শম্পা শীল ( দত্ত) :- বিয়ের তিন বছর পর শ্রীতমা যেন তার দুই সন্তান কে নিয়ে রাহুল কে নিয়ে এক সুখী গৃহিণী।
পুরনো সব কিছু কে ভুলে বাইশ বছরের শ্রীতমা চল্লিশ বছরের রাহুল কে নিজের স্বামী হিসাবে মানতে পেরেছে।এখন রাহুলের কাছে এলে শ্রীতমার যেনো মনে হয় তার দ্বিগুণ বয়সের লোকটার কাছ থেকে পাওয়া স্নেহ ভালোবাসায় সে যেন ধন্য _তার মত একটা সাধারণ গরীব ঘরের মেয়ের জীবনে এত সম্মান ভালোবাসা সব কিছু পেয়েছে শুধুমাত্র রাহুলের জন্য।
বছর চারেক আগের কথা_ শ্রীতমা তখন কলেজে পড়ে,ওর বাড়ীর অবস্থা ও সেরকম ভালো নয়,বাবা একটা কারখানায় কাজ করে,মা বাচ্ছা দেখাশুনার কাজ করে,একটা দিদি_তার বিয়ে দিতে গিয়ে বাবা মা যেনো সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। শ্রীতমা কোনরকমে তিনটে টিউশন করে নিজের পড়ার খরচ টা জোগাড় করে পড়াটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
শ্রীতমার জীবনের বিশেষ কোনো চাহিদা ছিলনা_শুধুমাত্র মনে মনে স্বপ্ন দেখতো তার জীবনে ও একজন রাজপুত্র আসবে যে তাকে তার সবটুকু দিয়ে ভালোবাসবে,তার সাথে বেরোলে সবাই মনে মনে বলবে মেয়েটির বর টা কি সুন্দর দেখতে,তার বর কে দেখে সবাই ঈর্ষা করবে।
কিন্তু শ্রীতমার জীবনের দারিদ্রতার কাছে তার স্বপ্ন কোনোদিন তাকে ধরা দেয়নি। তাই অন্য বান্ধবীদের মত সে কখনো তার স্বপ্নের কথা কাউকে বলতে পারেনি।
একদিন শ্রীতমা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ তার চোখে পড়লো একটা বছর পাঁচ ছয় এর একটি বাচ্চা ছেলে রাস্তার মাঝখান দিকে পার হয়ে উল্টোদিকে আসছে, আর সেই সময় বাচ্চাটির বাদিক দিয়ে একটা ট্রাক ছুটে আসছে। শ্রীতমা ব্যাপার টা লক্ষ করেই এক ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে সরিয়ে নিয়ে এলো।
বাচ্চাটি কে নিজের কাছে এনে তাকে জিজ্ঞাসা করলো সে রাস্তায় একা কেনো? তার সাথে কেউ এসেছে কিনা_তখনি শ্রী তমা দেখলো তার সামনে একজন সুঠাম মাঝবয়সী ভদ্রলোক হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ভদ্র লোকটির সাথে কথা বলে জানতে পারলো বাচ্চাটি ওনার,উনি দোকানে দাঁড়িয়ে কিছু কেনাকাটি করছিলেন,সে সময় বাচ্চাটি উল্টো দিকে খেলনার দোকান দেখে রাস্তা পাড় হতে শুরু করেছে,উনি প্রথমে সেটা খেয়াল করেনি।
শ্রীতমা বাচ্চাটি কে ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিয়ে নিজের বাড়ীর পথে এগিয়ে যেতে শুরু করল, ভদ্রলোক পিছন থেকে শ্রীতমা কে ডেকে বললো চলুন আমার গাড়ী করে আপনাকে বাড়িতে নামিয়ে দিচ্ছি।শ্রীতমা প্রথমে আপত্তি জানালে ও পরে ভদ্র লোকের জোরাজুরিতে রাজি হয়ে গেল।
