Select Language

[gtranslate]
২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ রবিবার ( ১৪ই ডিসেম্বর, ২০২৫ )

প্রতিবাদ

সরজিৎ ঘোষ

 

লোকাল ট্রেনে যারা যাতায়াত করে তারা অনেকেই জানে ভীড় ট্রেনে ওঠা নামার কি ঝামেলা। অনেক সময় হয় কি ট্রেনে উঠতে গিয়েও উঠতে পারা যায় না বা নামতে গিয়েও নামা য়ায় না। আমার নিজের ক্ষেত্রেই হয়েছে, নামতে গিয়েও নামতে পারিনি, পরের স্টেশনে নামতে হয়েছে। আর লোকাল ট্রেন গুলো নির্দিষ্ট টাইমের বেশি একটুও দাঁড়ায় না। সব থেকে বেশী অসুবিধা হয় ব্যস্ততম স্টেশন গুলির ক্ষেত্রে যেখানে লোক ওঠা নামাটাই বেশিই হয়। ইস্টার্ন রেলে শ্রীরামপুর এমনই একটা স্টেশন। ভীড় থাকলে লোক নামতে নামতেই ট্রেন ছেড়ে দেয়। ট্রেনে ওঠাটা তখন চাপের হয়ে যায়।

 

ঘটনাটা কিছুদিন আগের। আমিও শ্রীরামপুর থেকে ট্রেনে উঠব। বর্ধমান হাওড়া লোকাল। প্ল্যাটফর্মে বেশ ভীড়। অফিস টাইম নয় তবে। ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকতেই হুড়মুড়িয়ে ট্রেনে ওঠা। কোনো রকমে ভীড় ঠেলেই ট্রেনে উঠেই ভিতরে ঢুকে গেলাম। অনেকেই উঠতে পারেনি, ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে।

 

ট্রেনে ওঠার পর থেকেই শুরু হলো ঝামেলা‌। প্রচণ্ড চীৎকার করছেন এক বয়স্কা মহিলা তাও বয়স হবে প্রায় পঞ্চান্ন বা তার বেশি। নানা রকম অশালীন ভাষা গালি গালাজ করতে শুরু করেছে। অসভ্য, জানোয়ার, ইতর, নো়ংরা ব্যাটাছেলে। ওই হাতটাই আমি ডেঙে দেব। যাকে উদ্দেশ্য করা বলা তিনিও প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী এক মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

 

-কী করলাম আপনার সাথে?যে আপনি এত উত্তেজিত হয়ে গালি গালাজ করছেন?

 

ভদ্রমহিলার মেজাজ তখন সপ্তমে। চড়া গলায় বললেন,

 

-একটা কথা বলবি না। নির্লজ্জ বেহায়া।

 

-মুখ সামলে কথা বলবেন। কাকে কী বলছেন?

 

-দেখবি তোকে জুতো দিয়ে মারব?

 

পাশ থেকে একজন জানতে চাইলেন,

 

-কী হয়েছে? উনি কী করেছেন?

 

-এত অসভ্য উনি ট্রেনে ওঠার সময় আমার হাতটা বার বার টিপে ধরছিলেন‌।

 

-এই যে একদম বাজে কথা বললেন না। আমি তো আপনাকে উঠতেই সাহায্য করছিলাম। ভীড়ে তো আপনিই উঠতে পারছিলেন না। আপনাকে ঠেলে দিয়ে অনেকেই উঠে পড়লো।আপনি উঠতে পারছেন না দেখে আপনার বাহুটা ধরে উঠিয়ে দিলাম, আর আপনি এসব বলছেন?

 

-একদম বাজে কথা বলবি না। জানোয়ার একটা।

এই সব হাত ধরাধরি বাড়িতে করবি। যত সব ফালতু। গালে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় মারতে পারলে ভালো হতো।

 

-আপনার উপকার করে তো ভুল করলাম দেখছি। বিশ্বাস করুন আপনি মহিলা তাই আপনাকে কিছু বললাম না। মেয়েদের কতোটা সম্মান করতে হয় আমি জানি। এরপর একটা কথাও বলবেন না।

 

এই ভাবে বেশ অনেকক্ষণ চলছে। ভদ্রমহিলা যা না তাই বলে যাচ্ছে। ওনাকে থামার কথা বললেও উনি থামছেন না, উল্টে আরো অশালীন কথা বার্তা শুরু করলেন..

 

-বাড়িতে বৌ আছে? বৌ এর সাথে এসব করিস। মনে হচ্ছে তো বৌ এর সাথে সম্পর্কটা ঠিকঠাক নেই। তাই বৌ লাথি মেরে বের করে দিয়েছে।

 

ভদ্রলোক তো এমন কথা শুনে কি বলবে আর ভাষা খুঁজে পেলেন না। মাথা নীচু করে মুখটা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন শেষ পর্যন্ত। চোখে মুখে তখন ভীষণ একটা লজ্জার ছাপ। এই সব দেখে শুনে স্থির রাখতে না পেরে মুখ খুললেন অন্য এক ভদ্র মহিলা। বয়স ওই চল্লিশ বিয়াল্লিশ। ভদ্র মহিলা বেশ সুন্দরী।এবং সাজগোজ বেশ পরিপাটী এবং সুসজ্জিতা। তিনি ওই ভদ্র মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,

 

-কি ভাবেন বলুন তো নিজেকে? অনেকক্ষণ থেকেই শুনে যাচ্ছি। চুপ করে আর থাকতে পারলাম না। আপনি বলতে চাইছেন আপনার সাথে অসভ্যতা করেছে?

