শুভঙ্কর সাউ:-গভীর রাত।রাতৈরী ও অমলিক ওদের কারোর চোখে ঘুমের কোনো ইশারা নেই।চোখের ওপর আলো পড়ে চোখের কণা দিয়ে জল গড়াচ্ছে দুজনেরই।ওরা কেউ চায়না কেউ কারোর আগে ঘুমোতে।নিঃশ্বাসের প্রতি টা শব্দ গুনছিলো ওরা।আর শুনছিলো হৃৎস্পন্দন। ওরা ভাবতেও পারছেনা এভাবে কাছাকাছি শুয়ে ওরা আছে একটা রাত।পাশাপাশি দুটো বিছানায়।এমন একটা মুহুর্ত তবু ভালোবাসতে পারছেনা একে ওপরকে।কোথাও একটা সীমারেখা রয়েছে অদৃশ্যে।যাকে লঙ্ঘন করা যাবেনা।তবে কী আরও অপেক্ষা? অমলিক আলোর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাতৈরী র দিকে তাকালো,রাতৈরীও ওর দিকে চেয়ে দেখলো, তারপর নীচু গলায় অমলিক ওকে বলল-
-‘এবারতো বলো কী চাও আমার থেকে?’
রাতৈরী অমলিকের দিকে হাসি মুখ করে খাটো স্বরে বলল-
-‘চেয়েছিলাম তোমার সাথে খুব একান্তে পুরো একটা দিন কাটাতে,আজ তো সেই সৌভাগ্যটাও হয়ে গেলো আমার।আর কিছু চাইনা।’
রাতৈরীর কথা শুনে অমলিক বলল-
-‘আমি চেয়েছিলাম তোমার সাথে একদিন রাতের আকাশের নীচে বসে তারা গুনবো।আর তোমার চুলে জোনাকির ফুল গেঁথে দেবো।কিন্তু আমার ইচ্ছে তো আর পূরণ হলো না।’
অমলিকের মুখে ব্যথার গন্ধ পেয়ে রাতৈরী স্মৃতির সৌরভ দিয়ে সে গন্ধ মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। রাতৈরী বলল-
-‘আচ্ছা,তোমার আমাকে প্রথম দেখার দিনটা মনে আছে?’
অমলিকের মনে রাতৈরীকে দেখবার মুহুর্তটা জাগ্রত হলো।অমলিক যেন হঠাৎ আবেগে মিশে গিয়ে বলল-
-‘তুমি কলেজে সরস্বতী মায়ের বেদীর নীচে আলপনা দিচ্ছিলে।হলদে রঙের শাড়ি পড়েছিলে।আমি মায়ের আরাধনার সরঞ্জাম দিতে এসেছি সেইদিন কলেজে। তুমি একমনে মেঝেয় আঁকছিলে আর আমি জানতে চাইলাম (এগুলো কোথায় রাখবো) তুমি মুখ ফেরালে আর আমি তোমায় দেখেই স্টাম্পড।পুরো ক্লিন বোল্ড একেবারে।’
রাতৈরীও যেন একমুহুর্তে অমলিকের কথায় হারিয়ে গেলো।ওর গা শিরশির করে উঠলো।আবার হাসিও পেলো সেদিনের সেই অমলিককে মনে পড়াতে।কী রকম ছিলো ছেলেটা সেদিন।রোগা পাতলা, মুখেতে খাপছাড়া দাড়ি।হাসি চাপতে পারলোনা রাতৈরী। অমলিক ওকে দেখে প্রশ্ন করলো-
-‘কী হলো অমন করে নিজের মনে হাসছো কেন?’
রাতৈরী বলল-
-‘বলবোনা।’
অমলিক বলল- -‘একই রয়ে গেলে প্রথম দিন থেকে।সেদিনও আমায় দেখে হেসে ছিলে তবু কারনটা কোনোদিনও বললেনা। আর আজও তাই..।’
রাতৈরী বলল- –
‘আমাদের প্রথম ভ্যালেন্টাইনের কথা মনে আছে আর তোমার?’
অমলিক বলল-
-‘সে আবার ভোলার নাকি?বেড়াতে নিয়ে যাবো বলে আর যাইনি বলে তোমার সে কী রাগ।এক সপ্তাহ তুমি আমার সাথে কথা বলোনি।’
রাতৈরী অমলিকের কথার ওপরেই বলল-
-‘ওটাকে রাগ বলেনা।অভিমান বলে অভিমান,বুঝলে শয়তান।’
অমলিল এবার রাতৈরীর কথার ওপরে বলল-
-‘এখনও শয়তান বলবে আমায়?আমি কী শয়তানিটা করেছি বলতো আগে।’
রাতৈরী কিছুক্ষন এবার চুপ থাকলো।কী যেন ভেবে নিয়ে ফের নিজেই একটু হেসে বলল-
-‘আমি মরার সময়ও তোমায় শয়তান বলেই ডাকবো। কোনো আপত্তি আছে?’
অমলিক বলল- -‘আপত্তি দেখালে তুমি কী আর মানবে?’
রাতৈরী বলল-
-‘তা নয়।তোমার ওপর আমি সবচাইতে বেশি অভিমান করি,তাহলে বোঝো তোমার ওপর কতখানি অধিকার আছে আমার।’
এমন সময় না জানি কোথা থেকে একটা জোনাকি উড়ে এসে অমলিকের হাতের ওপরে বসলো।আর বসেই সে যেন অমলিককে বলল-
-‘আমায় তোর মনের মানুষের খোঁপার ফুল করে সাজাবিনা।’
একটা তো একটাই।অনেক প্রয়োজন নেই।শেষ ইচ্ছে যেটা ছিলো তা পূরণ হওয়ার এই এক সুযোগ এসেছে।অমলিক ওর আঙুলের ডগে করে জোনাকিটাকে ধীরে ধীরে অন্য বিছানায় শয্যারত রাতৈরীর খোলা চুলেতেই রাখলো।রাতৈরীর দুচোখ আবেগে ভরে উঠলো।হঠাৎ ই ওদের মনে হতে লাগলো ওদের চর্তুদিকে যেন অন্ধকার হয়ে এসেছে।আর সেই তুমুল অন্ধকারের মাঝে একগুচ্ছ আলোর বিচ্ছুরণ।আশেপাশের কিছুই ওরা চিনতে পারছে না শুধু নিজেদের ছাড়া।অমলিক তখন একবার হাঁপিয়ে উঠে বলল-
-‘তুমিও কী অন্ধকার দেখিছো?’
রাতৈরী হাসি মুখে একবার অমলিকের দিকে তাকিয়ে অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।সাথে সাথে অমলিকও যেন ইচ্ছে পূরণের সময়টা এ পৃথিবীতে লিখে রেখে দেহ ছেড়ে বিদায় নিলো তার রাতৈরীর পথ ধরে।
কিছুক্ষন পর দুজনের বাড়ির লোকজনকে মৃতদেহ তুলে দেওয়া হলো।এক্সিডেন্টের পর ওদের এতক্ষন আয়ু ছিলোনা হয়তো।বোধহয় কোথাও একবার শেষ দেখাটুকু হওয়ার ছিলো ওদের।এবার থেকে ওদের দেখা হবে অন্য পৃথিবীতে।অন্য শরীরে।
অন্য চেতনার রঙে।যা আমরা কেউ জানবোনা।






