অমিত রায় :-মৃত্যুর খুব কাছ থেকে বছর চব্বিশ এর সোনালি প্রায় তিন তিন বার ফিরে এসেছে। এই ভয়ঙ্কর সময়ে প্রতিটা মুহুর্তে সোনালির পাশে যে মানুষটি ছায়ার মতো তাকে ধরে ছিলো সে তার স্বামী মনোজ। তাই আজ সোনালি আর মনোজের ভালোবাসাকে নিয়ে ছোট্ট নিবেদন।
বছর খানেক আগে প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সোনালির দুর্বিষহ জীবনের এক সুত্রপাত হয়। কলকাতার এক প্রাইভেট হসপিটালে সোনালির সিজার হয়। ঘর আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে একটি পুত্র সন্তান। কিন্তু সব খুশির আমেজ যে মুহুর্তের মাঝেই বিলীন হয়ে যায় সোনালির। কারন সিজার করে অপারেশনের দুই দিন পর হঠাৎ করে সোনালির পেট ফুলতে শুরু করে। হসপিটালের কতৃপক্ষ নিজেদের গা বাঁচাতে দ্রুত সোনালিকে অন্য হসপিটালের পথ দেখিয়ে দেয়। প্রথম অপারেশনের মাত্র চার দিনের মধ্যে হসপিটালে দ্বিতীয়বার সার্জনের ছুরি কাঁচির নীচে যেতে হয় সোনালিকে। পেট কেটে দেখা যায় তার পুরো পেট জুড়ে পটি ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ মানব শরীরের ক্ষুদ্রান্ত্রের মাঝে অনেক জায়গায় সোনালির ছিদ্র খুঁজে পাওয়া যায়। সার্জনেরা খুঁজে পায় বহু ছিদ্র আর সেগুলো তারা পুনরায় মেরামত করেন। তারা ধারনা করেন সিজারের সময় এই ইনজুরি গুলো সোনালির হয়। ওদিকে মনোজ ভাবে সোনালির এবার অপারেশন ভালো হবে আর সুস্থ হয়ে যাবে। কারন বাড়ীতে মনোজ ও সোনালির সম্বল তাদের ছোট দুধের শিশুটি আছে…
কলকাতার হসপিটালে দ্বিতীয়বার অপারেশন হওয়ার পরেও সোনালির অবস্থার উন্নতি হয়না। ড্রেইন টিউব দিয়ে যে সোনালির এখনও পটি বের হচ্ছে। চিকিৎসকরা তখন জরুরী ভিত্তিতে সোনালিকে রেফার করলেন দিল্লির মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দিল্লি মেডিকেল কলেজে ইমারজেন্সী OT তে তৃতীয়বারের মত সোনালির অপারেশন শুরু হয়। পেট কেটে দেখা গেলো Huge Gut Adhesion। কোনটা Small Gut কোনটা Large Gut কিছুই আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিলো না। এই অবস্থা হওয়ায় বেশী ঘাটাঘাটি করলে আরো ইনজুরি হওয়ার সম্ভবনা হবে। তাই সার্জনেরা সোনালির শরীরের সবচেয়ে প্রধান অংশটি পেটের মধ্য দিয়ে পায়খানার রাস্তা বের করে দিলো। আপাতত এভাবে সোনালির পেটের ভিতর পটি যাতে জমা না থাকে তার প্রাথমিক একটা সমাধান করা গেলো। এই অপারেশনের পর সোনালি প্রায় দীর্ঘ এক মাস ধরে হসপিটালে ভর্তি ছিলো। এরপর আবার সোনালির পেটের ভিতরে অপারেশনের ক্ষত স্হানে অনেক বার ইনফেকশন হয়। যার ফলশ্রুতিতে নাড়িগুলো পেট ফেটে বের হবার উপক্রমও হয়। এরপর আধুনিক যন্ত্র দিয়ে পেট কাটার চিকিৎসা করা হলো। এতোগুলো অপারেশনের চাপ আর শরীর থেকে বেশি পরিমান তরল বের হয়ে যাওয়ার কারনে সোনালির স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। আর ক্ষত গুলো শুকাতে দেরী হয়। শিরাগুলোতে স্যালাইন আর বিভিন্ন পুস্টিকর উপাদান দিয়ে সোনালির স্বাস্থ্যর উন্নতির চেষ্টা