মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া গণিতজ্ঞকে বাঁচাতে এসেছিলেন শ্রীশ্রী মা সারদামনি। তাও তাঁর নিজের দেহই যখন ইহলোকে নেই, তখন। শুনতে আজগুবি মনে হলেও ঘটনা এমনই।
কেশব নাগ গণিতজ্ঞ কিন্তু অসম্ভব বিশ্বাস ছিল সারদা দেবীর উপর। ছিলেন তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত। তাই তো প্রায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া গণিতজ্ঞকে বাঁচাতে এসেছিলেন শ্রীশ্রী মা সারদামনি। তাও তাঁর নিজের দেহই যখন ইহলোকে নেই, তখন। শুনতে আজগুবি মনে হলেও ঘটনা এমনই। নিজে সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ কেশব চন্দ্র নাগ। ওই ঘটনা না ঘটলে হয়তো কেশব নাগের আর কেশব নাগ হয়ে ওঠা হত না।
রামকৃষ্ণের অর্ধাঙ্গিনী শ্রী শ্রী মা’ও ঈশ্বরীর রূপ। তিনি বারবার তাঁর ভক্তদের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন শুধুমাত্র তাঁদের স্মরণ করাতেই। শুধু জীবদ্দশায় নয়, মৃত্যুর পরেও তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতা পৌঁছে যেত তাঁর ভক্তদের কাছে। সারদা দেবীর দেহ ইহলোক ত্যাগ করেন ১৯২০ সালে। ১৯১৯ সালে জানুয়ারি মাসে মায়ের থেকে দীক্ষা নেন কেশবচন্দ্র নাগ। গণিতজ্ঞ তাঁরই একটি বইতে লিখেছেন, ‘তখন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে মাস্টারি করছি। মায়ের দর্শন হতেই তাঁকে বললাম দীক্ষা নেবার আকাঙ্ক্ষার কথা। মা মহামন্ত্র দিলেন। একটি রুদ্রাক্ষের জপমালাও দিলেন। মা সেটি জপ করে দিয়েছিলেন।’
এর মাঝে কেটেছে ২৩টি বছর। ঘটনা ১৯৪২ সালের। গণিতজ্ঞ লিখেছেন, ‘প্রচণ্ড অসুখে পড়লাম। দেশের বাড়ি গুড়াপে এলাম। বাড়িতে সবাই খুব চিন্তিত। গুড়াপে তখন একজন ভালো ডাক্তার এসেছিলেন। তিনি দেখছিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছুই হচ্ছিলো না। রোগ ক্রমশ বাড়তে লাগলো। পরিজনেরা ভয় পেলো। বাঁচার আসা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এলো। তবে চিকিৎসার কোনও ত্রুটি ছিল না। ক্রমে ভীষণ শ্বাস কষ্ট শুরু হল। ডাক্তার বললেন ‘অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগবে’। বাড়ি থেকে কে যেন গেলো বর্ধমানে সিলিন্ডার আনতে। সেই রাত আমার স্পষ্ট মনে আছে। কষ্টটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। বুঝিবা শেষ রাত।’
সেদিন গনিতজ্ঞের বাড়িতে কারও চোখে ঘুম নেই। গনিতজ্ঞ লিখছেন, ‘হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল। মা’কে অসুস্থ অবস্থায় সেবা করেছিলেন স্বয়ং মা কালী। আর আমার এই দুঃসময়ে মা কি আমায় বাঁচাবেন না? বারবার শুধু তাঁর কথাই ভাবছি। তাঁকে ডাকছি। হাত -পা নাড়ানোর ক্ষমতা নেই। শুধু কাঁদছি আর কাঁদছি। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো। স্পষ্ট দেখলাম মায়ের মতো কে একজন আস্তে আস্তে আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, মা-ই তো! সেই মুখ, সেই চোখ, সেই সরু লাল পাড় শাড়ি। দু চোখে করুণা ঝরে পড়ছে। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।’ আরাম অনুভব করলেন কেশব নাগ।
তাঁর কথায় , ‘মনে হচ্ছিল, আমি সেরে যাচ্ছি। আমি হাত-পা নাড়তে পারছি। হয়তোবা কথাও বলতে পারবো। মা আমাকে সাদা একটা গুলি খাইয়ে দিলেন, যা দেখতে অনেকটা ন্যাপথালিনের মতো। গুলিটা যতই গলা দিয়ে নামছে মনে হচ্ছে আমার সমস্ত রোগযন্ত্রণা নিয়ে সেই গুলি যেন শরীরে মিশে যাচ্ছে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কোনও খেয়াল নেই। ভোরবেলা ঘুম ভাঙলো মনে হল আমার শরীরে কোনও কষ্ট নেই। কোনও যন্ত্রণা নেই , কোনও রোগ নেই। আমি সুস্থ। সম্পূর্ণ সুস্থ!’
পরের দিন সকালে নিজেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান গণিতজ্ঞ। সবাইকে অবাক করে হাঁটতেও শুরু করেন। এক রাতে কি এমন ম্যাজিক হল! এটা ভেবেই সবাই অবাক। সকালে চিকিৎসক আসেন। তাঁকে কেশবচন্দ্র নাগ বলেন , ‘ডাক্তারবাবু আমি সেরে গিয়েছি। আমি ভালো হয়ে গেছি।’ ডাক্তার অবাক। চিকিৎসক নিজেই তাঁকে বলেন , ‘ভগবানই তোমাকে বাঁচিয়েছেন’। ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার ফেরত গেলো! ক্রমেই সুস্থ হয়ে হয়ে ওঠেন গণিতজ্ঞ। সুস্থ হয়ে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছিলেন , ‘আমার জীবনদাত্রী মা! কেমনে ভুলি করুণা তাঁর?’