গাড়িতে উঠে দুজনের মধ্যে ভালো করে আলাপ পরিচয় টা সম্পন্ন হলো_দুজনের নাম ঠিকানা,কে কি করে,টুকটাক কথা বার্তা হতে হতে শ্রীতমার বাড়ি এসে গেলো, কথার মাধ্যমে শ্রীতমা জানতে পারলো ভদ্র লোকের নাম রাহুল,তার ছেলে হবার সময় তার স্ত্রী মারা গেছেন,তিনি বিল্ডার্সের ব্যাবসা করেন,সময় পেলে ছেলে কে নিয়ে নিজে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন।বাচ্চাটি বাড়িতে আয়ার কাছে থাকে।গাড়ী থেকে নামার আগে বাচ্চাটা কে আদর করে শ্রী তমা নেবে পড়লো।রাহুল তখনও আর একবার শ্রীতমা কে ধন্যবাদ জানালো। শ্রী তমা একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল।
এই ঘটনার পর বেশ কিছু বার রাহুলের সাথে শ্রীতমার দেখা হয়েছে,রাহুলের কাজের জায়গা আর শ্রীতমার কলেজের প্রায় পাশে থাকার জন্য মাঝে মধ্যে দুজনের দেখা সাক্ষাৎ হতে লাগলো।দেখা হলে শ্রীতমা বিশেষ কথা না বললেও রাহুল নিজে থেকে অনেক কথা বলতো।ধীরে ধীরে রাহুলের কাছে শ্রীতমার সাথে কথা বলাটা একটা ভালো লাগায় পরিণত হলো।রাহুল নিজের অগোচরে যেনো শ্রীতমা কে ভালোবাসতে শুরু করে দিলো।কিন্তু নিজের বয়সের দিকে তাকিয়ে শ্রীতমা কে আর মনের কথা বলে উঠতে পারেলনা।
একটা সময় শ্রীতমার কলেজের পড়া শেষ হয়ে গেলে,কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো,রাহুল শ্রীতমা কে কয়েকদিন না দেখতেই মনের মধ্যে একটা অস্থির বোধ হতে লাগলো_রাহুল বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করে একদিন শ্রীতমার বাড়িতে চলে গেলো, শ্রীতমার বাড়ীর লোক প্রথমে বুঝতে না পারলে ও রাহুল নিজের পরিচয় দিলে শ্রীতমার বাড়ীর সবাই রাহুল কে চিনতে পারলো।রাহুল কে শ্রীতমার বাবা মা ঘরে বসালো,বেশ আদর আপ্যায়ন ও করলো,অনেক গল্প গুজব করলো। এরই মাঝে শ্রীতমার বাবা শ্রীতমার বিয়ের জন্য একটি ভালো ছেলের সন্ধান করতে বললো,সে সঙ্গে এও বললো আমরা গরীব মানুষ,মেয়ের বিয়েতে আমাদের পক্ষে কিছু দেওয়া সম্ভব নয়, তাই খুব সাধারণ মাপের ছেলে হলেও চলবে।
সেদিন রাহুল বাড়ি ফিরে এলেও মনের মধ্যে শ্রীতমাকে বিয়ে করার প্রবল ইচ্ছা জাগল,কিন্তু নিজের বয়সের দিকে তাকিয়ে, নিজের বিবাহিত জীবনের কথা ভেবে, নিজের সন্তানের কথা ভেবে মনের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করতে পারলনা।
এক সপ্তাহ অনেক ভেবে রাহুল আবার শ্রী তমার বাড়িতে গিয়ে ওর বাবার সাথে কথা বললো,অনেক সাহস সঞ্চয় করে নিজের মনের ইচ্ছার কথা জানাল। শ্রীতমার বাবা যেনো রাহুলের কথা শুনে নিজের কানকে ও বিশ্বাস করতে পারলনা,মনে মনে খুশি হয়ে সে প্রায় রাহুল কে বিয়ের মত দিয়েই দিল_তবু রাহুলের কথায় শ্রীতমার সাথে একবার কথা বলবে ঠিক করলো।
