Select Language

[gtranslate]
১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ মঙ্গলবার ( ৩১শে মার্চ, ২০২৬ )

।। লজ্জা ।।

দেবিকা মিত্র :- বাদল বাবুর মনে শান্তি নেই। মেয়ে নন্দিনীর অকাল মৃত্যুটা উনি মেনে নিতে পারছেন না। বাদল বাবুর অসুস্থ স্ত্রী শেফালী দেবী মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। ওনাকে সামলে বাদল বাবু ওনার ছেলে সমুকে নিয়ে ছোটেন চাকদহের হাসপাতালে। ততক্ষণে ডাক্তার বলে দিয়েছেন কিশলয়কে যে, নন্দিনী আর নেই।

নন্দিনীর স্বামী কিশলয় খুব শান্ত ধীর স্থির স্বভাবের। বাদল বাবু হাসপাতালে গিয়ে দেখেন কিশলয়কে ওর কয়েক জন বন্ধু ধরে আছে। কিশলয়এর চোখ লাল। ফর্সা কান গাল লাল হয়ে আছে। চোখ দুটো ফুলে গেছে।জবা ফুলের মতো লাল টকটক করছে চোখ দুটো। সমুকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। বলে….

পারলাম না আমার নন্দুকে বাঁচাতে। কোথা থেকে কি যে হয়ে গেল বুঝতে পারছি না!!

বাদল বাবুও বুঝতে পারছেন না, কেন নন্দিনী এমন কাজ করল!! বাদল বাবু অনেক দেখাশোনা করেই কিশলয়এর সাথে নন্দিনীর বিয়ে দেন।কিশলয় ওর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ।খুব ছোট্ট সংসার ।কোনও ঝামেলা নেই।

কিশলয়ের বাবা মোহন চ্যাটার্জি রেলে চাকরি করতেন বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। কিশলয়ের মা বিজলি দেবী স্কুল শিক্ষিকা ।এখনও চাকরি করেন। নন্দিনী পড়াশোনা করত। সামনের বছর এম. এ. ফাইনাল দেওয়ার কথা ছিল । বাড়িটা খুব শান্ত থাকত। কখনোই কোনও চেঁচামেচি বা ঝগড়া শোনা যেত না। এমনকি কেউ জোরে কথা পর্যন্ত বলতো না।

নন্দিনী বিয়ের পর বাপের বাড়িতে গিয়ে বলেছিল ও খুব সুখে আছে। বর বা শ্বশুরবাড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। বাপের বাড়ি খুব একটা আসতো না। এলে ছুটির দিন কিশলয়ের সাথে আসত আবার কিশলয়ের সাথেই ফিরে যেত।যদিও বা নন্দিনীর বাপের বাড়ি খুব একটা দূরে নয়। একটা টোটো করে মিনিট পনেরোর মধ্যেই চলে আসা যেত। ওর মনে কোনও কষ্ট বা দুঃখ আছে বলে কেউ বুঝতেই পারেনি।

শ্বশুরবাড়ি থেকে দুবেলা মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলত। কলেজে যাওয়ার সময় আর কলেজ থেকে ফিরে এসে। আসলে কলেজটা ছিল একটু দূরে। বাসে করে যেতে হতো। ট্রেনে করেও যাওয়া যায় তবে নন্দিনী বাসে করেই যেতে পছন্দ করত কারণ ওর শ্বশুরবাড়ির কাছেই বাস স্ট্যান্ড। স্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠলে বসার জায়গা পায় তাই বাসে যাওয়া আসা করত।

মোহনবাবু, নন্দিনীকে বাসে বসিয়ে দিয়ে আসতেন। বিজলি দেবী স্কুল থেকে ফিরে আসতেন নন্দিনী কলেজ থেকে ফিরে আসার আগেই। উনিই বাড়িতে ফিরে রাতের রান্না করতেন। নন্দিনীকে বাড়ির কোনও কাজ করতে হতো না মানে করতে দেওয়া হতো না। বলা হয়েছিল মন দিয়ে পড়াশোনা করতে। এত ভালো শ্বশুরবাড়ি পাওয়া সত্ত্বেও নন্দিনী যে কেন এমন কাজ করল তা কেউ বুঝতে পারছে না!!

