মেঘা ঘোষ সাহা :- চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে অর্ক ডাক দিল,” বেরিয়ে আয়।ভালো হবে না বলছি। ধরতে পারলে কিন্তুু-।”
সারাশব্দ না পেয়ে নিজেই এগিয়ে গেল সে। হঠাৎ টেবিলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুষ্টুর বিনুনির একটা অংশ দেখে গুটি গুটি পায়ে দুষ্টুর পিছনে গিয়ে দাঁড়াল অর্ক।
দুষ্টু সন্তর্পনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে অর্ক।
দুজনে অনেকটা কাছাকাছি । দুষ্টু পিছিয়ে যেতে গেলে অর্ক ওর বিনুনি ধরে কাছে টেনে নিল।
-“কি রে এমন ভাব করছিস যেন চিনিস না?
তোর মনে আছে আমার কোলে বসে তুই ওই নদীর নৌকো গুনতিস ছোটবেলায় ।
আমার গেঞ্জি ধরে
এমন লাফাতিস যে গেঞ্জি ছিড়ে যেত আর আমি মায়ের বকুনি খেতাম।তুই হাততালি দিতিস। মনে নেই? আমার কোলে চড়ে গাছের ডাল ধরে বলত তুই নাকি গাছে উঠেছিস! নিজের একটা খেলনা,খাবার আমায় না দিলে তোর শান্তি হত না! তাহলে আজ আমায় দেখে নিচ থেকে পালিয়ে এলি কেন?”
অর্ক আর দুষ্টু একই পাড়ায় একসঙ্গে বড় হয়েছে। অর্ক মাঝে বিদেশে পড়াশুনো করতে যায়। ভালো চাকরি পেয়ে বিদেশ থেকে ফিরেছে আজ। ফিরে প্রথমেই প্রাণের ভ্রমর দুষ্টুকে দেখতে চলে এসেছে তাদের বাড়িতে।
দুষ্টু এখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। বছর সাতেক আগে তার অর্কদা যখন তাকে ছেড়ে বিদেশ চলে গিয়েছিল দুষ্টু খুব কষ্ট পেয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল আর কোনোদিন অর্কদার সঙ্গে কথা বলবে না। খুব অভিমান হয়েছিল। কিন্তু তখন তাকে অর্কদা বলেছিল,
“দুষ্টু তোকে আমি ভালোবাসি। তুই আমায় ভুলে যাস না । আমি ঠিক তোর কাছে ফিরে আসব।” দুষ্টু সেদিন কথাগুলো বোঝে নি।কিন্তু এটুকু বুঝতে পেরেছিল যে অর্ক দার প্রতি তার অনুভূতি খুব আলাদা কিন্তু কি সেই অনুভূতির নাম সে খুঁজে পায় নি। যৌবনে পা দিয়ে সে উপলব্ধি করে সেই অনুভূতির অর্থ। তখন সেই অনুভূতি এমন ঘন মেঘের মত ছেয়ে গেছে তার হৃদয়ের আকাশে যে সেই আকাশকে ছাপিয়ে আর কেউ রৌদ্র আনতে পারে নি কোনোদিন।দুইজনের মধ্যে মেলে আদান প্রদান চলত মাঝে মাঝেই।
আজ এত দিন পর সেই অর্কদাকে দেখে তার কৈশোরে শোনা কথা গুলো কানে বেজে উঠল ।সেদিনের সেই কথা আজ যেন অন্তরের কোন নিষিদ্ধ প্রাসাদের গুপ্ত গহ্বরে গিয়ে আঘাত করল। মল্লিকাবনে প্রথম ফোঁটা কুড়ি যেন আজ সলজ্জে বিকশিত হওয়ার অপেক্ষায় উন্মুখ।
কিন্তু দুষ্টুর জীবনে ইতিমধ্যে ঘটে গেছে এক অঘটন। দুষ্টু যখন কলেজে নতুন পা রেখেছে, প্রাণচঞ্চল দুষ্টু একজন ছেলেবন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা করত। দুষ্টুর মনে নিছক বন্ধুত্বের বেশি কিছু ছিল না কিন্তু ছেলেটির মনের কুঅভিসন্ধি সে টের পায় নি। একদিন তারা দুজন কলেজের পিছনে ঝিল পারে যায় এবং ছেলেটি তাকে প্রেম নিবেদন করলে দুষ্টু ভদ্রভাবে জানায় যে তার পক্ষে এমন কিছু ভাবা অসম্ভব।
