Select Language

[gtranslate]
১৫ই চৈত্র, ১৪৩২ রবিবার ( ২৯শে মার্চ, ২০২৬ )

হ্যাংলামো

সরজিৎ ঘোষ :- কোলাঘাট থেকে ট্রেনে উঠলেন ভদ্রমহিলা। সঙ্গে বছর সাতেকের একটি বাচ্চা। ট্রেনে উঠেই বাচ্চাটি তার মাকে বলল, “আমি কিন্তু জানলার ধারের সীটে বসব।” সকালের আপ ট্রেন এমনিতেই ফাঁকা থাকে। মোটামুটি সীট ফাঁকা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিকে ওদিকে এক-দুজন করে বসে আছে সীটে। আমার অপজিট দিকে জানালার ধারের ফাঁকা সীটটায় বসল বাচ্চাটি, পাশে বসল বাচ্চাটির মা।

ঘটনাটা আজ সকালের। ট্রেনে বসতে না বসতেই বাচ্চাটি মা’কে বলল,

“মা খিদে পেয়েছে।”

বাচ্চার কথা শুনেই মা বলল,

-তোর কি ট্রেনে উঠলেই খিদে পায়? এখন নয় পরে খাবি।

বাচ্চাটি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল,

-কত পরে? আমি কিন্তু ঝালমুড়ি খাব।

মা বড়ো বড়ো চোখ করে বলল,

-একদম না। আজে বাজে জিনিস খাওয়া একদম ভালো না। ঝালমুড়ি খেলে অসুখ করে। পেটে ব্যথা হয়।

কোলাঘাট পেরিয়ে ট্রেন তখন মেচেদা স্টেশনে ঢুকল। মেচেদা থেকে দু একজন প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠল। এদের মধ্যে একটি কম বয়সী ছেলে আমার পাশে এসেই বসল। বাচ্চাটি জানালার ধারের সীটে বসেছে বটে, তার উৎসুক চোখ কি যেন একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কথায় বলে যে খায় চিনি তাকে জোগায় চিন্তামণি। ঝালমুড়ি বিক্রেতা ততক্ষণে ঝালমুড়ি নিয়ে হাজির। বাচ্চাটি ঝালমুড়ি বিক্রেতাকে দেখে মা’কে বলল,

-খুব খিদে পেয়েছে আমার। আমাকে আগে ঝালমুড়ি কিনে দাও।

মা বলল,

-তোমাকে কি বললাম আমি? মায়ের কথা শুনতে হয় তো! তুমি না ভালো ছেলে!

বাচ্চাটি কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল। আমার পাশে বসা ছেলেটি ঝালমুড়ি বিক্রেতাকে ডেকে বললেন,

“ভাই একটা মুড়িমাখা বানাবেন তো! ঝাল কম দেবেন।”

বাচ্চাটি তখন মায়ের মুখের দিকে একবার তাকাচ্ছে, ঝালমুড়ি বিক্রেতার দিকে একবার তাকাচ্ছে। আমিও উল্টোদিকে বসে বাচ্চাটির রকম সকম দেখছি। কিছুক্ষণ উষঘুষ করতে করতে বাচ্চাটি বলে উঠল,

“আমি ঝাল মুড়ি খাবই।”

মা বলল,

-উঁহু একদম না। তোমাকে আমি কি বললাম? ভুলে গেলে?

বাচ্চাটি উত্তর দিল,

-ঝালমুড়ি খেলে কিছু হয় না। অসুখও করে না। ওই তো ওই আঙ্কেলটা খাচ্ছে। যদি অসুখই করে তাহলে আঙ্কেল খাচ্ছে কেন? আঙ্কেলের পেট ব্যথা হচ্ছে না তো। আজে বাজে জিনিস বিক্রি করলে তো পুলিশে ধরে, তাহলে ঝালমুড়ি আঙ্কেলকে পুলিশে ধরছে না কেন? আমাকে কিনে দিতেই হবে।

