Select Language

[gtranslate]
২রা পৌষ, ১৪৩২ বুধবার ( ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৫ )

৮৪ তম বর্ষে পটাশপুরের জব্দা রাস মেলার উদ্বোধন

ছিলেন এক পরিবারের কুলদেবতা। একসময়ে গ্রামের মানুষদের দাবিতে তিনি হয়ে উঠলেন সকলের দেবতা। তাঁকে ঘিরে শুরু হলো রাস উৎসব। সেই উৎসবের খ‍্যাতি এখনও উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত পৌঁছেছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় পটাশপুরের জব্দা রাসের কাহিনী এমনই।

পটাশপুর-২ ব্লকের আড়গোয়াল গ্রাম পঞ্চায়েতের জব্দা গ্রামের রাস উৎসব। জব্দা রাস উৎসবটি এবছর ৮৪ তম বছরে পড়েছে। কিন্তু এটি সর্বজনীন রাসের বয়স। তার বহু বছর আগে থেকে ব্রজবল্লভপুরের মদনমোহনকে ঘিরে রাস উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই উৎসবের সঙ্গে যোগ ছিল নন্দ গোস্বামী পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফে।

কীভাবে ব্রজবল্লভপুরের মদনমোহন জব্দায় গিয়ে সর্বজনীন হলেন? সেই ঘটনা জানার আগে মদনমোহনের কুলদেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জেনে নেওয়া যেতে পারে। নন্দ গোস্বামী পরিবার ব্রজবল্লভপুরের আদি বাসিন্দা নন। নন্দ গোস্বামী পরিবারের প্রবীন সদস‍্য বলাইচাঁদ নন্দ গোস্বামী স্মৃতিচারনা করেছিলেন, তাদের কুলদেবতার কাহিনির বিষয়ে। তিনি জানালেন-নন্দ গোস্বামী ছিলেন এলাকার জোতদার। একসময় তাদের পরিবার প্রতিষ্ঠা করা হয় কুলদেবতা মদনমোহনকে। নন্দগোস্বামীরা তাদের বাড়ির সামনে মন্দির গড়ে মদনমোহনের বিগ্রহ স্থাপন করেন। সে প্রায় আনুমানিক ২৫০ বছরের আগেকার কথা। চুন,সুড়কি দিয়ে গাঁথা পুরু খিলান দেওয়া বিশালাকার মন্দির গড়ে তুলেছিলেন নন্দ গোস্বামীরা।

মন্দিরের গায়ে ছিল টেরাকোটার কাজ। ছিল দেব-দেবীর মূর্তির কারুকাজ। সে মন্দির ভেঙেছে। নতুন করে গড়া হয়েছে সেটি। দোল উৎসব থেকে জন্মাষ্টমী, ঝুলন বা রাস সবেতেই মদনমোহনকেই ঘিরে পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতেন। সেই সময় গ্রামের বাসিন্দারা নন্দ গোস্বামীদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে খুব একটা যোগ দিতেন না। অথচ গ্রামে সকলের জন‍্য একটা রাস উৎসব চালু হোক , সেই ইচ্ছাও ছিল বাসিন্দাদের। সেই ইচ্ছে থেকেই প্রস্তাব দেওয়া নন্দ গোস্বামীদের। সেটা ১৯৪১ সাল। প্রতি বছরের মতো সেবার দীপাবলির পরে কূলদেবতা মদনমোহনের মন্দিরে পালন হয় গিরিগোবর্ধন যাত্রা। সেই অনুষ্ঠানে নিয়ন্ত্রিত ছিলেন গ্রামের প্রবীন কয়েকজন। প্রসাদ খেতে খেতে ননীগোপাল নন্দগোস্বামী, নরেন্দ্রনাথ জানা, বলাই গোস্বামীর মতো প্রবীনরা প্রস্তাব দেন ব্রজবল্লভপুরের রাস উৎসব গ্রামের সকলের করে দেওয়া হোক। সেইমতো কথাবার্তাও শুরু হয়।

