Select Language

[gtranslate]
১৬ই চৈত্র, ১৪৩২ সোমবার ( ৩০শে মার্চ, ২০২৬ )

।। রামকৃষ্ণ আর নরেন ।।

সৌমেন মিত্র :- রামকৃষ্ণের গলার ক্ষত এতগুলি ছেলেকে এক বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে। কাশীপুরের বাড়িতে সবাই এক সংসারের মানুষ। আগে এরা পরস্পরের সঙ্গে আপনি আজ্ঞে, অমুকবাবু তমুকবাবু এরকম সম্বোধন করত। এখন সবাই নাম ধরে তুই-তুকারি করে। সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিবর্তন হয়েছে লাটুর। বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামের এই ছেলেটি এসেছিল কলকাতা শহরে ভৃত্যের কাজ করতে। প্রথমে সে ছিল রাম দত্তের বাড়ির নোকর। তারপর সে রামকৃষ্ণের সেবার কাজে লেগে যায় এবং দ্রুত রূপান্তর হয় তার। ভালো করে বাংলাই শেখেনি সে, তবু সে উচ্চাঙ্গের ভাবের কথা মন দিয়ে শোনে এবং হৃদয়ঙ্গম করে।

শ্ৰীরামচন্দ্রের যেমন হনুমান, শ্ৰীরামকৃষ্ণের সেই রকম লাটু। এতদিন পর্যন্ত সে নরেন, শশী, শরৎদের সম্ভ্রমের সঙ্গে বাবু সম্বোধন করত। কিন্তু অন্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ তাকেও গেরুয়া কাপড় দেওয়ায় সে হঠাৎই একদিন এ লোরেন, এ শোরোত, এ শোশী বলে অন্তরঙ্গভাবে ডাকতে শুরু করেছে। সবাই লাটুকে এখন সমান বন্ধুর মতন দেখে।

ছেলেরা গেরুয়া পরে ভিক্ষে করতে বেরিয়েছিল, এ সংবাদ ক্রমে তাদের বাড়িতে পৌঁছে যায়। জননীদের বুক কেঁপে ওঠে। কোন মা তার সন্তানকে সংসার ছেড়ে যেতে দিতে চায় ? রামকৃষ্ণ সাধুর সেবা করার জন্য ছেলেরা কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে কাশীপুরের এসে আছে, এটুকু তবু মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু তারা গেরুয়া পরবে কেন ? স্বয়ং রামকৃষ্ণ পরমহংসই তো গেরুয়া পরেন না !

নরেন অনেকদিন বাড়িতে যান না। তাঁর মা আর থাকতে না পেরে একদিন ছ’ বছরের ছেলে ভূপেনের হাত ধরে দুটি এলেন কাশীপুরের বাগানে। রামকৃষ্ণ সকাশে বাইরের রমণীদের যাওয়া নিষেধ, কিছুদিন আগে এক পাগলী এসে উৎপাত করেছিল, রামকৃষ্ণের প্রতি মধুর ভাবে নিজেকে নিবেদন করতে চেয়েছিল বলে তাঁর আদেশে কারুকেই আর দোতলায় উঠতে দেওয়া হয় না, কিন্তু নরেনের জননীকে আটকায় কার সাধ্য !

নরেন মাকে দেখে তখুনি সামনে আসতে না চেয়ে আড়ালে লুকোল। তবু তাকে এক ঝলক দেখতে পেয়েছেন ভুবনেশ্বরী। ছেলের অঙ্গে সত্যিই গেরুয়া বসন।

বিছানার ওপর একটা বড় বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছেন রামকৃষ্ণ। মুখে ভিতু ভিতু ভাব। তামাক খেতে ইচ্ছে করছে খুব, কিন্তু গলার ব্যথার জন্য এখন হুঁকো টানা বন্ধ।

ভুবনেশ্বরী ভেতরে এসে হাত জোড় করে প্রণাম জানালেন। তারপর সরাসরি অভিযোগ করলেন, আপনি আমার ছেলেকে কেড়ে নিচ্ছেন কেন ?

