দিলীপ ঘোষ :- এই বছর ধনতেরাস পড়েছে ২২শে এবং ২৩শে অক্টোবর। ধনতেরাসকে ধন-ত্রয়োদশীয় বলা হয়। এই দিন লক্ষ্মী ও কুবের পূজিত হন। অনেক ক্ষেত্রে ধন্বন্তরি দেব পূজিত হয়।
বছর পনেরো-কুড়ি আগেও সেইভাবে আমাদের এখানে এই উৎসবের এতো বাড় বাড়ন্ত ছিল না। তবে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে ব্যবসার সুচতুর মিশ্রণে অন্যান্য সম্প্রদায়ের বহু উৎসব ও অনুষ্ঠান পালনে আমরা ক্রমশ আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি।
পাঁচদিন ব্যাপী দীপাবলি উৎসবের প্রথম দিন হল ধনতেরাস। ধন মানে সম্পদ আর তেরাস হল ত্রয়োদশী অর্থাৎ কার্তিক মাসের কৃষ্ণ পক্ষের তেরোতম দিন।
ক) পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ধনতেরাসের ইতিহাস—- আমরা দেখব প্রাচীনকালে রাজা ‘হিম’ এর পুত্র এই ভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে আসেন যে বিয়ের চতুর্থ দিন রাতে সাপের কামড়ে ওনার মৃত্যু হবে।
তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে নিজের যাবতীয় সোনা রূপোর গয়না স্তূপকারে জড়ো করে রাখেন স্বামীর শোওয়ার ঘরের দরজায় ও সমস্ত ঘর প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে দেন সাপের পথ আটকাতে। এরপর তিনি সারারাত গল্প বলে গান গেয়ে স্বামীকে জাগিয়ে রাখেন।
যখন যম সাপের বেশে সেই রাজপুত্রের ঘরে প্রবেশ করতে যান তার চোখ ধাঁধিয়ে যায় অলংকার ও প্রদীপের উজ্জ্বলতায়। প্রবেশে বাধা পেয়ে যম ওই সোনার স্তূপের ওপর উঠে অন্যপথে প্রবেশ করতে যান কিন্তু রাজরানীর গল্পে ক্রমশ আকৃষ্ট হয়ে সারারাত সেখানেই কাটিয়ে পরদিন ভোরে নিঃশব্দে ফিরে যান।
যেহেতু সোনার অলংকার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রাজকুমার কে বাঁচায়, তাই এইদিন ধন অর্থাৎ সম্পদের আরাধনা করা হয়। এই কারনে এইদিন সোনা কেনার বিশেষ চল দেশ জুড়ে দেখা যায়।
খ) আবার ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী ধনতেরাস ইতিহাস—–
একসময় দুর্বাশা মুনির অভিশাপে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন লক্ষ্মী। ইন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে মহর্ষি দুর্বাসা তিন লোককে শ্রীহীন হওয়ার অভিশাপ দেন। এর ফলে পৃথিবী থেকে নিজের লোকে গমন করেন মালক্ষ্মী।
জগৎ সংসারে “শ্রী” প্রতিষ্ঠার জন্য সমুদ্র মন্থনের পরামর্শ দেন শিব এবং এই দিনে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার জনক ধন্বন্তরী দেব সমুদ্র মন্থন থেকে হাতে কলস নিয়ে আবির্ভূত হন আর সেই কলসে থাকে ধন, সম্পদ অর্থ ও বিভিন্ন মূল্যবান রত্ন। এছাড়া অনেকের মতে এই কলসে থাকে অমৃত আর তা বিভিন্ন মূল্যবান ধন সম্পদের বিনিময়ে সংগ্রহ করতে হয় ভগবান কুবের এর কাছ থেকে।

রাক্ষসদের সঙ্গে লড়াই করে ধনতেরাসেই দেবতারা ফিরে পান দেবী লক্ষ্মীকে। হারিয়ে যাওয়া লক্ষ্মীকে ফেরানোর উৎসবই হচ্ছে ধনতেরাস। তবে লক্ষ্মীর ধন সম্পদের সঙ্গে এই যোগ খুব যে বেশি দিনের তা নয়।
তিনি নারায়ণের স্ত্রী। সমুদ্র মন্থন থেকে তার জন্ম- কোথাও তার চঞ্চলতার কথাও বলা নেই।
বরঞ্চ লক্ষ্মী নামের মধ্যে দিয়েই এক স্বভাবকোমলা নারীর রূপ আমরা দেখতে পাই, যে কিনা বেশি শব্দ সহ্য করতে পারেনা, স্বভাবে স্থির,স্নিগ্ধ আভিজাত্য পূর্ণ এক নারী। সেই নারীর মধ্যে বিষয় আশয় সম্পর্কে এমন মোহের ধর্মীয় ব্যাখ্যা কোথাও পাওয়া যায় না, যাতে তাকে কোনক্রমে সোনাদানা কিনে ঘরে রাখার ব্যবস্থা করতে হয়।
যেদিন থেকে লক্ষ্মীকে আমরা ধন সম্পত্তির সঙ্গে জুড়ে দিলাম সেইদিন থেকে তার চরিত্রেও নীরবে যোগ হয়ে গেল চঞ্চল প্রবৃত্তিটি। কোজাগরী লক্ষ্মী থেকে একেবারে দীপান্বিতা অমাবস্যা অবধি শুরু হল লক্ষ্মীর আরাধনা।।






