সুমনা চ্যাটার্জী :-“হ্যাঁ রে, বেলা, তোরা তো খুব বন্ধু রে! তা তোর সেই প্রাণের বন্ধু লিলি, কদিন ধরে স্কুলে আসছে না দেখছি! মাধ্যমিকে অত ভালো রেজাল্ট করল, ফার্স্ট ডিভিশন, দিয়েই ডানা গজিয়ে গেল নাকি তার।”
বেলা একটু থতমত খেয়ে বলল, “লিলি! বাড়িতেই আছে দিদি!”
“সে কি রে! উচ্চ মাধ্যমিকে সায়েন্স নিয়ে পড়বে বলেছিল! তারপর একেবারে গায়েব!”
বেলা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্কের দিদিমণি মালাদিকে ওরা ভীষণ ভয় পায়।
স্টাফ রুমে বেলাকে ডেকে নিয়ে এলেন মালাদি।
“সব খুলে বল আমাকে বেলা। কিচ্ছু লুকাস না। আমি তো তোদের মায়েরই মত।”
“মায়েরই মত” শব্দ দুটো বলার সময় গলাটা একটু কেঁপে গেল মালাদির। বেশির ভাগ গরীব ঘর থেকেই পড়তে আসে তার এই স্কুলটিতে। এদের জন্য কতটুকু কি করতে পেরেছেন তিনি!
“কি রে, বল?”
হ্যাঁ, দিদি, বলছি। আসলে স্কুলে এসে বললে ওর বাবা ভীষণ রাগ করবে বলেছে!”
“তুই বলবি কি না?”
“ওদের বাড়িতে সবাই বিড়ি বাঁধে দিদি। ওকেও ওই কাজেই লাগিয়ে দিতে চায়।”
“আর লিলির মত কি?”
“লিলির আবার মত কি দিদি! কে জানতে চায়! কালকেই দেখা হয়েছিল ওর সাথে। আমাকে বলছিল, বাঁচতে ইচ্ছে করে না রে একদম! একটা ধারালো ব্লেড রেখে দিয়েছি। আর একবার বলব মাকে। তারপরেও যদি না মানে….”
“কি বলছিস বেলা!” রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন মালাদি। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, তবুও ঘেমে উঠেছেন তিনি।
ছটফট করছে মনটা। ছুটি হলেই আজই বেলার সঙ্গে, নাকি পরে….
“তুই দেখিয়ে দিবি ওদের বাড়িটা?” আজই যাবেন বলে তিনি মনস্থির করে ফেললেন। দিশার বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলেন যে, ফিরতে আজ দেরী হবে।
“আমি দূর থেকে দেখিয়ে দেব দিদি।”
উঠোনে বসে বিড়ি বাঁধছিল কয়েকজন মহিলা। তার মধ্যে ওই তো …. লিলি না!
“দিদিমণি আপনি!” উঠে দাঁড়িয়েছে লিলি।
“তোমার মা কোথায়?”
ইশারা করে মাকে দেখিয়ে দিল লিলি।
“মেয়েকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন না কেন? এত ভালো লেখাপড়ায় আপনার মেয়ে!” সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন মালাদি।
“ও অনেক পড়া হয়েছে দিদি। আর বেশি পড়ে কি হবে? আমাদের ঘরে এখন থেকেই ইনকাম করতে হয়।”
“না, ও পড়বে। আমি নিয়ে যাবো ওকে।”
তারপর লিলির দিকে তাকিয়ে বললেন,”তুই যা, তোর জামা কাপড় কি আছে নিয়ে আয়।”
“হুঁ হ… মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। বিনে পয়সার কাজের লোক বানাবে তো ওকে নিয়ে গিয়ে….”
“মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি”, ঠিক এই কথাটাই একদিন বলেছিলেন মালাদি তার বাল্যবন্ধু তৃষাকে।
লেখাপড়ায় মোটেই মন ছিল না তার মেয়ে দিশার। অঙ্কে ছিল অসম্ভব কাঁচা। অথচ ওরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই অঙ্কের শিক্ষক।
মেয়েটা হয়েছিল অবিকল দিদিমার মত। মালাদির মাও অসম্ভব সুন্দর গান গাইতেন। বাঙালি বাড়িতে মেয়েকে যেমন গান শেখানো হয়, সেরকমই শেখাতেন তিনি। তাই বলে গান নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকবে নাকি!!
