Select Language

[gtranslate]
১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ মঙ্গলবার ( ৩১শে মার্চ, ২০২৬ )

খাবোই আমি খাবোই, ওগো …

কল্যানী মিত্র ঘোষ :- আমি কোনো কালেই তেমন পেটুক ছিলাম না, থাকবোই বা কি করে, আমি ছিলাম সেই পেট রোগা বাঙালী। স্কুলে বন্ধুদের গ্রুপে আমার নাম ছিল “পটল ডাঙার প্যালারাম”। লোভ বলতে ওই টকের প্রতি যেটুকু, তেঁতুল জল, পাকা তেঁতুলকে গুড়, সর্ষের তেল, কাঁচা লঙ্কা, ধনে পাতা দিয়ে মাখা, ওভাবেই কদবেল ইত্যাদি। এগুলো কোনো গ্রীষ্মের দুপুরে চৌকিতে উপুড় হয়ে চেটে চেটে খাওয়ার সময় হাতে অবশ্যই থাকতো শক্ত মলাটের বঙ্কিম, বিভূতিভূষণ অথবা শরৎবাবু, নইলে কাঁচা মাখার স্বাদই পেতাম না। এছাড়া যে খাবার গুলো আমার ভালো লাগতো তা হলো আলু পোস্ত এবং বোঁদে। নেহাৎ ই ছাপোষা ভালোলাগা। বেড়ে উঠেছি এক যৌথ পরিবারে, সেখানে আমার ছোট কাকিমা ছিলেন রন্ধনে দ্রৌপদী। পরে ধীরে ধীরে খেতে শিখি ওই কাকিমার দৌলতে। উনি এত ভালো মুরগি রান্না করতেন যে আমার এক মেসোমশাই কাকিমা কে “মুর্গাওয়ালি”‌ বলেই সম্বোধন করতেন। ওদিকে আমার দিদা আর মাসী করতেন সমস্ত সাবেকি রান্না যেগুলো আজও মুখে লেগে আছে। মায়ের হাতের কিছু বিশেষ খাবার ছিল তার মধ্যে পটলের দোলমা, বিভিন্ন ধরণের চিকেন স্ট্যু, লোটে মাছের ঝুরি, চিংড়ির বাটি চচ্চড়ি, পুডিং ও কাস্টার্ড অন্যতম।