শ্রীতমা কথাটা শুনতেই এক কথায় না বলে দিল,কিন্তু ওর বাবার প্রবল ইচ্ছা তারসঙ্গে মায়ের আংশিক ইচ্ছায় শ্রীতমার মত বদলাতে হলো। শ্রীতমার আনন্দের চেয়ে দুঃখ বেশি হতে লাগলো,তার খালি মনে হতে লাগলো আমাদের মত গরীবের মেয়েদের কোনো ইচ্ছা বোধ হয় থাকতে নেই,প্রথম দিন থেকে সন্তানের মা দিয়েই হবে তার পরিচয়,তার চেয়ে বড়ো কথা তাকে একটা দ্বিগুণ বয়সী লোক কে তার স্বামী হিসাবে মানতে হবে।তবু বাবা মা এর দিকে তাকিয়ে সংসারের কথা ভেবে শ্রীতমা রাহুল কে বিয়ে টা করলো।
বিয়ে করে বাড়িতে আসার পরই রাহুল তার সন্তানের বাড়ীর সব দায়িত্ব শ্রীতমা কে দিয়ে দিল।শ্রীতমা সব দায়িত্ব নিলে ও নিজের মন বা শরীর কোনোটাই রাহুল কে দিলনা।
বিয়ের প্রথম রাতেই শ্রীতমা রাহুল কে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিল সে রাহুলের সাথে এক ঘরে থাকবেনা_সে আলাদা ঘরে থাকতে চায়।রাহুল তার চাহিদা কে সন্মান জানিয়ে বাড়ীর সব চেয়ে বড় ভালো ঘরটা শ্রীতমা কে দিয়ে দিল।
বিয়ের হয়ে আসার পর থেকে শ্রীতমা রাহুলের ছেলে রিকের সাথে সময় কাটাতে তে লাগলো।ধীরে ধীরে রিকের সাথে শ্রীতমার একটা ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো।রিকের ব্যাপারে সব সিদ্ধান্তই ছিল শ্রীতমার।দিনের পরিবর্তনে শ্রীতমা যেনো রিকের নিজের মা হয়ে গেলো।
রাহুলের বাড়িতে আসার পর থেকে শ্রী তমার টাকা পয়সা, জামা কাপড়,সোনা গহনার কোনো কিছুরই অভাব হলনা।কিছুদিনের মধ্যে বাড়ীর সব কাজের লোকের কাছে মালকিন হয়ে উঠলো।রাহুল ও যেনো সব ব্যাপারে শ্রীতমার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে লাগলো। কিন্তু রাহুল যতই শ্রী তমার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করুক না কেনো শ্রী তমা কখনোই রাহুলের সাথে স্বাভাবিক হতে পারতোনা উল্টে কথায় কথায় তাকে অপমানই করতো।
এই ভাবে মাস ছয় এর মধ্যে রাহুলের এক তরফা ভালোবাসা সন্মান যত্নে শ্রীতমার মন ও যেনো গলতে শুরু করলো। শ্রীতমা যখনই নিজের বাপের বাড়ি যায় রাহুল তখন নানা রকম জিনিস কিনে গাড়িতে রেখে দেয়,হাত ভর্তি টাকা দিয়ে দেয়_যাতে শ্রীতমা তার বাবা মায়ের জন্য সব কিছু করতে পারে যা ওর মন চায়।
বিয়ের এক বছরের মাথায় শ্রীতমা ও যেনো রাহুল কে মনের থেকে অল্প অল্প করে মেনে নিতে শুরু করলোএর কিছুদিন পর শ্রীতমা সন্তান সম্ভবা হলো_তখন রাহুলের যত্নে শ্রীতমা যেনো রাহুল কে আরো বেশি করে ভালোবাসতে পারলো।এর কিছু মাস পরে শ্রীতমা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল।
বর্তমানে শ্রীতমা দুই পুত্র নিয়ে রাহুল কে নিয়ে খুবই সুখী_ধীরে ধীরে রাহুলই যেনো শ্রীতমার স্বপ্নের রাজপুত্র হয়ে উঠলো। শ্রীতমা যেনো ভুলেই গেল একটা দ্বিগুণ বয়সী লোক কে ও বিয়ে করেছে_ যাকে ও ধীরে ধীরে ভালোবেসে ও ফেলেছে।
শ্রীতমার সারা মন জুড়ে এখন শুধু অসমবয়সী লোকটি যে তার স্বামী,তার স্বপ্নের রাজপুত্র।






