Select Language

[gtranslate]
২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বুধবার ( ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে নিয়ে আলোচনা, বই প্রকাশ-নামাঙ্কিত স্মৃতি পুরস্কার প্রদান

 

 

        ইন্দ্রজিৎ আইচ 

বিপ্লবী রাসবিহারী বসু ছিলেন ভারতবর্ষের অন্যতম দেশনায়ক। কিন্তু তিনি চিরকাল থেকে গেছেন প্রচারের অন্তরালে। একসময়

ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেন বিপ্লবী মহানায়ক রাসবিহারী বসু। সেসময় দেশের তাবড় নেতারা ভাইসরয়ের উপদেষ্টা পরিষদে মন্ত্রী হওয়ার জন্য ব্রিটিশ শাসকদের মন জুগিয়ে আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি করতেন, ভারতবর্ষকে পুরোপুরি স্বাধীন করার ভাবনাও ছিল না। আর আরেকদল বিপ্লবী রাজকর্মচারীদের হত্যা করে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে তাড়ানোর জন্য গুপ্ত সমিতি গড়ে তোলেন। রাসবিহারী বসু কিন্তু প্রথম থেকেই ব্রিটিশ সম্রাটের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। আর এরই ফলশ্রুতি হল ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর। সাধারণ মানুষের মন থেকে ব্রিটিশ-আতঙ্ক দূর করা আর মহামহিম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যর রাজদন্ত ভাঙাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। ভারতবর্ষর রাজধানী দিল্লির রাজপথে প্রকাশ্যে রাজপ্রতিভূ ভাইসরয় চার্লস হার্ডিঞ্জকে বিশাল সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর ঘেরাটোপের মধ্যেই হাতির হাওদা থেকে চিৎপটাং করে অপদস্থ করার জন্যই বোমা ছুড়ে প্রতিবাদ জানান। শুধু তাই নয়, সিআইডি আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বাঘা বাঘা গোয়েন্দাদের বুর্বক বানিয়ে হাওয়াও হয়ে যান। এমনই ধুরন্ধর বুদ্ধি ছিল যে শেষমেষ প্রমাণের অভাবে দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলায় কাউকে গ্রেফতার করতে না পেরে সেসময় ব্রিটিশ সরকারকে মামলা তুলে নিতে হয়। সারা ভারতবর্ষর সাধারণ মানুষ সেসময় একবাকো আসলি মরদ বলে রাসবিহারীকে একমাত্র ত্রাতা হিসাবে বেছে নেন। গণআন্দোলন করে যে ভারতের স্বাধীনতা হয়নি, রাসবিহারী বসুর গড়া ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির লড়াইয়ের পর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ফৌজিদের সম্রাটের প্রতি আনুগত্যে চিড় ধরায় যে ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়, আজ গবেষণায় তা ধীরে ধীরে উঠে আসছে।

 

নেতাজীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আমির ভারতবর্ষর ময়রাঙ সাময়িকভাবে দখল হওয়ার পেছনে মূল কারিগর যে রাসবিহারী বসু তা আজ সকলে বিস্তৃত। অথচ বীজ না থাকলে যেমন মহিরুহ হয় না, তেমন রাসবিহারী বসুর সাংগঠনিক শক্তি আর ধুরন্ধর বুদ্ধিতে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ আর তার অধীন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি গড়ে না উঠলে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জার্মানিতে গড়া আজাদ হিন্দ ফৌজের দশা হত। কিন্তু স্বাধীনতার এই ভগীরথকে নিয়ে তেমন চর্চা বা গবেষণাও আজও হয়নি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল হিদেকি তোজো আর সেনাবাহিনীর ফিল্ড মার্শাল হাজিমে সুণিয়ামাকে ভারতবর্ষ স্বাধীনতায় উদ্বুদ্ধ করে তিনিই যে পূর্ণ সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন, সেই ইতিহাস আজও এদেশের আপামর মানুষ জানেন না।

 

ভাইসরয় চার্লস হার্ডিঞ্জকে রাজমুকুটসহ মাটিতে চিৎপটাং করার আগে রাসবিহারী কিন্তু ভারতবর্ষর মাটিতে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের দন্ত ঘোচানোর উদ্যোগ নেন। ১৯১১ সালে ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও রানি মেরীর ভারতবর্ষর সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী হওয়ার সাধ মেটাতে বোমা ছোড়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেসময় চন্দননগরের বোমা উঁচু দরের না হওয়ায় সেই পরিকল্পনা তাঁকে বানচাল করতে হয়। তা নাহলে ব্রিটিশ প্রশাসনের খোল নলচে সেদিনই খুলে পড়ত।

