সোনালী ভুঁইয়া : – জানিস শশী, অবিশ্বাস করে কত গালি দিয়েছি, ভণ্ড বলেছি আমি। বলেছি গোঁফে তা দিয়ে গুরুগিরি ফলাচ্ছ? আমি বলেছি—আমি-আমি, কিন্তু কিচ্ছুটি মনে করেন নি আমার ঠাকুর। কিচ্ছুটি না। শুধু মিটিমিটি হেসেছেন। আমি পরে বুঝেছি শশী। পরে বুঝেছি অর্থ নয়, কাম নয়, যশ নয়, কিচ্ছুটি নয়। শুধু দুটো জিনিস না থাকলে শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে ঢোকা যায় না—-ভক্তি আর বিশ্বাস। আমার তো সব উজার করে দিয়েছি শশী।
উদ্যানবাটিতে দোতলার ঘরের সামনে বসে সেদিন অবিরাম অশ্রু বিসর্জন করে চলেছেন গিরিশবাবু। সান্তনা দিচ্ছেন শশী মহারাজ—-গিরিশদা, ঠাকুর তো বলেছেন আপনার বিশ্বাস ষোল আনার চেয়েও বেশি, পাঁচ সিকে পাঁচ আনা।
কিন্তু ঠাকুরের ভৈরবকে যে থামানো যাচ্ছে না! আফশোস করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ঠাকুর যে আমার কথা রাখলেন না রে শশী। আসবেন বলেও এলেন না আমার ঘরে! চলে গেলেন তাঁর নিজের জায়গায়। এসেছিলেন ছদ্মবেশে, কোন সিদ্ধাই দেখালেন না। গুরুগিরি দেখানোর জন্য সংসার ছেড়ে চলে গেলেন না বনে, নির্জন পাহাড়ের গুহায়। রোগ, শোক থেকে দূরে সরে গেলেন না তো? কেন জানিস শশী, জানিস কেন? উনি শুধু বোঝাতে চাইলেন আমি আছি, তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমি তোমাদেরই একজন। প্রেমের গান গেয়ে অকাতরে শুধু প্রেম বিলিয়ে গেলেন। শ্রীচৈতন্য জীবনীকার লিখেছেন, কৃষ্ণের যতেক লীলা, সর্বত্তম নরলীলা। প্রেমের ঠাকুর দূরারোগ্য রোগে ভুগে সেই নরলীলা সাঙ্গ করে চলে গেলেন।
অশ্রুসিক্ত নয়নে শশী মহারাজ বললেন, সবাই প্রস্তুত। নিচে আসুন গিরিশদা। সূর্যাস্তের আগেই চলুন ঠাকুরকে নিয়ে যাই তাঁর নিজের ঘরে।
তারপর কাশীপুর মহাশ্মশানের পথ ধরলেন ভক্ত অনুরাগীরা। চলার পথে গিরিশবাবুর মনে শুধু ভেসে উঠছে ঠাকুরের শ্রীমুখখানি। যেন বলছেন, এর নাম যতদিন থাকবে, ততদিন তুমিও থাকবে গা গিরিশ।
সুরেনবাবুও তখন ভারাক্রান্ত। ভাবতে লাগলেন ঠাকুরের কথা। শোন গো, মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যাও, নেশায় বুঁদ হয়ে থাকো। যা খুশি তাই করো, কিন্তু মনটি রেখো মায়ের শ্রীপাদপদ্মে।
ধন্য গিরিশবাবু, ধন্য ঠাকুরের রসদদার। শতকোটি প্রণাম জানাই শ্রীশ্রীঠাকুরের চরণে।






