রিমিতা কর :-জুনিয়র ডাক্তারের মুখে ডক্টর স্নেহাশীষ সেনগুপ্তর নামটা শুনে নন্দিনী গোটা শরীর কেঁপে উঠল। পায়ের তলার মাটি যেন দুলে উঠল। মনে হল এখনই সে পড়ে যাবে। সোফার হাতলটা চেপে কোনমতে সোফায় বসে পড়ল। একজন নার্স এগিয়ে এল।
–ম্যাডাম ডক্টর সেনগুপ্ত রাউন্ডে রয়েছেন। আপনাকে এখানে ওয়েট করতে বলেছেন।
নন্দিনীর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মাথা কাজ করছে না। গত কয়েক ঘন্টা নন্দিনীর ছেলেকে নিয়ে প্রচন্ড টেনশন ছিল। কিছুক্ষণ আগে জুনিয়র ডাক্তারের আশ্বাসে সেটা অবশ্য অনেকটা কমেছে। কিন্তু এখন?
ঠিক এইসময় এক আশ্চর্য কাকতালীয় ঘটনা ঘটে গেল। আসলে ওপরে থাকা ওই একজনের ইচ্ছেতেই সবকিছু ঘটে। আমরা নিমিত্ত মাত্র।
আজ এই মুহূর্তে প্রায় আঠেরো বছর পর আমার সাথে নন্দিনীর চোখাচোখি হল হাসপাতালের লাউঞ্জে। আমার শাশুড়ি মা হাসপাতালে ভর্তি। তাঁকে দেখতেই আমার এখানে আসা।
যে নন্দিনীকে আমি এতগুলো বছর ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছি। বারবার ওর বাড়ি গেছি। কাকুতি মিনতি করে জানতে চেয়েছি ওর ফোন নম্বর। কিন্তু পাইনি। সেই নন্দিনী, আমার মেয়েবেলার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখলাম ওর চেহারার বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। কেবল খানিকটা মেদ জমেছে শরীরে।
যাইহোক ভেবেছিলাম নন্দিনী আমাকে দেখে এড়িয়ে যাবে। যেমনটা এতবছর করে এসেছে। কিন্তু না আজ করল না। বরং দ্রুত পায়ে উদ্বিগ্ন মুখে এগিয়ে এল আমার দিকে। কিভাবে কি বলে কথা শুরু করব ভাবছি। অভিমানের স্তুপ জমে আছে আমার বুকের ভেতর। ও নিজেই শুরু করল।
–পারো তুই এখানে?
নন্দিনীর কথাতে হাসি পেল। যেন আমার এখানে আসতে নেই। ও যেহেতু এখানে আছে তাই হয়তো।
মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বললাম,
–কেন আসতে নেই?
হঠাৎই আমার হাত দুটো ধরে টানতে টানতে নন্দিনী আমাকে একটু ফাঁকাতে নিয়ে এল। তারপর কান্নামাখা স্বরে আমার হাতদুটো ওর বুকের কাছে ধরে একরকম ভেঙে পড়ল।
–পারো বড় বিপদে পড়েছি। ভগবান তোকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। হাতে একদম সময় নেই। তোকে সৌভাগ্যর মা সাজতে হবে।
নন্দিনীর ব্যাপারস্যাপার দেখে আমি থ। শুধু বললাম,
–সৌভাগ্য কে?
–আমার ছেলে। সতেরো বছরের। স্কুলে ফুটবল খেলতে গিয়ে লিগামেন্ট ছিঁড়েছে। আজ সকালে এখানে ভর্তি করেছি। এখনি ডাক্তার কল করবে। তুই শুধু মায়ের পরিচয় দিয়ে কি বলছে শুনে নে। অপারেশনের কথা বললে বলিস পরশুদিন হলে ভালো হয়। ওর বাবা আজ আসছে। কাল ডক্টরের সাথে কথা বলবে।
–কিন্তু আমি মা কেন সাজব?