মুহূর্তে পরিচিত বন্ধু অপরিচিত এক দানবে পরিণত হয়ে দুষ্টুর ওপর জোর প্রয়োগ করে তার সঙ্গে অসভ্য আচরণ করার চেষ্টা করে। দুষ্টু কোনরকমে পালিয়ে বাঁচে কিন্তু দুষ্টুর কাছে এ এক বিভীষিকাময় স্মৃতি হয়ে ওঠে। দুষ্টুকে অপরাধ বোধ ভোগায়। সে ভাবে বুঝি তার বন্ধুত্বের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ছিল। এত হাসি খুশি প্রাণচঞ্চল হয়ে মেশা তার অপরাধ ছিল। কখনো ভাবে সে বুঝি ছেলেটিকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। কখনো ভাবে সে ছেলেটির সঙ্গে একা ঝিল পারে না গেলে হয়তো এমনটা হত না।
এই ঘটনার পর থেকে দুষ্টু চুপ চাপ হয়ে যায়।অর্ক তাকে mail করলে সে আর রিপ্লাই করত না। তার মনে হয় সে অর্ক কে বুঝি ঠকিয়েছে। অর্কর বিশ্বাসের অবমাননা করেছে।
আজ মনের সুপ্ত অনুভূতি লুকিয়ে সে চেয়েছিল অর্কর থেকে আড়ালে থাকতে। অর্কর মত একজন ভালো ছেলের জীবনে তার মত একজন অপরাধী মেয়ে কোনো জায়গা থাকতেই পারে না।
তাকে যে কোনো উপায়ে আজ অর্ককে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে যে তার জীবনে অর্কর কোনো জায়গা নেই। তার মনে অর্কর কোনো স্থান নেই। অর্কদা অনেক ভালো কোনো মেয়েকে নিয়ে ভালো থাকুক। অর্কর জীবন সে নষ্ট করতে পারবে না তার কালো ছায়া দিয়ে।
এসব সাত পাঁচ ভাবছে এমন সময় অর্ক তার বিনুনি ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল!সেই পুরোনো গম্ভীর স্বরে তার ঘোর ভাঙলো।
-“খুব পেকেছিস মনে হচ্ছে। আমার থেকে পালিয়ে কোথায় যাবি?”
অর্ক তার থুতনি ধরে মুখটা উচুঁ করে বলে,” কি রে? গত এক বছর আমার মেলে কোনো রিপ্লাই দিস নি কেন?রাগ করেছিস আমার ওপর না মনটা খারাপ ?”
সেই পরিচিত স্নেহমাখা গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর। দুষ্টুর মনে হল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সে আছে কিন্তু না,এই ভাবে অর্কদার প্রতি আবেগ প্রবন হলে হবে না।অর্ক দাকে অর্ক দার ভালোর জন্যই মুক্তি দিতে হবে ।
দুষ্টু নিজেকে অর্কর বলিষ্ঠ বাহুডোর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পিছন ফিরে বলে,” না,সেরকম কিছু না।”
-“বললেই হল। তাহলে শেষ mail এ যে প্রমিজ করেছিলি সেটা দে।”
অর্কর সরল আকুতিতে মেশানো ছেলেমানুষী প্রেম।
দুষ্টুর সেই গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারির প্রমিজ মনে পড়তে অব্যক্ত যন্ত্রনায় চোখে জল চলে আসে। কিন্তু অর্কদার সামনে এই দুর্বলতা কিছুতেই প্রকাশ করা যাবে না। অর্কদা কে তার মায়াতে সে বাঁধবে না।
সে নিরুত্তাপ হয়ে বলে,” কোনো প্রমিজ আমার মনে নেই !আমি খুব ব্যস্ত থাকি পড়াশুনো নিয়ে। তুমি এমন কেউ নয় যাকে বলা কথা আমার মনে রাখতে হবে। কে তুমি আমার?”