 

-তা নয় তো কি!

 

-অনেক বলেছেন আর একটা কথাও বলবেন না। অসভ্যতা তো আপনি করছেন দেখছি। ইচ্ছে করছে আপনার গালে আমি একটা চড় কষিয়ে দিই। নেহাত আপনি আমার থেকে সিনিয়র। নাহলে থাপ্পড়টা মেরেই কথা বলতাম। ফাসট্রেশনে ভুগছেন মনে হচ্ছে?

 

-আপনার গা জ্বলছে কেন? আপনাকে তো বলছি না। এই সব লোকেদের কতটুকু চেনেন আপনি?

 

-আপনার থেকে বেশি চিনি। আপনার সঙ্গেই আরো দু তিনজন মহিলা এই কামরায় উঠলেন, আর আপনার সাথেই এই অসভ্যতা করলো? আর আপনার সাথে তো আমিও উঠলাম।আমি আপনার পিছনে ছিলাম। আমি তো দেখলাম উনি আপানাকে হেল্প করলেন ট্রেনে উঠতে, আর আপনি যা মুখে আসছে তাই বলে যাচ্ছেন।

 

-ও আপনার মতো সুন্দরীর সাথে এরকম হলে নিশ্চয়ই আনন্দ পেতেন?

 

-আপনার মতো মহিলাদের জন্য সত্যিই কষ্ট হয়। মানুষ চিনতে শিখুন। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে উনি এসব করতে পারেন?ট্রেনে তো এত গুলো মানুষ আছে একটু জিজ্ঞাসা করে দেখুন তো!আপনাকে হেল্প করেছে এটাই বড়ো অন্যায়। পুরুষ জাতির ওপর আপনার কোনো পুরানো হিসেব নেই তো? তাই হয়তো আপনার রাগ। খুব যদি ভুল না বলি দেখে তো মনে হচ্ছে বিয়েও করেন নি। তাছাড়া অন্যের সৌন্দর্য্য দেখেও আপনি ঈর্ষান্বিত। সৌন্দর্য্য তো কারো হাতে থাকে না। আপনি আপনার ভিতরের মানুষটাকে সুন্দর করে তুলুন। দেখবেন জগৎটাই পালটে গেছে। ভরসা রাখুন পুরুষ জাতির ওপর। বিশ্বাস করতে শিখুন। পুরুষ মাত্রেই খারাপ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন।কিছুদিন আগেই তো ট্রেনের মধ্যে একজন মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অনেক মহিলাও ছিল ট্রেনে। তবে সেদিন সহযোগিতার হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল পুরুষরাই। সেই পুরুষরা আসলে কারো দাদা কারো বাবা কারো ভাই কারো স্বামী।নিজেকে পালটান জগৎটাই পালটাবে। তা না’হলে নিজে যেমন সবাইকে সেভাবেই দেখবেন।

 

-থামুন আপনি। অনেক লেকচার ঝেড়েছেন।

 

-লেকচার হিসেবেই কথা গুলো নিন। যদি একটু শোধরাতে পারেন। আগামী দিনে কোনো পুরুষ সহযোগিতা করতেই তো ভয় পাবে, শুধু মাত্র আপনাদের মতো মহিলাদের জন্য। আর এই যে ট্রেনের মধ্যে আপনারা এত গুলো ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন আর চুপচাপ আছেন অন্তত যেটা অন্যায় সেটা অন্যায় বলতে শিখুন। প্রতিবাদটা অন্তত করুন। আজ ওনাকে দেখছেন আগামী দিনে ওনার জায়গায় আপনারা নিজেদেরকে দেখবেন। সেদিন কিন্তু আপনারা দোষ না করেও দোষী হয়ে উঠবেন। পারবেন তো নিজেকে ঠিক রাখতে? এখন তো আবার ন্যায় অন্যায়ের বিচার পরে হয়, তার আগে ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। ভাবুন, একটি বার ভাবুন।….

 

কথা গুলো বলতে বলতে ভদ্র মহিলা কোন্নগরে নেমে গেলেন। সবাই একদম চুপ। কারো মুখে তখন কোনো কথা নেই আর। মনে মনে ভাবছিলাম, ঠিকই তো বলে গেলেন ওই ভদ্রমহিলা। মেয়েরা বিপদে পড়লে, অসহায় অবস্থায় পড়লে পুরষরাই তো এগিয়ে আসে। তবে পুরুষের অসহায় অবস্থায় কতজন রুখে দাঁড়ায়? দোষ না করলেও তাকে দোষী বানিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে এই প্রথমবার দেখলাম, একটি মেয়ে পুরুষের হয়ে প্রতিবাদ করে গেল। ঠিক প্রতিবাদ নয়, বরং চোখের ওপর যে পর্দাটা দেওয়া ছিল, সেটা টেনে খুলে দিয়ে গেল।

Related News

Also Read