Select Language

[gtranslate]
২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বৃহস্পতিবার ( ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

শ্রীশ্রীমা সারদা দেবী লীলা সংবরণ স্মরণে

সৌমেন মিত্র:-দেহ যাইবার মাত্র পাঁচ দিন বাকী আছে। ভক্ত অন্নপূর্ণার মা দেখিতে আসিয়াছেন; কিন্তু ভিতরে যাইতে নিষেধ বলিয়া ঠাকুর ঘরের দুয়ারে দাঁড়াইয়া আছেন। হঠাৎ পাশ ফিরিয়া মা তাঁহাকে দেখিয়াই ইশারা করিয়া নিকটে ডাকিলেন।

তিনি কাছে গিয়া প্রণাম করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, “মা, আমাদের কি হবে ?” করুণা বিগলিত ক্ষীন কন্ঠে অভয় দিয়া মা থামিয়া থামিয়া বলিলেন “ভয় কি ? তুমি ঠাকুরকে দেখেছ, তোমার আবার ভয় কি ?” একটু পরে আবার ধীরে ধীরে বলিলেন, “তবে একটি কথা বলি — যদি শান্তি চাও, মা, কারোর দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগত্কে আপনার করে নিতে শেখ। কেউ পর নয়, মা, জগৎ তোমার।” যাঁহাদের দুঃখে বিচলিতা হইয়া ওং অভয়া শরীর পরিগ্রহ পূর্বক স্বয়ং অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করিলেন, সেই আর্তদিগের প্রতি ইহাই তাঁহার শেষ বাণী।

বিদায়ের তিন দিন পূর্ব হইতে তিনি বড় একটা কথা বলিতেন না — সর্বদাই আত্মস্থ হইয়া থাকিতেন। কেহ তাঁহার মনকে নিম্ন ভূমিতে টানিতে চেষ্টা করিলে বিরক্তি বোধ করিতেন। পরে ধীরে ধীরে বাক সম্পূর্ণ বাক-রোধ হইল। রোরুদ্যমান সেবকের প্রতি তাঁহার শেষ সান্ত্বনা, “শরৎ রইল, ভয় কি ?”

অবশেষে ১৩২৭ সালের ৪ঠা শ্রাবণ, মঙ্গলবার, রাত্রি দেড়টার সময় (২১শে জুলাই, ১৯২০) তিনি কয়েকবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া মহা সমাধিতে নিমগ্ন হইলেন। রোগে ভুগিয়া তাঁহার দেহ মলিন ও শীর্ণ হইয়া গিয়াছিল; কিন্তু মহাসমাধির পর রোগের সকল চিহ্ন অপসৃত হইয়া মুখখানি যেন একটা পূর্ণতা লাভ করিল এবং এক অপূর্ব শান্তি ও দিব্য জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। এই স্বর্গীয় ভাব দেহ শীতল হইয়া যাওয়ার অনেক পরেও বিরাজিত ছিল। অনেকে ঐ উজ্জল মুখকান্তি দর্শন করিয়া বুঝিতেই পারিলেন না যে, শ্রীমা আর স্থুলদেহে নাই।

পরদিন আন্দাজ সাড়ে দশটার সময় স্বামী সারদানন্দজীর নেতৃত্বে সাধুভক্তগণ গন্ধপুষ্প মাল্যাদিতে সুসজ্জিত শ্রীমায়ের পূতদেহ স্কন্ধে তুলিয়া ‘রামনাম’ কীর্তন করিতে করিতে উদ্বোধন হইতে বরাহনগর পথে বেলুড় মঠে যাত্রা করিলেন।

অনেক প্রবীণ ভক্তও পদব্রজে ইহাঁদের সঙ্গে চলিলেন। ক্রমে শত শত ভক্ত তাঁহাদের সহিত সন্মিলিত হইলেন। বরাহানগরে নৌকাযোগে গঙ্গা উত্তীর্ণ হইয়া শ্রীমায়ের দেহ মঠভুমিতে গঙ্গাতীরে রক্ষিত হইল। চিতাগ্নি নির্বাপিত হইবার পূর্বেই দেখা গেল, গঙ্গার ওপর তীরে বারিপাত হইতেছে; ভক্তগণ তাই একটু শঙ্কিত রহিলেন কিন্তু এপারে কিছুই হইলো না। সন্ধার প্রাক্কালে যখন কার্য সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে এবং স্বামী সারদানন্দজী অগ্নি নির্বাপনের জন্য প্রথম কলসীর জল ঢালিয়া দিয়াছেন, তখন মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়া আসিয়া মঠ ভূমি ভাসাইয়া দিল। হোমাগ্নি নিভিয়া গেল; মাথায় শান্তিবারি এবং হৃদয়ে গভীর বিষাদ লইয়া সন্ধ্যাকালে সকলে স্ব স্ব স্থানে ফিরিলেন।

ওই পবিত্র স্থানের উপর মাতৃমন্দির নির্মিত এবং ১৩২৮ সালের ৬ই পৌষ (২১শে ডিসেম্বর, ১৯২১) শ্রীশ্রীমায়ের জন্ম তিথি দিবসে যথাবিধি প্রতিষ্ঠিত হইয়া আজিও দেশ বিদেশের সহস্র সহস্র নরনারীর ভক্তি শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতেছে।

— স্বামী গম্ভীরানন্দজীর মাতৃজীবনী হইতে।

Related News

Also Read