বিজলি দেবীই প্রথম নন্দিনীকে দেখেন। উনি দেখেন, নন্দিনীর মুখ দিয়ে সাদা সাদা গ্যাঁজা বের হচ্ছে। উনি চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন নন্দিনী বলে। ওনার চিৎকারে মোহন বাবু ছুটে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকা হয়। সেই সময়ে বাড়িতে কিশলয় ছিল না। অফিসে গিয়েছিল। তাকেও খবর দিয়ে ডাকা হয়।

ডাক্তার এসে বলেন…

মনে হচ্ছে বিষ জাতীয় কিছু খেয়েছে. এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যান। মোহন বাবু আর দেরী করেননি নিজেই একটা গাড়ি ডেকে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাতে নন্দিনী হার্ট এ্যাটাক করে মারা যায় ।ডাক্তার বলেন….

অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ একসাথে খেয়ে নিয়েছে তাই ঘুমের মধ্যেই মারা গেছে নন্দিনী।

এরপর পুলিশ আসে। একটা কেস হয়। নন্দিনীর দেহ ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। খবব পেয়ে বাদল বাবুরা চলে আসেন।সেদিন রাতে সবাই বাড়ি ফিরে যায় কারণ বডি পরের দিন পাওয়া যাবে তাও পেতে পেতে দুপুর হয়ে যাবে।

সবাই বাড়ি ফিরে এলেও কিশলয় কিন্তু ফিরতে চায় না। ওখানেই থাকতে চায়। ওর পাগলামো দেখে সবাই বেশ ভয় পেয়ে যায়। সেই রাতেই পুলিশ ওদের ধরে নিয়ে যায় কিন্তু বাদল বাবু লিখিত ডায়েরি করে বলেন….

ওনারা সম্পূর্ণ নির্দোষ। ওনাদের ছেড়ে দেওয়া হোক।

অনেক রাতে কিশলয়রা ছাড়া পায়।তবে পুলিশ ওদের পুরো বাড়িটা তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করে কিন্তু কিচ্ছু পায় নি । কোথা থেকে ঘুমের ওষুধ পেল তাও বুঝতে পারে না। কারণ ওর শ্বশুরবাড়িতে কেউই ঘুমের ওষুধ খায় না। একমাত্র বাদল বাবু ঘুমের ওষুধ খান কিন্তু নন্দিনী তো ওদের বাড়িতে এই সপ্তাহে যায় নি। তবে গত সপ্তাহে একদিন একা একা গিয়েছিল এবং ঘন্টা খানেক থাকার পর চলে এসেছে। তখনও ওর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়নি।

ময়না তদন্তে জানা যায় নন্দিনী তিন মাসের প্রেগনেন্ট ছিল আর অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়েই মৃত্যু হয়েছে।

কিশলয় বুঝতে পারে না নন্দিনী কি করে প্রেগনেন্ট হলো? আর যদি তাই হয় তো কে বাচ্চার বাবা? কথাটা কিশলয় কাউকেই বলতে পারেনি। ওদের দুজনের ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলতে ওর দ্বিধা হচ্ছিল।

কেটে গেল কয়েকটা দিন কিন্তু নন্দিনীর মৃত্যুর কিনারা করা গেল না। বাদল বাবুরা খুবই ভেঙে পড়েছেন। এখন দুপুরে বা রাতে দুটো করে ঘুমের ওষুধ খেতে হচ্ছে বাদল বাবুকে তাই ওষুধ তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেছে। সেদিন বাদল বাবু, সমুকে বলেন….