রামকৃষ্ণ বললেন, ডাক্তার আমাকে কথা বলতে মানা করেছে … তুমি মা তুমি এসেছ, ভালো করেছ। বসো বসে।

ভুবনেশ্বরী অভিমান ও ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, আপনি অসুস্থ, বেশিক্ষণ থাকব না। শুধু একটা কথা জানতে চাই। নরেন আপনাকে ভক্তি করে, মানে, সে আপনার সেবা করার জন্য এখানে রয়ে গেছে, তাতে তো আমি আপত্তি করিনি। বাড়িতে যাওয়া ইদানীং সে ছেড়েই দিয়েছে। ছোট ছোট ভাইবোনরা কেমন আছে, দু বেলা খেতে পায় কিনা সে খবরও রাখে না। তবু সেসব আমি সামলাচ্ছি। কিন্তু তা বলে সে গেরুয়া ধারণ করবে ? সংসারের সে বড় ছেলে, তাকে লেখাপড়া শেখানো হয়েছে, তবু সে কোনও দায়িত্বই নেবে না ?

রামকৃষ্ণ বললেন, না গো, না, না, সে কি কথা ! এই দেখ না, আমি কি গেরুয়া পরেছি ? ও একখানা করে কাপড় বুড়ো গোপাল দিয়েছিল, আগে থেকে ছোপানো ছিল, ও কিছু না। গিরিশ টিরিশ বোধ হয় নরেনকে জোর করে গেরুয়া পরায়। ওসব ওদের খেলা।

শুধু স্তোক বাক্য শুনে আশ্বস্ত হওয়ার পাত্রী নন ভুবনেশ্বরী। আরও দু-চার কথার পর সরাসরি দাবি করলেন, আমি নরেনকে আজ বাড়ি নিয়ে যেতে চাই।

রামকৃষ্ণ ব্যস্ত ভাব দেখিয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিয়ে যাও না। আমি তো কারুকে সন্ন্যাসী হয়ে বনে-জঙ্গলে যেতে বলি না। বরং নরেনকে বলেছি, বাড়িতে তোর বিধবা মা আর ছোট ছোট ভাইয়েরা রয়েছে, তাদের দেখাশুনো করতে হবে। তোর কি সন্ন্যাসী হওয়া উচিত ? নিয়ে যাও না, আজই ওকে নিয়ে যাও।

নরেনকে ডেকে পাঠানো হল। গুরুকে প্ৰণাম জানিয়ে বাধ্য ছেলের মতন সে মা আর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ভাড়ার গাড়িতে উঠল। মাথার চুল ছোট করে ছাটা, চোখের নীচে রাত্রি জাগরণের কালি, সারা গায়ে ময়লা, বহুদিন সাবানের ছোঁওয়া লাগেনি, গেরুয়ার বদলে কার যেন একখানা ছেঁড়া ধুতি পরে এসেছে। এখন দেখে কে বলবে, এ সেই সিমলে পাড়ার ব্যায়াম-বলিষ্ঠ নরেন !

প্রথম সন্তান বড় আদরের সন্তান। তার গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে চোখের জল ফেলতে লাগলেন ভুবনেশ্বরী। ধরা গলায় বললেন, বাড়িতে খুদ-কুঁড়ো যা হোক আমি রেঁধে খাওয়াতে পারি, তা বলে তোকে ভিক্ষের অন্ন খেতে হবে ? তোর বাবা কতবড় মানী লোক ছিলেন !

