্বারিবেড়িয়া গ্রামের কৃষ্ণেন্দু বেরার একাকী জীবনে দেখা হয়েছিল সারমেয় ঘন্টুর সাথে। এরপর ক্রমে ক্রমে নিবিড় হয় দুজনের সম্পর্ক। এরই মাঝে সংসার হয় কৃষ্ণেন্দুর। তার স্ত্রী ও পুত্র সন্তানের কাছেও আপন হয়ে ওঠে ঘন্টু। কিন্তু চার্লির মতোই গত মাসখানেক আগে প্রিয় ঘন্টু সকলের বাঁধন ছিন্ন করে বর্তমানে ইহলোকে যাত্রা করে। তার চলে যাওয়ায় গোটা পরিবারে তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা। ঘন্টুর শান্তি কামনায় রবিবার দিনভর উপনিষদ পাঠ থেকে শুরু করে সারমেয় ভোজন চললো সুতাহাটার দ্বারিবেড়িয়া গ্রামে। ঘন্টুর মৃত্যুতে সকলেই অশৌচ পালন করেন।
শনিবার বেরা পরিবারের সকলেই নখলোম ত্যাগ করেছেন। এরপর রবিবার দিনভর চললো উপনিষদ পাঠ থেকে শুরু করে বৃক্ষরোপণ ও সারমেয় ভোজন। রবিবার যেন এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হল দ্বারিবেড়িয়া গ্রামে। দ্বারিবেড়িয়ার কৃষ্ণেন্দু বেরা পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসা সূত্রে মেচেদায় আগে ভাড়ায় থাকতেন। সেখানেই দেখা হয় পথ ও কুকুর ঘন্টুর সাথে। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একে অপরকে ছাড়া দিন যেন অচল হয়ে পড়ে। সেই ঘন্টু মাসখানেক আগে দ্বারিবেড়িয়ায় কৃষ্ণেন্দুর আদি বাড়ি থেকে ইহলোক যাত্রা করে। বাড়ির সামনেই সমাধিস্ত করা হয় ঘন্টুকে। আর এরপর থেকেই অশৌচ পালন করে গোটা পরিবার। রবিবার তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আর পাঁচ জন মানুষের মতোই শ্রাদ্ধের আমন্ত্রণপত্র ছাপানো হয়। যেখানে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গানের লাইনের পাশাপাশি দেওয়া ছিল প্রিয় ঘন্টুর ছবি। রবিবার ঘন্টুর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে হাজির হন বাংলাদেশের অতিথিরাও। কৃষ্ণেন্দুর শ্বশুর বাড়ি বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশের মানুষের সাথেও ঘন্টুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এদিন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে হাজির হন বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রেজিস্টার প্রবীর কুমার সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান তথা কৃষ্ণেন্দুর স্ত্রী শিপ্রা সরকার বেরা সহ অন্যান্যরা। শনিবার সকলে নখলোম ত্যাগ করার পর রবিবার দিনভর উপনিষদ পাঠ করা হয়। এদিন উপনিষদ পাঠ করেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের মহিষাদল শাখার মহারাজ স্বামী মুক্তেশ্বরানন্দ। এরপর আহুতি দেন পরিবারের সকলে।
ঘন্টুর স্মৃতিতে সমাধিস্থলে বৃক্ষরোপনও করা হয়। পাশাপাশি শ্মশান বন্ধুদের চারা গাছ বিতরণ করা হয় এদিন। অতিথি হিসেবে আশেপাশের পথ কুকুরদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। রবিবারের আবেগঘন মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন আশেপাশের অনেকেই। কৃষ্ণেন্দু বলেন, “ঘন্টু আমাদের কাছে বাড়ির সদস্য। ওকে ছাড়া আমাদের কোনোভাবেই দিন কাটছে না। ওর আত্মার শান্তির জন্য আমাদের এই আয়োজন।”
—