 

১৯১২ সালে দিল্লিতে ভাইসরয়ের শোভাযাত্রায় বোমা ছোড়ার পর পুলিশ প্রশাসন যখন রাসবিহারীকে গ্রেফতারের জন্য সারা দেশে হন্যে হয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন তিনি নির্ভয়ে আরো এক বড়ো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বার্মা, সিঙ্গাপুর আর সারা ভারতবর্ষর ২৬টি কেল্লা আর বারাকের ভারতীয় ফৌজিদের নিয়ে একযোগে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন। ১৯১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের দিন ঠিক হয়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ভারতীয় ফৌজিরা আচমকা ১৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহর পরই ফিল্ড মার্শাল হোরাশিও হার্বার্ট কিচেনারের নির্দেশে সব ভারতীয় ফৌজিদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

 

এরপর এদেশে থেকে আর সামরিক যুদ্ধ সম্ভব নয় বুঝে তিনি এশিয়ার সেসময়ের একমাত্র শক্তিধর রাষ্ট্র জাপানে চলে যান। কিন্তু জাপান প্রথমদিকে ভারতবর্ষর স্বাধীনতার ব্যাপারে উৎসাহী না হলেও পরে রাসবিহারীর কূট বুদ্ধিতে ব্রিটিশকে মোক্ষম আঘাত হানতে ভারতবর্ষকে বেছে নেয়। এশিয়া থেকে ব্রিটিশ সাজাজাকে উৎখাত করার জন্য পূর্ব এশিয়ার সব দেশের বাসিন্দাদের এককাট্টা করে লড়াইয়ে নামান। সেজন্য মালয়, হংকং, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ায় রাসবিহারী আজও পূর্ব এশিয়ার ত্রাতা হিসেবে পরিচিত।

 

মঙ্গলবার ২৩ ডিসেম্বর বিকেলে কলকাতা প্রেস ক্লাবে রাসবিহারী রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে রাসবিহারী বসু স্মৃতি পুরস্কার’ তুলে দেওয়া হয় শমীকস্বপন ঘোষের হাতে। সেই সঙ্গে তাঁকে দেওয়া হয়েছিলো এক লক্ষ টাকার চেক। কিন্তু শমীকস্বপন ঘোষ সেই টাকা আবার তিনি রাসবিহারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট কে দান করে দেন।মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ষীয়ান সাংবাদিক তথা কথাসাহিত্যিক ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়, বিশিষ্ট সাংবাদিক তথা কথাসাহিত্যিক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য ও কলকাতা প্রেস ক্লাবের সভাপতি স্নেহাশিস সুর ও প্রেস ক্লাবের সম্পাদক কিংশুক প্রামাণিক। মঞ্চে সকল অতিথিরা চন্দননগরের এই সংস্থা রাসবিহারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর এবং এর প্রধান কল্যাণ চক্রবর্তীর এই একক উদ্যোগ এর ভুয়সী প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে সম্মান জানানো হয় ‘রাসবিহারী’ নাটকের জন্য শোভাবাজার প্রতিবিম্ব সংস্থাকে, ‘পরাধীন ভারতে স্বাধীন বিপ্লবী’ তথ্যচিত্রর জন্য শুভাশিস ভট্টাচার্যকে, ‘অগ্নিযুগের অগ্নিশ্বর’ বইয়ের লেখক শ্যামল পালকে, ‘সূর্য যখন নিপ্পনে’ বইয়ের লেখিকা সুলগ্না চক্রবর্তীকে, রাসবিহারী বসুর জাপানি ভাষায় লেখা ‘ইন্দো নো সাকেবি’ বইয়ের বাংলায় ভাষান্তর করা ‘ভারতের আর্তনাদ’ বইয়ের লেখক অলোক বসুকে আর ‘দুই রাসবিহারী’ বইয়ের লেখক রমজান আলীকে।

পারুলবই প্রকাশিত শমীকস্বপন যোষের লেখা ‘অপরাজেয় রাসবিহারী’ শুধু এক নিছক উপন্যাস নয়। ১৮৮৫ সাল থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষর সামাজিক, ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দলিল। বাংলায় লেখা এই প্রথম এক ডকু নভেল, যেখানে কোনো কল্পিত চরিত্র বা ঘটনা পরম্পরা নেই। ভবিষ্যতে গবেষকদের কাছেও এ এক আকর গ্রন্থ হয়ে থাকবে। সমগ্র অনুষ্ঠানটির ভাবনা, পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন রাসবিহারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর অধিকর্তা কল্যাণ চক্রবর্তী।

Related News

Also Read