আঙ্কেল আর ঝালমুড়ি আঙ্কেল তখন হাঁ করে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে আছে। বাচ্চার এমন কথা শুনে মাও চুপ। বাচ্চাটি এরপর এমন বায়না শুরু করল, পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষমেষ ঝালমুড়ি কিনে দিতে বাধ্য হলো মা। বাচ্চাটি মনের আনন্দে ঝালমুড়ি খেতে শুরু করল। মা তখন রাগত স্বরে বলল, এই খাচ্ছ খাও। এরপর বাসে উঠেও যেন বায়না না করা হয়। আর শোনো পিসিমণির বাড়িতে গিয়ে যেন হ্যাংলামো করো না। সব জায়গায় গিয়ে সেই খাবার জন্য হ্যাংলামো করবে, এমন করো যেন বাবা মা যেন খেতে টেতে দেয় না। হ্যাংলামো করবে তো পিসিমণি তোমাকেই হ্যাংলা বলবে, তোমাকেই খারাপ বলবে। যেটা ঘরে করো সেটা পরের বাড়িতে করবে না। মনে থাকবে তো?

বাচ্চাটি ঘাড় নেড়ে সম্মত জানিয়ে বলল, মনে থাকবে।

মিনিট তিনেক পর ভদ্রমহিলার মোবাইলে রিং হতেই বাচ্চাটি জিজ্ঞেস করল,

-কে ফোন করেছে মা।

-এই দেখ তোর পিসিমণিই ভিডিও কল করেছে।

ভদ্রমহিলা ভিডিও কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল,

-কত দূর তোমরা?

ভদ্রমহিলা বললেন,

-এই তো ট্রেনেই। আর একটু পরেই পাঁশকুড়া নামব।

-বাবা! এখনো ট্রেনে? কখন এসে পৌঁছবে গো? দুপুর না হয়ে যায়।

ভদ্রমহিলা হেসে বললেন,

-আরে তোমার দাদা অফিস বেরোল। সে কারণেই দেরি হলো বেরোতে।

-সে ঠিক আছে, তা আমাদের গোপাল কোথায়, গোপালকে দেখছি না তো?

ভদ্রমহিলা তখন গোপাল তথা বাচ্চাটির হাতে মোবাইলটা দিয়ে বলল,

-পিসিমণি কি বলছে শোনো।

গোপালের এক হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা, অন্য হাতে মোবাইল। পিসিমণি গোপালকে দেখে বলল,

-কি খাচ্ছ বাবু?

-ঝালমুড়ি।

-সে কি! তুমি ঝালমুড়ি খাচ্ছ? আমি এত কিছু যে রান্না করেছি, সে গুলো কে খাবে? আমি তো তোমার জন্য চিকেন বানিয়েছি। তুমি চিকেন খেতে ভালোবাসো। চিকেন খাবে তো বাবু?

গোপাল মন খারাপ করে বলল,

-না আমি খাব না।

পিসিমণি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

-কেন বাবা, খাবে না কেন?

-খেলেই তো হ্যাংলা বলবে। তাই খাব না।

-এ মা হ্যাংলা কেন বলব, আমি কি তোমাকে হ্যাংলা বলেছি কখনো?

-আমার মা ই তো বলেছে,যেটা ঘরে করো সেটা পরের বাড়িতে গিয়ে করবে না। পিসিমণি হ্যাংলা বলবে।

এমন কথা শুনে বাচ্চাটির মোবাইলটা হাত থেকে নিয়ে ভদ্রমহিলা বলল,

-দেখেছো, কেমন উল্টো পাল্টা বলছে, তুমি হয়তো ভাববে ওর মা ওকে শিখিয়ে দিয়েছে। এই রাখি গো, নামতে হবে।

ভিডিও কলটা কেটে দিয়ে ভদ্রমহিলা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে আস্তে করে বললেন, তোর খবর আছে। বাড়িতে ফিরি, তারপর। একটা কথা বলেও শান্তি নেই আমার। জম্মের হ্যাংলা একটা।

বাচ্চাটি ঝাল মুড়ির ঝালে হু হা করতে করতে জিজ্ঞেস করল,

-জম্মের হ্যাংলা কে মা?

“-আমার শত্রু, যাকে আমি আমি কিনা পেটে ধরেছিলুম?”

কলমে: । Sarajit Ghosh

Related News

Also Read