চলে। এই সব অতিরিক্ত খরচ মেটাতে মনোজের প্রায় নাভিঃশ্বাস উঠে যায়। কিন্তু স্ত্রী সোনালির চিকিৎসা করাতে সুজয় কখনও কার্পন্য করেনি। একমাস হসপিটালে থাকার পর সোনালিকে বাড়ী যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও কিন্তু তিন মাস পর সোনালিকে ডাক্তার পুনরায় আসতে বলে কারন সোনালিকে আবার অপারেশনের মধ্য দিয়ে সোনালির পটির রাস্তাটি আবার পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া হবে বলে ডাক্তাররা আশ্বাস দেন। যার ফলে সোনালি আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে আর মা হয়ে সন্তান লালন করবে …
দীর্ঘ তিন মাস পর মনোজ স্ত্রী সোনালিকে নিয়ে হসপিটালের আলাদা একটি ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। সোনালির মুখে হাসি একটু ফিরে এসেছে। এখন সেই হাসি শুধু পুর্নতা পাবার অপেক্ষায়। এরপর নতুন করে আবার অপারেশন হলো। সোনালির শরীরে পটির রাস্তা পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া হলো। অপারেশন স্বাভাবিক নিয়মে সফল হলো আর ভালো হলো। আর সোনালি তখন প্রায় মনে থেকে সম্পুর্ন সুস্থ্য হওয়ার পথে…
এতক্ষন সোনালিকে নিয়ে অনেক কিছু বললাম। এবার না হয় একটু স্বামী মনোজের কথায় আসা যাক। আসলে মনোজ ছিলো পেশায় একজন ফেরিওয়ালা। সোনালির সাথে তিন বছর হতে চললো মনোজের বিয়ে হয়েছে। মনোজ নিজে কলকাতা থেকে লুঙ্গি কিনে বিভিন্ন জায়গায় ফেরি করে বিক্রি করে। মনোজ লুঙ্গি অন্যদের তুলনায় একটু সাশ্রয়ী মূল্য বিক্রি করে যার জন্য তার লুঙ্গির বিক্রি বেশ ভালো হয়। গত প্রায় এক বছর যাবত স্ত্রী সোনালির এমন অসুস্থতার জন্য তার ব্যবসা তেমন ভালো চলছিলোনা। তারপরও মনোজ স্ত্রী সোনালিকে সুস্থ করবার জন্য হাল ছাড়েনি। ঔষধ কেনা থেকে শুরু করে প্রতিটা সময় স্ত্রী সোনালির পাশে আঠার মতো লেগে থাকতো। স্ত্রীকে খাওয়ানো, শরীরে কখন কি হয় তার খেয়াল রাখা থেকে শুরু করে ঘন্টায় ঘন্টায় সোনালির প্রস্রাব পরিস্কার করা, বিছানাতে পটি পরিস্কার করা ছিলো মনোজের দৈনন্দিন কাজ। সোনালির বিছানার নীচে বহু গুটি তেলাপোকার অত্যাচার আর প্রচন্ড মশার কামড় খেয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হতো মনোজকে। সোনালির ঘুমের মাঝে কোন নড়াচড়ার শব্দ পেলে মনোজ ঘুম ভেঙ্গে লাফিয়ে উঠতো। সোনালির যখন পেটে ব্যাথা হতো তখন কান্না করলে না থামলে মাথায় হাত বুলিয়ে মনোজ সোনালিকে সান্ত্বনা দিতো। আবার ডাক্তার আসলে মনোজ লজ্জা পেয়ে হাত সরিয়ে নিতো। ধীরে ধীরে সোনালি সুস্থ হলে তারা দুজনে বাড়ি চলে যায়…