মাথা নীচু করে নিল নন্দিনী। খুব ধীরে বলল।
–এই সেই ডক্টর স্নেহাশীষ সেনগুপ্ত। মনে আছে তোর? অর্থোপেডিক সার্জন।
আমি নন্দিনীর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। কালের গহ্বর থেকে উঠে আসছে একটা অস্থির সময়। মনে পড়ছে নন্দিনীর দুর্নিবার স্রোতে ভেসে যাওয়ার দিনগুলো।
কলেজে তখন সেকেন্ড ইয়ার। আমরা দুজনেই ইকোনমিক্স অনার্স। মধুসূদন মঞ্চে কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান চলছে। হোরিখেলা মঞ্চস্থ হচ্ছে। কেশর খাঁর চরিত্রে নন্দিনী। ওর নাচে মুগ্ধ দর্শকদের হাততালির ঝড় উঠছে। এদিকে উল্লাসিত নন্দিনী নাচের শেষে ব্যাকস্টেজে হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে অন্ধকারে কঁকিয়ে উঠল।
সাথে সাথে নন্দিনীকে সামনের নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হল। এক্স রে তে ধরা পড়ল গোড়ালিতে চিড়। সেই রাতে নার্সিং হোমে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। মনে আছে নন্দিনী খুব ভয় পেয়েছিল। কিছুতেই একা থাকতে চাইছিল না। ওর বাবা মাও খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।
ঠিক সেই সময়ে এক অতি সুদর্শন সৌম্যকান্তি মাঝবয়সী চিকিত্সক এগিয়ে এলেন।
নন্দিনীর বাবা মাকে বললেন,
–আপনারা নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। আমরা আছি।
ডাক্তারের কথাবার্তায় চেহারার জ্যোতিতে সবাই যেন আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। খেয়াল করলাম নন্দিনী যন্ত্রণা ভুলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। কি যেন জাদু ছিল মানুষটার মধ্যে। মুহূর্তে নার্সিং হোমে থাকতে রাজি হয়ে গিয়েছিল নন্দিনী।
সেই শুরু। অদৃষ্ট যে কোথায় কাকে নিয়ে ফেলে কেউ বলতে পারে না। সব যেন পূর্ব নির্ধারিত। কেবল আমরা আগে থেকে জানতে পারি না।
পরদিন বিকেলে নন্দিনীকে দেখতে গেলাম। ডানপায়ে মোটা প্লাস্টার। কিন্তু আশ্চর্য হলাম ওর চোখমুখে খুশির আভা দেখে। বললাম,
–নার্সিংহোমে কেমন লাগছে রে? কবে ডিসচার্জ বলছে?
নন্দিনীর মুখে মৃদু হাসি। শরীর এলিয়ে আড়মোড়া ভাঙল।
–ধুস আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না। মনেহচ্ছে এখানেই থেকে যাই।
প্রচন্ড অবাক হলাম।
–কেন?
নন্দিনী এদিকে ওদিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল।
–তোকে সব বলব। এখানে নয়। বাড়ি ফিরে বলব।
যাইহোক এর মাসখানেকের মধ্যে আমাদের পার্ট ওয়ান পরীক্ষা ছিল। গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। নন্দিনীর সাথে বিশেষ কথা বলার সময় হয়নি।
হঠাৎ কলেজ খোলার দুতিন দিন আগে রাতে নন্দিনীর ফোন এল।
— পারো খুব পড়াশোনা করছিস? আমার না কিছুই হয়নি। ভাবছি ড্রপ দেব।
নন্দিনী পড়াশোনায় যথেষ্ট সিরিয়াস। রেজাল্ট বরাবরই ভীষণ ভালো। ওর দুচোখে অনেক স্বপ্ন। আগে কখনো এমন কথা শুনিনি। অবাক হয়ে বললাম,
–কেন এমন বলছিস?
–সত্যিরে এই একমাস একদম পড়াশোনায় মন বসছে না। আচ্ছা শোন কাল যদি আমার মা তোকে ফোন করে বলিস আমি তোর সাথেই আছি। গ্রুপ স্টাডি করছি।
–মানে? কোথায় যাবি?