 

প্রথমে কিছুটা দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন, নন্দ গোস্বামীর পরিবারের কর্তা অঘোর নন্দ গোস্বামী। পরে অবশ‍্য প্রস্তুতি শুরু হয় মদনমোহনকে জব্দায় নিয়ে আসার। জব্দা মাঠে একটি কদম গাছ ছিল। সেই কদমতলায় প্রথম মন্দির থেকে মদনমোহনকে এনে #রাস_পূর্নিমা উৎসব শুরু হয়। একেবারেই অনাড়ম্বর ছিল সেই অনুষ্ঠান। হ‍্যারিকেন জ্বালিয়ে শুরু হয়েছিল কৃষ্ণের রাসলীলা। প্রথম দিকে মানুষ খুব একটা উৎসাহ না দেখা দিলেও, ক্রমেই তা জনপ্রিয় হতে থাকে। ধীরে ধীরে হ‍্যারিকেনের বদলে মেলায় আসতে থাকে পেট্রোম‍্যাক্স। যা সাধারনভাবে হ‍্যাজাক লাইট হিসাবে পরিচিত ছিল। তারপর ব‍্যবস্থা করা হতে থাকে উৎসব-অনুষ্ঠানের। রাসের সময় অনুষ্ঠিত হতো যাত্রা কখনোও থিয়েটার । গ্রামের বাসিন্দারাই মহড়া দিয়ে যাত্রাপালা নামাতেন। বর্তমানে রাস উৎসব একাদশীতে ঘটোত্তোলনের মধ‍্য দিয়ে শুরু হয়। দ্বাদশী থেকে রাসমন্দিরে মদনমোহন এলেও প্রতি রাতে মন্দিরে বিগ্রহ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার রীতি আছে। কিন্তু দ্বিতীয়াতে মদনমোহন সারারাত থাকেন। তৃতীয়াতে দধি উৎসবের শেষে আবার মন্দিরে ফিরে আসেন। কয়েকশো বছরের উৎসব। মদনমোহনকে ঘিরে তৈরী হয়েছে জনশ্রুতিও। সেই গল্পটা বলেছিলেন-বলাই চাঁদ নন্দ গোস্বামী। তাঁর কথায়—একবার চুরি হয়েগিয়েছিল মদনমোহনের বিগ্রহ। কিন্তু চোর সেই বিগ্রহ নিয়ে যেতে পারেনি। ফেলে গিয়েছিল জমির আলে। কিন্তু পরিবারের সদস‍্যরা তা জানতেন না। পরে এক সদস‍্যকে স্বপ্নাদেশ পান। গ্রামের লোকজন জমিতে গিয়ে খুঁজে পান বিগ্রহ। পারিবারিক উৎসব সর্বজনীন হয়ে কেমন রূপ পেয়েছে? তাঁর প্রমান উৎসবের প্রস্তুতিতেই পাওয়া যায়। আশেপাশের ১০-১২টি গ্রামের উৎসবের আয়োজন সাহায‍্যের হাত বাড়িয়ে দেন। দূর্গাপূজা ও কালীপূজার থেকে এখানে বহু মানুষ রাসের উৎসবে বেশি মাতেন। দশদিনের রাসের মেলা। উত্তরবঙ্গ সহ রাজ‍্যের বিভিন্ন প্রান্তের ব‍্যবসায়ীরা এখানে পসরা নিয়ে হাজির হোন। পোশাক আশাক থেকে খাওয়া দাওয়া সবরকম পসরায় সেজে ওঠে মেলা। দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন‍্য অতিথি নিবাস ও খাওয়াদাওয়া ব‍্যবস্থা করে মেলা কমিটি। প্রতিদিন রাতে যাত্রানুষ্ঠান হয়ে থাকে।

Related News

Also Read