আমি খাওয়া নিয়ে মাকে প্রচণ্ড জ্বালিয়েছি চিরকাল, এটা খাবো না ওটা খাবো না, শাক সব্জি মানেই বন জঙ্গল, হঠাও সব, এই মাছে আঁশটে গন্ধ তো ওই মাছ কেমন হড়হড়ে! তখন তো বুঝিনি একদিন এই আমেরিকায় এসে উপস্থিত হবো এবং হাড়েহাড়ে টের পাবো কত প্যাডি তে কত রাইস! কর্তার কর্মসূত্রে আমরা কুড়ি বছর আগে পা রাখি আমেরিকার পূর্ব উপকূলে সিনসিনাটি রাজ্যে, আনকোরা চারটে বাঙালী পরিবার। পনেরো দিনের মাথায় বিদেশ সম্পর্কিত সমস্ত রঙীন স্বপ্ন সাদা কালো বাস্তবে মুখ থুবড়ে পড়ল। কোথায় ভারতীয় মশলাপাতির দোকান, মাছের দোকান, কিছুই জানিনা। নেট এ খুঁজে খুঁজে বহু দূরের কোনো শহর থেকে যাও বা সে সব আনা হল এবার মাছ কাটবে কে? আমরা চারটে বউ ই তখন রান্নায় অনভিজ্ঞ। একজনের কর্তা শেষে বিশালাকার এক ব্যাস (bass) মাছ কে ছুরি দিয়ে চিরে তার ফাঁকে ফোকরে লঙ্কা, ধনে, জিরে, রসুন, আদা বাটা, গরমশলা, সব ঠুসে দিল, তারপর ভালো করে তেল নুন মাখিয়ে কাঁচা পেঁয়াজ, টম্যাটো, কাঁচা লঙ্কা গোল গোল করে কেটে মাছের ওপর ছড়িয়ে সেটা বিশাল ওভেনে প্রথমে ব্রয়েল আর তার পাঁচ সাত মিনিট পর ৩০০ ডিগ্রী তে বেক করতে দিল। আমাদের সকলের সেদিন নেমন্তন্ন ওর বাড়ি। আমরা কেউ ডাল, কেউ একটা সব্জি ইত্যাদি বানিয়ে ওর বাড়ি যাচ্ছি, সমস্ত পাড়া ম ম করছে “ব্যাস মসালার” গন্ধে, এমন কি অনেক আমেরিকান প্রতিবেশী লঙ্কার ঝাঁঝে হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করতে করতে ওদের বারান্দার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। সেদিন বুভুক্ষু আট বাঙালী হাপুত হুপুত করে মুসুরির ডালে লেবু চটকে অতি সুস্বাদু ব্যাস মাছের কারিকুরি দিয়ে বেড়াল ডিঙোনো ভাত সাবাড় করল। সেই শুরু হল আমার খাবার নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা, যা আজও বহাল রয়েছে।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের ক্যালিফোর্ণিয়া রাজ্য, সেখানে ছবির মত স্যান ডিয়েগো শহরে রয়ে গেলাম আজ প্রায় আঠেরো বছর হল। প্রথম দিকে ভারতীয় দোকান পাট সব লস এঞ্জেলেস এর কাছাকাছি ছিল, আমার বাড়ি থেকে সে প্রায় তিন ঘন্টার রাস্তা। আমাদের পাশে স্যান মার্কোস শহরে ভারত বাজার বলে একটি সব পেয়েছির দোকান ছিল কিন্তু তার গুজরাটি মালিক আমিষ কিছুই রাখতেন না। সব্জিপাতিও সব শুকিয়ে আমশি হয়ে থাকতো, মাসে হয়তো দু বার উনি লস এঞ্জেলেস থেকে ওগুলো নিয়ে আসতেন। ওখান থেকে আমি কিনতাম গুঁড়ো মশলা, চাল, ডাল ইত্যাদি, আর নিতাম হিন্দী সিনেমার ডিভিডি, সপ্তাহে তিন ডলার মতো ভাড়া। উইকেন্ডে বাড়িতে পিৎজা বেক করে স্পাইসি চিকেন উইংস সহযোগে কোনো একটা মারকাটারি হিন্দী সিনেমা চালিয়ে দেশের উষ্ণতা উপভোগ করতাম।

