Select Language

[gtranslate]
২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বৃহস্পতিবার ( ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

শোভাবাজার রাজবাড়িতে ত্রি-সন্ধ্যা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত

গত ৭৩ বছর ধরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারাবাহিক পরিবেশনায় অনন্য অবদান রেখে চলেছে ‘দ্য ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলন এবং একাডেমী’। এই প্রথমবার, উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শোভাবাজার রাজবাড়ি (গোপীনাথ বাড়ি)-তে, ৫ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক ত্রি-সন্ধ্যা ব্যাপী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবের আয়োজন করা হয়।

এই বিশেষ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য — বিশিষ্ট শিল্পীদের পাশাপাশি নবীন প্রতিভাদের মঞ্চ দেওয়া এবং উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সংগীতচর্চার ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো। আয়োজকদের মতে, উত্তর কলকাতাই বাংলার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অন্যতম পীঠস্থান। আর শোভাবাজার রাজবাড়ি, যার ইতিহাস ও স্থাপত্যই এক সঙ্গীতময় স্মৃতি, সেই উপযুক্ত মঞ্চ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী ড: শশী পাঁজা, স্থানীয় পুরপিতা সুব্রত ব্যানার্জী এবং রাশিয়ার কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কজলভ।

প্রথম সন্ধ্যা: নবীন ও প্রাজ্ঞের সম্মিলনে মুগ্ধতা

 

প্রথম সন্ধ্যার সূচনা করেন ভরতনাট্যম শিল্পী মেহুলি ভট্টাচার্য্য। চারটি পরিবেশনা — ‘মহাদেব কে আমন্ত্রণ’, ‘অর্ধনারীশ্বর স্তোত্র’, পদম ও জাভেলি — এর মাধ্যমে তিনি তাঁর নৃত্যনৈপুণ্য ও মেজাজের ভারসাম্য প্রদর্শন করেন।

পরবর্তী পরিবেশক, ডোভার লেন-এর মেধা সন্ধান-এর যন্ত্রসংগীতে প্রথম হওয়া অল্পবয়সী প্রতিভা সৌপর্ণ ঘোষ। তিনি রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী-তে বিলম্বিত একতাল ও দ্রুত তিনতালে সেতার পরিবেশন করেন। এরপরে মিশ্র পাহাড়ি-তে একটি ঠুমরি পরিবেশন করে সকলকে চমকে দেন। সঙ্গত করেন তবলায় সুমন সরকার, যিনি নিজেও মেধা সন্ধান প্রতিযোগিতায় প্রথম।

এই সন্ধ্যার শেষ পরিবেশক ছিলেন জয়পুর-আত্রৌলি ঘরাণার কণ্ঠশিল্পী জুই ধায়গুড়ে পান্ডে। পরিবেশিত হয় রাগ কেদার এবং মীরাবাঈ-এর এক ভজন। তবলায় ছিলেন প: সমর সাহা ও হারমোনিয়ামে প্রদীপ পালিত — দুজনেই অনবদ্য সঙ্গত করেন।

 

দ্বিতীয় সন্ধ্যা: রাগ, নৃত্য ও হৃদয়স্পর্শী গায়ন

দ্বিতীয় দিনের শুরু করেন পাতিয়ালা ঘরাণার নবীন কণ্ঠশিল্পী সাগ্নিক সেন, যিনি রাগ শুদ্ধ কল্যাণ ও রাগ মিশ্র পিলু-তে কাজরি পরিবেশন করেন। সঙ্গত করেন তবলায় সমীর নন্দী ও হারমোনিয়ামে সনাতন গোস্বামী।

 

এরপরের পরিবেশনা সুস্নিগ্ধ চক্রবর্তীর ওড়িশি নৃত্য — গীতগোবিন্দ অনুসারে রাধা ও কৃষ্ণের মিলন ও বিরহ অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে তাঁর নৃত্যে।

তৃতীয় পরিবেশক ছিলেন কণ্ঠশিল্পী রাখী চ্যাটার্জী। পরিবেশিত করেন রাগ নন্দ, তবলায় বিভাস সাংহাই ও হারমোনিয়ামে কমলাক্ষ মুখার্জী।

 

সন্ধ্যার শেষ পরিবেশক ছিলেন উস্তাদ ধ্যানেশ খানের পুত্র, মাইহার ঘরাণার প্রতিভাবান সরোদিয়া সিরাজ আলি খান। পরিবেশন করেন দুর্লভ রাগ চন্দ্রনন্দন। তবলায় রূপক ভট্টাচার্য্য-এর সঙ্গে তাঁর সওয়াল-জবাব পরিবেশনটিকে স্মরণীয় করে তোলে।

তৃতীয় সন্ধ্যা: প্রতিভার উজ্জ্বল ঝলকানি

 

শেষ দিনের সূচনা করেন কণ্ঠশিল্পী সঞ্চালি চ্যাটার্জী। রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী-তে তাঁর খেয়াল পরিবেশন ও দ্রুততালে ‘পায়েলিয়া ঝংকার’ দর্শকদের মুগ্ধ করে। শেষে পরিবেশন করেন কবীরের ভজন। তবলায় নবারুণ দত্ত ও হারমোনিয়ামে হিরন্ময় মিত্র তাঁর সঙ্গত করেন।

 

এরপর আসে তিতিশা ঘোষ-এর কত্থক পরিবেশনা। ভৈরবীতে ‘ভবানী দয়ানি’ দিয়ে শুরু করে ধামারে পরণ, তোড়া ও অনাঘাত পরিবেশন ছিল নিখুঁত।

 

সন্ধ্যার উজ্জ্বলতম উপস্থিতি ছিলেন মেধা সন্ধানে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত কিশোরী মৈত্রেয়ী রায়। রাগ বেহাগ-এ তাঁর বিলম্বিত ‘চিন্তা না করো রে’ এবং দ্রুত ‘অব তো রাত লাগি’ তে তাঁর অসাধারণ গায়নশৈলী প্রশংসা কুড়ায়। কবীরের ভজন ‘মন লাগো মেরা ইয়ার ফকিরি মে’ শ্রোতাদের অন্তর স্পর্শ করে। তবলায় অশোক মুখার্জী এবং হারমোনিয়ামে সঙ্গত করেন তাঁর মা চৈতালি রায়।

 

উৎসবের সমাপ্তি ঘটে কেডিয়া ভ্রাতৃদ্বয়-এর সেতার-সরোদের যুগলবন্দীতে। শুরু করেন রাগ ঝিনঝোটি, এরপর সিন্ধু ভৈরবী-তে ঝালা পর্যায়ে তাঁদের অসামান্য দ্রুততার প্রদর্শন ছিল চমকপ্রদ। তবলায় প: পরিমল চক্রবর্তীর সহায়তায় পুরো পরিবেশনা একটি অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছায়।

 

এই তিনদিনের সঙ্গীত উৎসব শুধুমাত্র এক শিল্প প্রদর্শনী ছিল না — বরং এটি ছিল উত্তর কলকাতার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চার প্রতি এক গভীর প্রণতি।

Related News

Also Read