–পারো প্লিজ রাগ করিস না। তোকে অনেক কথা বলা হয়নি। আমার সাথে একজনের রিলেশন হয়েছে।
–কার?
–একজন ডক্টরের। হয়ত নাম শুনে থাকবি।
–কে?
–ডক্টর স্নেহাশীষ সেনগুপ্ত। অর্থোপেডিক। আমার পায়ের চোটের চিকিৎসা করেছিল।
আমার চোখে মুহূর্তে ভেসে উঠল এক অনিন্দ্যসুন্দর মাঝবয়সী চিকিতৎসক। অজান্তেই বলে ফেললাম,
— কিন্তু উনিতো বয়সে অনেক বড়। তোর সাথে কিভাবে?
–পারো ওনাকে প্রথমবার দেখেই আমি পাগল হয়ে গেছিরে। জাস্ট ভাবতে পারবি না আমার সমস্ত পৃথিবীটা যেন ওই একজন মানুষে এসে মিশেছে। লভ এট ফার্স্ট সাইট। এমনটা সত্যি হয় ভাবতে পারিনি। ফোনে কথা বলেছি। কাল প্রথমবার দুজনে দেখা করব।
বয়স আন্দাজে চিন্তার গভীরতা বা দূরদর্শিতা আমার বরাবরই একটু বেশি। নন্দিনীর কথাতে মন সায় দিল না। একটা কুড়ি বছরের মেয়েকে প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই ডাক্তারের দুম করে ভালো লেগে গেল? তাঁর জীবনে কি কেউ নেই? নন্দিনী কোন বিপদে পড়বে না তো? গম্ভীর গলায় বললাম।
— প্রপোজ করেছে তোকে?
–নাহ্ সেসব কথা এখনও হয়নি। আমি ওকে না দেখে থাকতে পারছিলাম না। তাই একটা অজুহাতে চেম্বারে গিয়েছিলাম। তখন বলল কাল কফিসপে দেখা করবে। আমার যে কি ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তোকে বোঝাতে পারব না। পারো আমি ভীষণ ভীষণ ভীষণ খুশি।
–উনি কি ম্যারেড?
–ডিভোর্সি। এক ছেলে আছে। খুব স্যাড স্টোরি।
আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। মেলাতে পারছি না নন্দিনীকে। কলেজে যে কিনা কোন ছেলেকে পাত্তা দেয় না। সে আজ কিভাবে এমন কান্ড করে বসল? সেদিন বুঝিনি আজ বুঝি ওই বয়সটাই এমন ছিল। মেঘ ভাঙা বৃষ্টির মতো জীবনে হঠাৎই ধস নামিয়ে দেয়। আবেগের প্রখর স্রোতে নন্দিনী ভেসে গিয়েছিল এক মর্মান্তিক পরিনতির দিকে।
নন্দিনীর হাতের মৃদু চাপে আমার সম্বিত ফিরল।
–প্লিজ আজ আমায় বাঁচা পারো। তোর সাথে দেখা না হলে এই মুহূর্তে কি করতাম জানি না। আমার স্বামী দিল্লিতে পোস্টিং। আমি ছেলেকে নিয়ে তিন বছর কলকাতায় শ্বশুরবাড়িতে রয়েছি। সৌমাল্য আজই চলে আসছে। কাল ডাক্তারের সাথে কথা বলবে। ও কিচ্ছু জানে না। কিন্তু আমায় দেখলে ওই শয়তানটা যদি ছেলের কোন ক্ষতি করে দেয়? অথবা যদি সৌমাল্যকে সবকিছু বলে দেয়?