যা তো বাবা ওষুধের দোকান থেকে আরও কয়েকটা ওষুধ এনে রাখ।

সমু বলে প্রেশক্রিপশনটা দাও। প্রেশক্রিপশন ছাড়া ঘুমের ওষুধ দিতে চায় না।

বাদল বাবু ওনার ওষুধের কৌটো তন্ন তন্ন করে ঘেঁটেও সেই প্রেশক্রিপশনটা খুঁজে পাননি তবে সমস্ত ওষুধের তলায় যে কাগজ পেতে রাখা আছে তার তলায় প্রেশক্রিপশনটা আছে কিনা দেখতে গিয়ে একটা চিঠি পান। সেটা খুলে উনি পড়তে থাকেন। তাতে লেখা…..

বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার প্রেশক্রিপশনটা নিয়ে যাচ্ছি। এটা ছাড়া ঘুমের ওষুধ দেবে না। আমার অনেক ঘুমের দরকার। ওষুধ ছাড়া ঘুম আসবে না।

আমি অনেক কষ্টে ঘুমের ওষুধ খাব। আসলে আমি একদম ভালো নেই বাবা। লজ্জায় আমার মরে যেতে হচ্ছে। আমি যে খুব অন্যায় করেছি কিশলয়রের সাথে, ওর বাবা মায়ের সাথে। ওনারা খুব ভালো কিন্তু আমার সব কথা জানলে ওনারা
হয়তো আমাকে আর আগের মতো স্নেহ করবেন না। এমন জীবন আমি রাখতে চাই না। তাই আমি চললাম।

আসল সত্যিটা বলে না গেলে আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই পুলিশের কাছে হেনস্থা হবেন। তুমি ওনাদের রক্ষা করো বাবা।

আসল সত্যিটা হলো….

আমি মলয় দত্তগুপ্তের সন্তানের মা হতে চলেছি। ভেবে ছিলাম বাচ্চাটা নষ্ট করে দেব কিন্তু মাতৃহন্তা হতে মন চায় নি। মলয় এই বাচ্চা মেনে নিতে চাইল না। অথচ ও কথা দিয়েছিল আমার আর কিশলয়রের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করে দিয়ে আমাকে বিয়ে করবে।বিয়ের আগে থেকেই মলয়ের সাথে আমার ভাব ছিল যেটা তোমরা কেউ জানতে না। আমি পাপী বাবা। কিশলয়কে দিনের পর দিন ঠেকিয়েছি। কিশলয়কে কোনদিনই আমার ধারেকাছে আসতে দিইনি। বলেছিলাম পড়াশোনা শেষ করার পর আমি যেচে তোমার কাছে আসব। কিশলয় আমার কথা মেনে নিয়ে আমাকে কোনদিনই ছোঁয়নি।

তুমি জানতে না বাবা আমি আমার বিয়ের আগে থেকেই মলয়কে ভালোবাসতাম।আমি তোমাদের বলতে পারিনি তাতে যদি মায়ের ক্ষতি হয় তাই।মা যে খুব অসুস্থ ।তাছাড়া তোমরা মলয়কে মেনেও নিতে না

আমি প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার নাম করে বের হতাম কিন্তু প্রতিদিন কলেজে যেতাম না। মাঝে মাঝে ওর সাথে দেখা করতাম। ওর সাথে বেড়াতে যেতাম।ও, একদিন ওদের ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমার সর্বনাশ করে তবে এতে আমার প্রচ্ছন্ন মদত ছিল। আমি বাধা দিইনি ।পরে যখন জানতে পারি আমি মা হতে চলেছি তখন মলয় আমাকে অস্বীকার করে। বেশ্যা বলে অপমান করে। আমাকে এড়িয়ে চলে। এই লজ্জা আমি কি করে ঢাকবো বাবা!! তাইতো এই পথ বেছে নিলাম।

আমি খুব খারাপ মেয়ে বাবা ।আমাকে তোমরা ভুলে যেও।
তোমার নন্দু

নন্দু বলে কেঁদে ওঠেন বাদল বাবু ।মনে মনে বলেন.মরে না গিয়ে একবার তো সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারতিস রে মা!! ।সত্যি কথা বলতে লজ্জা পেতে আছে!!

Related News

Also Read