বন্ধু তৃষা এসে বলেছিল, “নিজের মতামত ওর ওপর চাপিয়ে দিস না। ওকে ওর মত বাঁচতে দে। দিশা গান নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়।”
মালাদি বলেছিলেন, “আমার চেয়ে বেশি ভালবাসিস তুই ওকে? মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। তাও যদি তুই আমার বন্ধু না হয়ে নিজের বোন হতিস!”
তৃষা তার মেয়েকে বেশি ভালোবাসে কি না জানেন না মালাদি, তবে বুঝেছিল ঠিক।
নিজের জেদ আর অহঙ্কার নিয়ে যদি সে মেয়ের পেছনে লেগে থাকত তবে আজ হয়ত সে ভয়ঙ্কর ডিপ্রেশনে ডুবে যেত।
“বন্ধুর কথা শোনো।” দিশার ঠাকুমা একথা বলার পর তিনি দোনামোনা করে মেনে নিয়েছিলেন।
দিশা আজ একজন সফল গায়িকা। কত গর্ব আজ মালাদির….
বাগবিতণ্ডার মধ্যে গেল কোথায় মেয়েটা! হৈ চৈ এর মধ্যে তাকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও!
মালাদি চিৎকার করলেন, “কোথায় গেলি রে লিলি!”
“ওকে মনে হয় বাথরুমের দিকে যেতে দেখলাম।” একজন বলল।
বাথরুম বলতে টিনের দরজা দেওয়া একটা ঘেরা মত জায়গা।
বেলার কথাটা মনে পড়ে গেল হঠাৎ…. ধারালো ব্লেড….
পাগলের মত ছুটে গিয়ে দরজাটায় আঘাত করলেন মালাদি।
“কি করছিস তুই? বেরিয়ে আয় শিগগির!”
“আমি বাথরুমে এসেছিলাম দিদি!”
“ব্লেড কোথায়!”
মাথা নীচু করে লিলি বলল, “রোজ ওই ভাবিই দিদি, মরতে আর….”
“এমন একটি চড় মারব না তোমায়! চল আমার সঙ্গে।”
“মেয়ে যে আত্মহননের কথা ভাবছে বুঝতে পেরেছিলে লিলির মা? জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না বুঝেছো!”
“তাহলে আপনি নিয়ে যাবেন ওকে?”
“হ্যাঁ, সে তো বটেই। ওকে না নিয়ে আমি এখান থেকে যাচ্ছি না। লোকাল থানার অফিসার আমার পরিচিত। তাকে ফোন করে সব জানিয়েই আমি এখানে এসেছি।”
মোবাইলে রিং হচ্ছে। ব্যাগ থেকে বের করে মালাদি দেখলেন তৃষা ফোন করছে।
“কি রে? কি ব্যাপার?”
“তুই কোথায় এখন? বাড়ি ফিরিসনি এখনও?”
“আরে বাবা, কি বলবি বল না!”
“আমার ছেলেকে কেমন লাগে তোর?”
তৃষার ছেলে ব্যাঙ্কের অফিসার। বেশ ভদ্র।
“ভালোই। কেন?”
“তোর মেয়ে আর আমার ছেলে, মানে ওরা তো চুটিয়ে প্রেম করছে রে! হোয়াটস অ্যাপে চ্যাট করে প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত। টের পাসনি কিছু? ওদের বিয়েটা দিতে হবে তো!”
“তাহলে বিয়ে দিয়ে নিয়ে যা তোর বাড়িতে।”
“হুঁ, এবার মাসি থেকে শাশুড়ি মা হব। আরও কমপ্লিকেটেড ব্যাপার!”
“কেন? এর মধ্যে জটিলতার কি আছে! দুই বন্ধুর ছেলে মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করতেই পারে।”
“দিশা এবার তার শাশুড়ির নয়নের মণি হবে।” হাসছে তৃষা।
হেসে ফেলেছেন মালাদিও। “হোক না। ক্ষতি কি!”
“আচ্ছা এখন রাখছি রে। পরে কথা বলব।”
তারপর লিলির হাতটা ধরে বললেন, “চল মা। এখনও অতটাও দেরী হয়নি। সায়েন্স নিয়ে ভর্তি করে দেবো তোকে। অঙ্কে অনার্স নিয়ে পড়বি তো রে! এখন থেকে তোর সব ইচ্ছে পূরণ করার দায়িত্ব তোর এই মালাদির।”