এরপর বাড়ি গিয়ে হঠাৎ সোনালির Stool Bag (পটির জমা ব্যাগ) খুলে যায়। মনোজ ছিলো তখন কাজের কারনে কলকাতার বাইরে। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়ী এসে সোনালিকে নিয়ে মনোজ আবার কলকাতার হসপিটালে যায় শুধুমাত্র Stool Bag টিকে পুনরায় লাগানোর জন্য। এরপর নিজের কাঁধে একটা আস্ত বস্তা ঝুলিয়ে হসপিটালের ওয়ার্ডে যায় মনোজ। বস্তাটি খুললে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কিছু সবজী, চাউল, মুড়ি, গুড়, চিড়া ও কিছু মিস্টি সামগ্রী। আসলে মনোজ এতো দুর থেকে এগুলো ডাক্তারদের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে। অথচ তখনও পর্যন্ত তার সোনালি যে সম্পুর্নভাবে সুস্থ হয়নি। এতো কিছু আনার জন্য ডাক্তাররা মনোজকে কড়া করে একটু বকা দিলেন। ডাক্তারদের বকা শুনে মনোজ লজ্জা পায় আর চলে যাওয়ার সময় ডাক্তারকে বলে স্যার এখন আমার বউ অনেক ভালো আছে। আর আমার বাচ্চাটাকে আপনারা যে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার জন্য আমি চিরঋনী। জানেন স্যার আমার বাড়ির সকলে ভেবেছিলো যে সোনালি মারা যাবে, আর সেখান থেকে আপনারা আমার সোনালিকে ফিরিয়ে এনেছেন তার জন্য আমি সত্যি কৃতজ্ঞ। আমার ছেলেটা যে এতিম হলোনা সেটাও যে আপনাদের জন্য তাই আপনারা আমার কাছে ঈশ্বরের রুপ। সোনালি আর আমাকে আপনি নতুন জীবন দিয়েছেন। আমরা সকলে আবার আলোর মুখ দেখতে পেলাম। মনোজ বলে আমি গরীব মানুষ তাই খুব ইচ্ছে করে আপনাদের জন্য অনেক কিছু করি। কিন্তু ঈশ্বর সেই ক্ষমতা যে আমাকে দেয়নি তাই আমার সাধ্য মতো কিছু জিনিস আপনাদের জন্য এনেছি। ডাক্তাররা এরপরে বলে আমরাও সবাই তোমার সোনালির আর তোমার এমন ভালোবাসার প্রশংসা না করে থাকতে পারলাম না। তাই তোমাদের আগামী দিনগুলি আরও সুখময় হোক। এরপর মনোজ ডাক্তারদের ও হসপিটালে সবার কাছে ভালো থাকবার আশীর্বাদ নিয়ে সোনালিকে সঙ্গে করে বাড়ী ফেরে…
এরপর বাড়ি ফেরার পথে সোনালি তার স্বামী মনোজকে বলে তার ব্যাগ থেকে আয়নাটা বের করতে কারন সোনালি তার নিজের মুখটা একটু দেখবে। মনোজ তখন আয়নাটি ব্যাগ থেকে বের করে দিলে আয়নাতে সোনালি তার নিজেকে দেখে মুখ কালো করে বলে “হায়রে আমি দেখতে কি বিশ্রি আর কালো হয়ে গেছি”। তুমি এখন কি আর আগের মতো আমায় ভালোবাসবে? তখন মুচকি হেসে দিয়ে মনোজ বললো তোমার রুপ দিয়ে আমি কি করবো তোমার মনটা আমার কাছে সৌন্দর্যের আয়না যেটা নিয়ে আমার পথচলা। কথাগুলো শুনে তখন সোনালির চোখে জল এসে গেলে সোনালি মনোজকে জড়িয়ে ধরে…
আসলে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে এমনভাবে থেকে পরম মমতা আর ভালোবাসার পরশ দিয়ে সোনালির সেবা করে মনোজ যে ভালোবাসার নজির স্থাপন করলো যা এক কথায় অসাধারন। এমন কজন স্বামী বা ভালোবাসার মানুষ পারে ভালোবাসাকে এমন করে আঁকড়ে ধরতে। দীর্ঘদিন ভালোবেসে বা পারিবার মতে বিয়ে হলেও কাছের মানুষকে এমন সেবা করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়না। তাইতো রুপের ভালোলাগা প্রকৃত উপলব্ধি নয় বরং মনের অনুভব শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। পরিশেষে আজও মনোজের মতো কিছু মানুষ পৃথিবীতে আছে বলেই সোনালিরা যেমন একদিকে পায় অজস্র ভালোবাসা তেমনি অন্যদিকে পায় দায়িত্বশীল ও যত্নবান একজন মনের মানুষ। যে হৃদয়ে অনুভবের রাজ প্রাসাদে সর্বদা ভালোবাসার সাথী হয়ে থেকে যায় আজীবন।
সৌজন্যে প্রতিলিপি