অর্ক গুটি গুটি পায়ে দুষ্টুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
দুষ্টু মুখ লুকোবার চেষ্টা করতেই দুষ্টুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মাঝে।
-“এবার ছাড়িয়ে যা দেখি। ক্ষমতা আছে?”
-“ছাড়ো অর্ক দা। “
-“তুই ছাড়িয়ে যা।”
খানিক চেষ্টা করে ক্লান্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে দুষ্টু।
অর্ক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,” আমায় একবার বলতে পারতিস।এই তুই ভালবাসিস তোর অর্কদা কে।”
দুষ্টু অবাক হয়ে যায়।কি বলার কথা বলছে? অর্কদা কি জানে? কিন্তু দুষ্টু সেই সন্ধ্যার অভিজ্ঞতার কথা প্রিয় বন্ধু তিয়াস ছাড়া কাউকে জানায় নি আর তিয়াস কথা দিয়েছিল কাউকে বলবে না। তবে?
অর্ক তাকে আরো কঠিন বাহুডোরে আঁকড়ে বলে। -“তোর সিনিয়র কথাকলি আমার ব্যাচ মেট। ওকে আমি বলেছিলাম সবসময তোর খেয়াল রাখতে কলেজে তোর যেন কোনো অসুবিধে না হয়।
তুই যখন সেই দুর্ঘটনার শিকার হস আর তোর বান্ধবী তিয়াসকে জানাস,আমায় mail করা বন্ধ করিস,আমি কথাকলিকে বলি খবর নিতে। তিয়াস তোর অনুরোধ রাখে নি কারন তিয়াস বুঝেছিল তুই আমার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ভুল করছিস। তিয়াস কথাকলিকে তোর ভালো চেয়ে সব সত্যিটা বলে আর আমিও সবটা জানতে পারি।
দুষ্টুর যন্ত্রনা অশ্রুধারায় গড়িয়ে পরে দুই গাল বেয়ে।
-“হয় দুষ্টু।এমন অনেক কিছু হয়। তুই জানিস আমার এক বন্ধুকে তার মেয়ে বন্ধু company তে ওপরে ওঠার জন্য কিভাবে শারীরিক অত্যাচারের মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে বিপদে ফেলেছে। আমার বন্ধুর জীবন কি থেমে গেছে? তাহলে তুই নিজে শিকার হয়ে কেন মুখ লুকিয়ে ঘুরবি সারা জীবন? তোর অর্কদা বেঁচে থাকতে এটা কি করে হবে?”
অর্ক সস্নেহে চুম্বন এঁকে দেয় দুষ্টুর কপালে।
দুষ্টুর ভিতরের নির্বাক স্তম্ভিত না বলা কথা পাথরটা যেন সেই চুম্বনের স্পর্শে ইন্দ্রজালে বিগলিত হয়। দুষ্টু শিশুর মত কুঁকড়ে কেঁদে ওঠে। মুখ গুঁজে দেয় তার অর্কদার বুকে।
অর্ক মৃদুকণ্ঠে দুষ্টুর কানে কানে বলে,” না,আর কান্না না। আমি এসে গেছি না?”
দুষ্টুর সমস্ত কান্না যেন নিজের বুকের গভীরে নিয়ে নেয় অর্ক । নিজের ভালোবাসা দিয়ে শুষে নেয় দুষ্টুর মনের জমা সব কষ্ট।
-“এখন থেকে জীবনের কোনো কান্না আর একলা কাঁদবি না।ঢেলে দিবি এই বুকটায়।”
এতখনে দুষ্টুর সম্বিত ফিরে। সে খেয়াল করে সে তার অর্কদার দুই বাহুতে আবদ্ধ!লজ্জায় তার মাথা কাটা যায়। কেমন করে এত বছরের ব্যবধান পেরিয়ে সে পৌঁছে গেছে তার প্রাণের মানুষের প্রাণের মাঝে সাক্ষী শুধু সময়!