নরেন বলল, আরে না না, ভিক্ষের অন্ন খাব কেন ? ও দু’একদিন শখ করে … কাশীপুরের বাড়িতে দু বেলা রান্না হয়, খিঁচুড়ি, এক একদিন লুচি … ভালো খাই। যারা খরচ দেয় তাদের সঙ্গে মাঝে বচসা হয়েছিল, মহেন্দ্র মাস্টার আবার মিটিয়ে দিয়েছেন।

ভুবনেশ্বরী বললেন, তোর গুরুদেব কী বলেছেন জানিস ? এই ভূপেন তো সঙ্গে ছিল, সব শুনেছে। উনি বললেন, নরেনকে তো সন্ন্যাসী হতে বলিনি আমি। ও বাড়িতে গিয়ে থাক না।

নরেন হা-হা করে হেসে উঠে বলল, উনি এই বলেছেন বুঝি ? জান মা, উনি চোরকে বলবেন চুরি করতে, আর গেরস্তকে বলবেন সজাগ থাকতে ! এই সব মহাপুরুষদের কথার মর্ম বোঝা সহজ নয় !

শেষ পর্যন্ত বাড়িতে গেল না। নরেন, বাগবাজারের কাছে এসে একটা বিশেষ কাজের ছুতো দেখিয়ে নেমে পড়ল।

নেমে দাঁড়িয়ে বলল, মা, তোমাকে আমি কখনও ভুলতে পারি, তুমি বিশ্বাস করো ? ভুপেন, মহিন ওদেরই বা ভুলব কী করে ? আমি যেখানেই থাকি, তোমাদের যাতে কষ্ট না হয়, তা আমি নিশ্চিত দেখব। তুমি কষ্ট পেলে পৃথিবীর কোনও সুখই আমার কাছে সুখ নয় !

রামকৃষ্ণ নানাজনের কাছে খোঁজ নেন, নরেন ফিরেছে ? নরেন ফিরেছে ?

এক সময় যখন নরেনের প্রত্যাবর্তনের সংবাদ জানলেন, তখন প্রশান্ত হাসিতে তাঁর মুখ ভরে গেল। নরেন যে নিক্ষিপ্ত তীর, সে আর পিছু ফিরতে পারে না। নরেন তর্ক করে, নরেন অবতারত্ব মানে না, এমনকি মাঝে মাঝে ঈশ্বরের অস্তিত্বেও অবিশ্বাস করে, তবু নরেনই তো এখানকার সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে।

খাগের কলম কালিতে ডুবিয়ে রামকৃষ্ণ একটা কাগজে ছবি আঁকতে লাগলেন। এখন শরীর একটু ভাল থাকলে নির্জন দুপুরবেলা তিনি মাঝে মাঝেই ছবি আঁকেন। আঁকায় বেশ হাত আছে তাঁর। ছেলেবেলায় মূর্তি গড়ে বিক্রি করতেন। এখন ছেলেবেলায় কথা মনে পড়ে খুব। আঁকতে আঁকতে থেমে গিয়ে চুপ করে চেয়ে থাকেন, যেন দেখতে পান তার বাল্যকালের গ্ৰাম্য জীবন, সেই দিগন্ত বিস্তারী মাঠ, আকাশে উড়ন্ত বকের সারি।

রামকৃষ্ণের প্রিয় ছবি, একটি পাখি। বারবার পাখি আঁকেন। আর আঁকলেন শিব ঠাকুর ও বাবা তারকনাথ। একটা হাতির মুখ। যা মনে আসে, তাই-ই আস্তে আস্তে ফুটে ওঠে ছবিতে।

নরেন যখন দেখা করতে এল, তখন তিনি ছবি আঁকার বদলে কী যেন লিখছেন আপন মনে। নরেনকে দেখে সামান্য চমকে উঠে তিনি লিখে চললেন কাঁপা কাঁপা হাতে। তারপর নীচে দু-একটি রেখায় ছবি আঁকলেন, একটি আবক্ষ মূর্তি, তার পেছনে একটি ধাবমান ময়ূর।

কাগজটি তিনি এগিয়ে দিলেন নরেনের দিকে। এতই আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষর যে নরেন লেখাটি পড়ে ঠিক বুঝতে পারল না :—

