কাঁথির মিশ্র বাড়ির পুজো এ বছর ২৮৬ বছরে পদার্পণ করল ,সনাতন সংস্কৃতি পরম্পরা এবং বৈদিক আচার পদ্ধতির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করে এই পূজা, দীর্ঘকাল যাবত হয়ে আসছে, স্বর্গীয় মৃত্যুঞ্জয় মিশ্র তিনি ছিলেন দানবীর তিনিই প্রথম মিশ্র বাড়ির এই পুজো শুরু করেন এলাকায় তার দানশীলতার বহু উল্লেখ পাওয়া যায়

টেগুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি থেকে বহু মানুষকে যারা ভূমিহীন তাদের সম্পত্তি দান করা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তারই হাতে তৈরি। টেগুনিয়া ক্লাবকেও জায়গা দান তারই উত্তরাধিকারীরা করেন। এছাড়া তার কাছে কেউ অভাব অভিযোগ নিয়ে এলে খালি হাতে ফিরে যেতেন না, হাতির পিঠে চড়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন ।
মিশ্র বাড়ির পুজো শুধু একটি পরিবারের পূজো ছিল না। এলাকার সকল মানুষের পুজোর সময় আনন্দ অনুষ্ঠান মানে মিশ্র বাড়িতেই সকলের অবাধ যাতায়াত ছিল। পুজোর এই কদিন সকলে আসতেন মায়ের প্রসাদ নিতে। এই পুজোর নিয়ম-নিষ্ঠা আচার কালিকা পূরণক্ত দুর্গোৎসব পদ্ধতি মেনেই হয়। এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ চতুরাহতী হোম, সর্ব কল্যাণে এই যোগ্য সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত হয় বর্তমান ব্যাপক খরচের কারণে জৌলুস একটু কম থাকলেও সকল আচার পদ্ধতি মেনে এই পুজো নিষ্ঠার সঙ্গে হয়।
সারা বছর ধরে মন্দিরে মায়ের অধীস্থান পাথরের এই মূর্তি নিত্য অন্ন ভোগ মাকে দেওয়া হয়। বহু মানুষ আজও তাদের বিশ্বাস এবং আস্থার কেন্দ্রস্থল মিশ্র বাড়ির মা দুর্গার মন্দির। তাদের মনোস্কামনা পূর্ণ করবে পুজো নিয়ে আসেন সারা বছর ধরে পূজোর সময় সেই ভিড় আরো বেড়ে যায় এলাকার মানুষ তো বটেই দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ বংশপরম্পরায় পুজো নিয়ে আসেন। তারা এখানে এসে মন্দিরে মানসিক শান্তি পেয়ে যান। তাই মিশ্র বাড়ির পুজো আজ পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই সার্বজনীন হয়ে উঠেছে ।
স্বর্গীয় মৃত্যুঞ্জয় মিশ্রের দুই পুত্র যোগেন্দ্র নাথ মিশ্র ও নগেন্দ্রনাথ মিশ্র তারাও আজ স্বর্গত হয়েছেন। তাদের উত্তরাধিকার বর্তমান এই পুজোর দায়িত্বে আছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিভাবন মিশ্র ।তিনি জানান যে পুজোর এই কদিন আমরা মায়ের কাছে একাত্ম হয়ে উঠি।তিনি মৃন্ময়ী নন চিন্ময়ী হয়ে আমার বাড়ির উমা, আমাদের পরিবারের তিনিই কর্তী, আমাদের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় তাঁর দ্বারাই । এই পরিবারের সবচেয়ে বরিষ্ঠ সদস্য ৮৬ বছরের শক্তি কিংকর মিশ্র জানালেন আমাদের পরিবারের পরিচয়,এগিয়ে চলা সবকিছুই মা-ই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করেন, অনেক সংকটেই পরিবারের উপর এসেছে এক সময় । পিছাবনী খালের ধারে প্রায় ২৫ বিঘা জায়গা রেখে গেছিলেন। তাও বর্গা হয়ে যায়। সেখান থেকে মূলত ধান বিক্রির টাকায় পুজোর খরচ হতো। সেই জমি বর্গা হয়ে যাওয়ার পরেও পুজো কিন্তু বন্ধ হয়নি তাই সমস্ত সংকট থেকে আমাদের রক্ষা করেন আমাদের বাড়ির মা তাই আমরা একটু জীবনধারণের জায়গা পেয়ে এগিয়ে চলেছি। বর্তমান প্রজন্মের সদস্য অসীম মিশ্র জানালেন আমরা ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিবারের রীতি এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী মায়ের সঙ্গে একাত্ম। তাই কিছু করার আগে শুভ কাজ করার আগে, মায়ের অনুমতি নিতে হয়। মা ঠিকভাবে বুঝিয়ে দেন কোন কাজটা করতে হবে আর কোন কাজটা করতে হবে না তা মা আমাদের বুঝিয়ে দেন। তিনি আজ মৃন্ময়ী নন চিন্ময়ী হয়ে সকলের মাঝে মিশে আছেন , তিনি জানান পূজার প্রস্তুতিটা শুরু হয়ে যায় দুমাস তিন মাস আগে থেকেই মায়ের মহাস্নানের জন্য বৃষ্টির জল সংগ্রহ ত্রিবেণী জল সংগ্রহ বিভিন্ন নদনদীর জল সংগ্রহ মৃত্তিকা সংগ্রহ প্রত্যেককেই দায়িত্ব বিভাজন করে একদম নিষ্ঠা ভরে সমস্ত কিছু সংগ্রহ করা হয়। এবং মহাস্নান সেই মহাস্নানের জল এতটাই পবিত্র যেই জল সংগ্রহ করার জন্য বহু মানুষ আগে থেকে বলেন এবং সেই জল সংগ্রহ করতে আসেন, বহু মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী মহাস্নানের জল স্নান করার পরে শুদ্ধাচারে মাথায় নিলে সমস্ত রোগ মুক্তি ঘটে, প্রায় এই জল সংগ্রহ করার জন্য ভিড় লেগে যায়।। পুজোর এই কদিন মিশ্র বাড়ির পুজো আনন্দ উচ্ছ্বাস এবং আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে অপরূপ হয়ে ওঠে। এবং সকলের মেলবন্ধনে এক অনির্বচনীয় আনন্দের পরিবেশ নির্মাণ হয়।