দুষ্টুর আড়ষ্ট দুই হাত নিজের কোমরের দু পাশে নিয়ে অর্ক বলে,”আমায় একবার জড়িয়ে ধর।”
দুষ্টু লজ্জা পায়।তারপর ক্রমশ আড়ষ্ট দুই হাত কুণ্ঠার বেরা কাটিয়ে উজাড় করে জড়িয়ে ধরে অর্ককে।
অর্ক তার কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে,” আরো জোরে আঁকড়ে ধর আমায়।”
দুষ্টু সব লজ্জা ভুলে তার কৈশোরের প্রথম প্রেম,যৌবনের প্রথম ভালোবাসার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। এই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্তে জড়িয়ে ধরে তার জীবনের দোসরকে। আমৃত্যু অবলম্বনটিকে সজোরে আঁকড়ে ধরে।
অর্ক বলে,” এবার বল দেখি, আর কষ্ট হচ্ছে?”
দুষ্টু অর্কের শার্টএ মুখ ঘষে বলে,”একটুও না!”
-“বল দেখি এই মুহূর্তের স্বপ্ন কোনোদিন দেখিস নি?”
দুষ্টু চুপ থাকে।
অর্ক বলে,”আমি রোজ দেখেছি দুষ্টু। প্রতি দিন তোকে কল্পনা করেছি লাল শাড়িতে সিঁদুর পড়ে আমার স্ত্রী হিসেবে! কল্পনা করেছি তোকে আমি আমার সবটুকু দিয়ে ভালোবাসছি। প্রতি রাতে কল্পনা করেছি তোর বুকে মাথা রেখে ঘুমোনো।কল্পনা করেছি ঝড়ের রাতে তোকে আমি -“
দুষ্টু লজ্জা পেয়ে অর্কর ঠোঁট দুটি নিজের আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে।
অর্ক বলে,” আমায় থামিয়ে দে কিন্তু তোর কাছ থেকে প্রমিজটা আমার চাই। “
-” পরে।
-” না আজি চাই ।এখুনি। এত গুলো বছর অপেক্ষা করে আছি। দে।ওটা না নিয়ে নড়ছি না।”
-“তুমি বড্ড লম্বা।”
-“আমার পায়ের ওপর উঠে দাঁড়া।”
-“কি বল? কেউ দেখে ফেললে?”
-“কেউ আসবে না।যা বলছি কর।
দুষ্টু অর্কর পায়ের ওপর নিজের গোঁড়ালিতে ভর দিয়ে দাঁড়ায়।তারপর আলতো করে অর্কর কাঁধে হাত রেখে ভর দিয়ে কপালে নিজের ওষ্ঠ স্পর্শ করে বলে,” অসম্ভব ভালোবাসি!”
পড়ন্ত মধ্যাহ্ন আর আসন্ন গোধূলির মিলন খনের আলো রাঙিয়ে দেয় চিলেকোঠার ঘর। কিচিরমিচির করে ওঠে গৃহগামি পাখির দল। সেই নরম আলো সারা মুখে মেখে দুষ্টু দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে মাটিতে।
সেই লাজুক মুখপানে তাকিয়ে অর্ক বলে,” শুধু তোর মুখ থেকে এটুকু শোনার অপেক্ষায় এসেছি এত দুর থেকে।বলছিলি না তখন ,আমি তোর কে? বল দেখি এবার। কি রে বল!”
দূরে কোথায় বেজে ওঠে -“ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে? না পেয়ে তোমার দেখা একা একা দিন যে আমার কাটে না রে!”
সৌজন্যে প্রতিলিপি