জয় রাধে প্রেমময়ী – নরেন শিক্ষে দেবে
যখন ঘুরে বাহিরে
হাঁক দিবে
জয় রাধে

রামকৃষ্ণের সর্বক্ষণের পাহারাদার নিরঞ্জন দেখি দেখি বলে কাগজটা হাত-থেকে নিয়ে বলল, বুঝেছি। উনি প্রায়ই বলেন এ কথা। লিখেছেন, জয় রাধে প্রেমময়ী ! নরেন শিক্ষে দেবে, যখন ঘুরে বাহিরে হাঁক দিবে, জয় রাধে !

রামকৃষ্ণ মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বললেন, নরেন শিক্ষে দেবে।

নরেন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না, না, আমি ওসব পারব না।

রামকৃষ্ণ বললেন, তোর ঘাড় করবে !

নরেন আবার কিছু বলতে যেতেই তিনি বললেন, আমার পশ্চাতে তোকে ফিরতেই হবে, তুই যাবি কোথায় ?

তার পরই রামকৃষ্ণর কাশি শুরু হয়ে গেল।

এর পর দুদিন অবস্থার বেশ অবনতি হল রামকৃষ্ণের। খালি কাশি, অনবরত কাশি, কিছুতেই থামানো যায় না। ঘুম নেই একটুও। শিষ্যদেরও ঘুম নেই, তারা দোতলার ঘরের ভেতরে-বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, মহেন্দ্র মাস্টারও বাড়ি ফেরেননি। সকলেরই আশঙ্কা আজই বুঝি শেষ রাত্রি।

বিছানায় শুয়ে থাকতেও পারছেন না, কখনও উঠে বসছেন, কখনও খাট থেকে নেমে দাঁড়াচ্ছেন রামকৃষ্ণ। নিরঞ্জন খুব সাবধানে ধরে থাকছে তার গুরুর দেহখানি।

এক সময় কাশির সঙ্গে রক্ত পড়তে শুরু করল। গলাগলিয়ে রক্ত, ডাবর ভরে গেল।

রামকৃষ্ণ বললেন, গামলা দে।

নরেন এসে একটা গামলা পেতে ধরল। রক্তের ধারায় সেই গামলাও ভরে যাবার উপক্রম। ওই ক্ষীণ শরীরে আর কত রক্তই বা থাকতে পারে! বেঁকে যাচ্ছে তাঁর পিঠ। কয়েকজন ভক্ত মুখ ফিরিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

একসময় রামকৃষ্ণ ককিয়ে বলে ওঠেন, মা, এত যন্ত্রণা সহ্য হয় না। জ্ঞান হারিয়ে তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন, নিরঞ্জন দু বাহু দিয়ে তাকে ধরে রইল।

সকলেই কয়েক মুহূর্তের জন্য চিত্রার্পিত।

নিরঞ্জনের বাহুডোরে সংজ্ঞাহীন রামকৃষ্ণ কাত হয়ে আছেন, নরেন গামলাটা নামিয়ে রেখে আস্তে আস্তে মুখ তুলল। নরেনের ঠোঁটের ঠিক ওপরেই এক দলা রক্ত আর পুঁজি লেগে আছে।

অনেকের ধারণা, এই মারাত্মক ব্যাধি অতি ছোঁয়াচে। কেউ কেউ খুব ভক্তিমান হয়েও এখন গুরুর খুব কাছে আসে না।

লাটু নরেনের মুখ থেকে সেই রক্ত-পুঁজি মোছার জন্য এগিয়ে দিতে গেল তার ধুতির খুঁটি। নরেন হাত তুলে আটকাল তাকে, তারপর জিভ দিয়ে সেই রক্ত চেটে নিতে লাগল।

মাস্টার অস্ফুট স্বরে বললেন, Lord’s super- Fresh blood !

.

(সংগৃহীত)

Related News

Also Read