পৃথ্বীশ সেন:-কর্মাবাই নামে এক মহিলা ছিলেন পুরীতে।
নিঃসন্তান ছিলেন তিনি।
নিয়মিত যেতেন মন্দিরে।
শ্রীজগন্নাথকে দর্শন ছিল তার প্রতিদিনের কাজ।
ধীরে ধীরে পুত্রজ্ঞানে স্নেহ করতে শুরু করেন তিনি শ্রীজগন্নাথকে। দর্শনের সময় নিয়মিত বিভিন্ন রকমের ফল নিয়ে যেতেন। জগন্নাথকে নিবেদন করে ফিরতেন।
একদিন পুজো শেষ করে তিনি রান্না করছেন খিচুড়ি।
রান্না শেষে মনে হল প্রতিদিন ফল নিবেদন না করে যদি এরকম করে বানানো খিচুড়ি পরিবেশন করা যায় তাহলে মনে হয় জগন্নাথের ভালো লাগবে…
যেমন ইচ্ছে তেমনি কাজ।
মনে মনে নিবেদন করলেন খিচুড়ি ঘরে রাখা শ্রীজগন্নাথ মূর্তির সামনে। ঠিক সেই সময় একটি কালো কুচকুচে বালক প্রবেশ করল ঘরে। বলল- খুব খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দাও।
কর্মাবাই অপলক তাকিয়ে রয়েছেন সেই বালকটির দিকে। একটি আসন পেতে যন্ত্রচালিতের মত বসতে দিলেন তাকে। কি খাওয়ানো যায় এই সময়ে…
শেষে জগন্নাথকে নিবেদন করা খিচুড়ির থালাটি বাড়িয়ে দিলেন বালকটির দিকে।
আনন্দ করে খেতে বসে গেল সে।
বালকটি খেয়ে চলেছে পরমানন্দে। পাশে বসে পাখা করে চলেছেন কর্মাবাই।
গরম খিচুড়ি খেতে যাতে কোনরকম অসুবিধা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে চলেছেন তিনি।
সেই প্রসাদ খেয়ে খুবই তৃপ্ত হল সেই বালক।
বলল সে- প্রতিদিন এরকম খিচুড়ি খেতে চায়।
কর্মাবাই মাথা নাড়লেন। বালকটি এটাও বলে গেল- প্রতিদিন সে আসবে সকাল সকাল খিচুড়ি খেতে।
কর্মাবাই অপলক চেয়ে রইলেন বালকটির চলে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে। এক মোড়ের মাথায় অদৃশ্য হল বালক।
এদিকে কর্মাবাই এর সময় কাটে না।
তার খালি মনে হতে থাকে-
কখন সকাল হবে,
কখন তিনি রান্না করবেন,
কখন আসবে বালক
তিনি খেতে দেবেন। পাখা করবেন।
দু’চোখ ভরে দেখবেন। সেবা করবেন।
মহানন্দ লাভ করবেন।
পরেরদিন উঠেই কর্মাবাই সব কাজ ফেলে ধরিয়ে নিলেন উনুন। শুরু করলেন রান্না।
মনে চিন্তা তার- রান্না যেন ভালো হয় ঠাকুর। জগন্নাথ তুমি সহায় হও। তোমায় নিবেদন করব…
বালকটিকে দেব প্রসাদ। ও যেন আজ আসে অবশ্যই।
কোন দিকে তার খেয়াল নেই।
প্রার্থনা করে চলেছেন আর রান্না চলছে।
রান্না হল শেষ।
একটি থালায় রেখে নিবেদন করলেন মনে মনে শ্রীজগন্নাথের উদ্দেশ্যে।
প্রসাদ নিবেদন শেষ হতেই হাজির হল সেই বালক।
বালকটিকে দেখে যেন ধড়ে প্রান এল কর্মাবাইএর। পাতলেন আসন। বসতে বলে নিয়ে এলেন পাখা।
প্রসাদ দিলেন। বালকটি খেয়ে চলেছে।
তিনি দেখে আশ মেটাচ্ছেন।
আহা কি অপূর্ব বালক। কি অদ্ভুত মুখশ্রী।
খাওয়া শেষ। বালকটি চলে যাচ্ছিল।
আটকালেন কর্মাবাই তাকে- কাল আসবে তো?