যে কোনো অভাব থেকেই সৃজনশীলতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, আমিও নিত্য নতুন ফন্দী করতে লাগলাম কি ভাবে এই স্বল্প রসদ থেকে বাঙালী রসনার তৃপ্তি ঘটানো যায়। কর্তা খাদ্য রসিক, বিশেষ করে লুচি পেলে পনেরোটা সাবাড় করে দিতেন। আর আমারও রবিবার হলেই মায়ের হাতের মিষ্টি মিষ্টি সেই সাদা আলু পটলের তরকারি, ওপরে ধনেপাতা কাঁচা লঙ্কা ছড়ানোর স্বাদ মনে পড়ে যেত। কিন্তু কে সাত সকাল উঠে অত ময়দা মাখবে? আর মাখলেও সে কি আর অমন মোলায়েম ফুলকো লুচি হবে? তাছাড়া ওই সারা রান্না ঘর জুড়ে বরফ কুচির মত পড়ে থাকা ময়দা সাফ করাও এক সময় সাপেক্ষ কাজ। আমাদের এখানে একটা পাইকারী বাজার আছে, নাম কষ্টকো। সেখান থেকে আমি ময়দা অথবা আটার কাঁচা তর্তিয়া (মেক্সিকানদের রুটি) কিনে বাড়িতে সেগুলো এ পিঠ ও পিঠ সেঁকে নিতাম খাওয়ার সময়। একদিন লুচির স্বপ্নে বিভোর আমি ওই ময়দার কাঁচা রুটিটা কে চার ভাগে ছুরি দিয়ে কাটলাম আর দুরুদুরু বক্ষে সেগুলো একটা ছোট্ট প্যানে ছাঁকা তেলে ডুবুডুবু ভাজলাম, কি ফোলাটাই না ফুলল তারা, হোক না ত্রিভুজাকৃতি! আর যখন মুখে দিচ্ছি, রসগোল্লার মত গলে যাচ্ছে, “ডি লা গ্র্যান্ডি‌ মেফিস্টোফিলিস …” , আবিষ্কারের আনন্দে চোখে জল এসে গেল। এই বার বাকি পটলের তরকারি, কিন্তু পটল তো নেই! ফ্রীজ হাতড়ে কটা জুকিনি পেলাম, শশার মতো দেখতে, খেতে লাউ এর ভাইয়ের মতো। ওটা দিয়ে আমি একদিন লাউ/জুকিনি চিংড়ি ও করেছিলাম। সেদিন ভাবলাম এবার ব্যাটাকে পটলে পর্যবসিত করা যাক। ওর খোসা টা হাল্কা করে ছাড়ালাম যাতে পটলের খসখসে ভাবটা একটু আসে। এরপর ওই চচ্চড়ির সব্জির মতোই আলু ও জুকিনি ডুমো ডুমো করে কেটে নিলাম। সাদা তেলে চিনি দিয়ে তারপর অল্প আদা বাটা, পাঁচফোড়ন আর কাঁচা লঙ্কা চিরে দিলাম, সুন্দর গন্ধ বেরোলে দিলাম সামান্য টম্যাটো, এরপর আলু একটু ভাজা ভাজা হলে শেষে জুকিনি, নুন তারপর ঢাকা দিয়ে মাখামাখা সেদ্ধ। নামাবার সময় ধনেপাতা আর চেরা কাঁচা লঙ্কা। হয়ে গেলে চেখে দেখলাম পটলের বদলে জুকিনি আমার মান রেখেছে! কর্তা সেদিন ডিনারে ওই পনেরোটা লুচির রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ছিলেন।

নিরন্তর নিত্য নতুন রন্ধন প্রণালী আবিষ্কারের আনন্দই আলাদা। সব কিছু পেয়ে গেলে জীবনটা কেমন আলুনি হয়ে যায়, তাই সর্বত্রই একটু অভাব বোধহয় থাকা ভালো। এই এখন যেমন আমার মনটা কাঁদছে দিদার হাতের রাঙালুর পিঠের জন্য! মা কে জিজ্ঞেস করতেই সেই সুপারহিট পদটির রেসিপিও পেয়ে গেলাম। দিদা রাঙালু গুলো সেদ্ধ করে ছাড়িয়ে নিয়ে ভালো করে ময়দা দিয়ে মাখতেন, সামান্য তেল দিতেন, যাতে সেগুলো ভাজার সময় ছেড়ে না যায়। এরপর সেগুলো গোল করে নাড়ুর আকারে তৈরী করে তার পেটে কিছু কাঁচা সন্দেশ বা পাক দেওয়া নারকেল ঢুকিয়ে দিতেন। এবার সেগুলো ছোট ছোট নৌকোর আদলে গড়ে নিয়ে ছাঁকা তেলে ভাজতেন। তৈরী থাকতো রস, ভাজা পিঠে গুলো ওই রসে ডুবে তাদের শরীর জুড়োতো, দিদা পরিবেশনের সময় পাতে অল্প নতুন গুড় ও দিয়ে দিতেন। এক সঙ্গে যে কতগুলো খেতাম তার হিসেব নেই। এখানে রাঙালুর অভাব নেই, রস ও ক্যান এর রসগোল্লা কিনলে অপর্যাপ্ত থেকে যায়, কোরানো নারকেল ও প্যাকেটেই থাকে, একটু নেড়ে নিলেই হল!

ভ্রমণ পিপাসু বাঙালী পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই তার নিজস্ব রান্নাঘর বানিয়ে ফেলে, বাণিজ্যেতে যেমন সে যাবেই ঠিক সেভাবেই সে খাবেই, সে খাবেই।


(উদ্ভাস পত্রিকার নববর্ষ খাদ্য ও রন্ধন সংখ্যায় প্রকাশিত)

সৌজন্যে প্রতিলিপি ।

Related News

Also Read