নন্দিনীর এই অসহায় পরিস্থিতিতে আমার ওর ওপর মায়া হওয়া উচিত। কিন্তু সত্যি বলছি হচ্ছে না। ওর সমবয়সী হয়েও আমি ওকে প্রতি পদক্ষেপে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু নন্দিনী সেদিন আমার কোন কথা শোনেনি। এক অদ্ভুত মরীচিকার পেছনে ছুটে চলে নিজের পড়াশোনা কেরিয়ার জলাঞ্জলি দিয়েছিল।
স্নেহাশীষ সেনগুপ্ত যে একটা দিনের জন্য ওকে ভালোবাসেনি নিছকই অভিনয় করে গেছে সেটা নন্দিনী বুঝেছিল অনেক পরে। এরমধ্যে বহু অশান্তির ঝড় বয়ে গিয়েছিল। নন্দিনীদের ছিমছাম সংসারটা তছনছ হয়ে গিয়েছিল।
–পারো প্লিজ চল। ডাক্তার এসে যাবে। আমি এই দূরে এখানে থাকছি।
আমি দেখলাম এই সুযোগ। আমার বহুদিনের একটা রহস্য আজ সমাধান করতেই হবে। জানি উপযুক্ত সময় নয়। কিন্তু পরে যদি নন্দিনীর সাথে আর কখনো দেখা না হয়। মন শক্ত করলাম।
–নন্দিনী আমার একটা শর্ত আছে। আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর তোকে আজ দিতে হবে।
নন্দিনীর মুখ ফ্যাকাশে।
–কি বল?
–তুই হঠাৎ ডাক্তারকে ছেড়ে গোপনে একমাসের মধ্যে অন্য একজনকে বিয়ে করলি কেন? আমাদের কাছ থেকে চিরতরে পালিয়ে বা গেলি কেন?
নন্দিনীর মাথা নীচু। দুগালে গড়িয়ে পড়ছে জল। ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপছে। কাঁপা গলায় বলল,
–স্নেহাশীষ একটা মিথ্যেবাদী দুশ্চরিত্র। ওর ডিভোর্স হয়নি। বউ ছেলে সঙ্গেই থাকত। আমাকে যেদিন ওর বাগান বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন ওর স্ত্রী সেখানে পৌঁছে সব সত্যি ফাঁস করে দিয়েছিল। কিন্তু আমার চরম সর্বনাশ তার আগেই হয়ে গিয়েছে।
চমকে উঠে বললাম,
–মানে?
নন্দিনী মাথা নীচু করে নেয়। ধরা গলায় খুব ধীরে ধীরে বলল,
–সৌভাগ্য স্নেহাশীষের সন্তান। সৌমাল্য মানে আমার স্বামী আজও সত্যিটা জানে না। সৌমাল্য আমার বাবার বন্ধুর ছেলে। আমাকে আগেই ওদের পছন্দ ছিল। সেইসময় সৌমাল্য কানাডাতে নতুন কোম্পানি জয়েন করছে। বিয়ে না দিয়ে ওর বাবা মা ওকে পাঠাতে রাজি হচ্ছিল না। তাই বাবার অনুরোধ ওরা লুফে নিয়েছিল। তড়িঘড়ি একমাসের মধ্যে বিয়েটা বিনা আড়ম্বরে দিতে ওরা রাজি হয়েছিল।
আমি তখন অসহায়। সবকিছু পেছনে ফেলে সবাইকে ভুলে বিয়ের সাতদিনের মধ্যে প্লেনে উঠেছিলাম। পুরনো কারোর সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে চাইনি। কেবল অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হয়েছি দাউ দাউ করে। টানা পাঁচ বছর দেশে আসিনি।
সৌভাগ্য মল্লিকের বাড়ির লোক চেম্বারে আসুন। ডক্টর সেনগুপ্ত কথা বলবেন।

মাইকের ঘোষনায় আমি আর নন্দিনী সজাগ হলাম। নন্দিনীর প্রতি আমার এতদিনের জমানো অভিমান নিমেষে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। বড় মায়া হল। মনে হল নন্দিনীর ভালবাসায়তো কোন খাদ ছিল না। কিন্তু কি লাভ হল? একটা গভীর কালো দাগ কেবল লেগে রইল জীবনজুড়ে। ওর চোখের জল মুছিয়ে আশ্বাস দিলাম।
–চিন্তা করিস না। আমি যাচ্ছি। ডক্টর কি বলল এসে বলছি।
নন্দিনী পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি এগিয়ে চললাম সৌভাগ্যর মা সেজে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে।
আমার দুচোখ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সৌজন্যে প্রতিলিপি