বালকটি সম্মত হল।
এরপর থেকে এরকম করেই দিন কাটে।
কর্মাবাই এর প্রতিদিনের কাজ হচ্ছে সকালে উঠেই রান্না করা। তারপর খিচুড়ি নিবেদন জগন্নাথকে।
তারপর বালকটিকে খেতে দেওয়া।
এরপর সারাটা দিন কাটে খিচুড়ির মালমসলা জোগাড়ে। উনুনের জ্বালানি এসব সংগ্রহে।
দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে কোথা দিয়ে… বুঝতেই পারছেন না কর্মাবাই।
শুধু বালকটির উজ্জ্বল মুখটাই ভাসে চোখে।
কর্মাবাই এর তো আনন্দ ধরে না মনে।
প্রতিদিন তার ঘুম ভাঙার পরে ধ্যান জ্ঞান হল খিচুড়ি বানানো। রান্না শেষ হলেই জগন্নাথকে নিবেদন করা। বালক চলে আসে খিচুড়ি খেতে।
তার সেবা করেই তবে শান্তি তার…
এসবের ফলে দীর্ঘদিন আর তার যাওয়া হয়না মন্দিরে।
এরকম করেই চলছিল।
একদিন এলেন এক মন্দিরের পূজারী তার সাথে দেখা করতে। জিজ্ঞেস করলেন- এখন কেন মন্দিরে দেখা যায়না কর্মাবাইকে।
কথায় কথায় বললেন কর্মাবাই তার সারাদিনের কাহিনী।
শুনে সেই পূজারী বললেন- স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরে যেন তিনি রান্না করেন। তারপরেই যেন নিবেদন করেন নৈবেদ্য। যতই হোক নিবেদন করছেন ভোগ শ্রীজগন্নাথকে। শুচিতা প্রয়জনীয়।
শুনে কর্মাবাই খুবই দুঃখিত হলেন।
এতদিন ধরে তাহলে বাসি কাপড়ে রান্না করে নৈবেদ্য নিবেদন করেছেন শ্রীজগন্নাথকে।
অনুচিত হয়েছে ভেবে মনে ব্যথা পেলেন।
মনে মনে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন তিনি।
পরেরদিন তিনি সকালে উঠে স্নান করলেন।
তারপর পোশাক পরিবর্তন করে রান্নায় বসলেন।
এইসব করতে করতে হয়ে গেল বেলা, যখন তিনি নিবেদন করলেন খিচুড়ি। অবশেষে এল সেই বালক।
তার মুখ তখন শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছে।
এদিকে মন্দিরে প্রধান পুরোহিত নিবেদন করলেন প্রসাদ। কিন্তু দেখলেন নৈবেদ্য থেকে আসছে না সুগন্ধ। শ্রীজগন্নাথ তাহলে তো গ্রহন করলেন না নৈবেদ্য। -তাহলে কি হবে?
-কি অন্যায় হয়ে গেল?
ভেবে ভেবে ক্ষমাপ্রার্থনা করছেন তিনি।
অবশেষে দেখলেন শ্রীজগন্নাথের মুখে লেগে রয়েছে খিচুড়ি।
ধ্যানে বসলেন তিনি।
সব জানতে পারলেন।
ধ্যান থেকে উঠে ছুটলেন সেই পূজারীকে সঙ্গে নিয়ে কর্মাবাইএর ঘরে। সব বললেন খুলে।
খুবই চমৎকৃত হলেন কর্মাবাই।
তাহলে বালকটি শ্রীজগন্নাথ নিজেই।
আনন্দে তার দুচোখে জল গড়াল।
পূজারীদের অনুরোধে এরপর থেকে প্রতিদিন তিনি সকালে উঠে মন্দিরের রান্নাঘরে গিয়ে বানাতেন খিচুড়ি।
নিবেদন করতেন তিনি শ্রীজগন্নাথএর উদ্দেশ্যে।
আজও সকালে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি।
বালকভোগের একটি জরুরী পদ হচ্ছে এই খিচুড়ি।
.
কর্মাবাই এর পুরো নাম ভক্ত শিরোমনি কর্মাবাই।
আসলে তিনি ছিলেন জাঠ। নাগপুরে জন্ম তার।
১৬১৫ সালের ২০ জানুয়ারি।
তিনি ছিলেন আজন্ম কৃষ্ণ ভক্ত।
পরে পুরীতে তিনি আসেন।
ভগবানের জন্য খিচুড়ি সেবা করতে থাকেন তিনি বাকী জীবন।
মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
মৃত্যু হয় তার পুরীতে।
সালটা ১৬৩৪ সালে । দিনটা ২৫ জুলাই।
মন্দিরের অদূরেই হন তিনি সমাধিস্থ।
তারপর থেকে শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রার সময় রথ এসে দাঁড়িয়ে যায় তার সমাধির কাছে। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে আটকে যায় চাকা। তখন রথ নড়ানো যায় না।
একটু পরে আবার রথ চলতে থাকে।
বলা হয় শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রীজগন্নাথ তার ভক্তের দর্শন করেন।






