Select Language

[gtranslate]
১৫ই চৈত্র, ১৪৩২ রবিবার ( ২৯শে মার্চ, ২০২৬ )

।চক্ষুদান।

পুষ্পিতা ভৌমিক


আর কিছুদিন পরেই পুজো শুরু। প্রতিবারের মতো রায়চৌধুরীদের দালান, নাটমন্দির সেজে উঠছে নতুনরূপে মা দুর্গাকে বরণ করে নেবার জন্য। সাবেকি ঝাড়লণ্ঠন খুলে পরিষ্কার করা হচ্ছে খুশির রঙে রাতটাকে দিনের আলোর মত স্পষ্ট করার জন্য। চারদিকে সাজো সাজো রব। শরতের সুনীল আকাশের পুজো পুজো গন্ধ মেখে বাড়ির অন্দরমহল, বাহিরমহল চতুর্দিকে দুগ্গা মায়ের আগমনীর সুর ধ্বনিত হচ্ছে। তবুও সবকিছুর মধ্যে বাড়ির বুড়োকর্তা দিগ্বিজয় রায়চৌধুরীর মনটা ভালো নেই। একটা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ওনাদের বাড়ির পরম্পরা অনুযায়ী কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মৃৎশিল্পী ব্রজেন্দ্রলাল পাল প্রতিমা তৈরি করেন এই বাড়িরই ঠাকুরদালানে বসে। এর আগের প্রজন্মে ঠাকুর বানাতেন ব্রজেন্দ্রর বাবা কানাইলাল। ওদের সবারই প্রতিমা বানানোর দক্ষ হাত। এবারও বাড়িতেই ঠাকুর বানানো হচ্ছে কিন্তু ব্রজেন্দ্র অনুপস্থিত। পুজোর মাস তিনেক আগে ফোনে জানিয়েছেন,”উনি এবার আসতে পারবেনা। বয়েস হয়েছে চোখে ভালো দেখতে পাচ্ছেন না। ছানি অপারেশন করাতে হবে। তবে ব্রজর ছোট ছেলে কমলেন্দু সব সামলে নেবে।” সেইমত কমলেন্দুই এবার প্রধান কারিগর হিসেবে এই বাড়িতে পা রেখেছে। খুব চুপচাপ ছেলেটা, এই কদিনে ওর গলাটাই ভালো করে শুনতে পাননি বুড়োকর্তা দিগ্বিজয় রায়চৌধুরী। এমনিতে যা দেখা যাচ্ছে কাজ এগোচ্ছে বেশ ভালোই কিন্তু মহালয়ার দিন ভোরে চক্ষুদানটা নিয়েই একটা চিন্তার রেখা উঁকি দিচ্ছে। প্রতিমার চোখ আঁকা মোটেও সহজ কাজ নয়। যাইহোক মা দুগ্গার মনের যা ইচ্ছে সেটাই হবে। ওনার পুজো উনিই ঠিক সমাধা করবেন।

এইভাবে কেটে যায় বেশ কিছুদিন। রাত পোহালেই মহালয়া, দেবীপক্ষের শুরু। রেডিওটা ঝাড়পোছ করে ঠিকঠাক করা হয়েছে, আর একবার মিস্ত্রি ডেকে দেখানোও হয়ে গেছে যাতে চলার সময় কোনো গন্ডগোল না হয়। ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মহাশয়ের উদাত্ত কণ্ঠে মহালয়া শুনলে মনে হয় পুজো এবার সত্যিই দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। বাড়ির সবাইকে ভোরে উঠে স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পরে ঠাকুরদালানে চলে আসতে হয়, এটাই এই বাড়ির রেওয়াজ। একদিকে রেডিওতে মহালয়া চলে আর একদিকে প্রতিমার চক্ষুদান। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর মায়ামাখা আবেশ অনুভূতি কাজ করে। এবার কমলেন্দু কেমন চক্ষুদান করে সেটাই দেখার! রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ছেলেটার সাথে একবার কথা বলতে গেছিলেন দিগ্বিজয়বাবু কিন্তু দারোয়ান রামহরি বললো,” কমলেন্দুবাবু একটা বিশেষ দরকারে বাড়ির বাইরে গেছেন আর বলে গেছেন ফিরে এসে চক্ষুদান হবে। বুড়ো কর্তাকে চিন্তা করতে না করো।” যাক সব কিছু যেন ভালোয় ভালোয় মেটে, মা দুর্গার উদ্দেশ্যে দুই হাত জোড় করে রাতে শুতে যান বুড়োকর্তা আর ওনার স্ত্রী রুপবালাদেবী।

উৎসাহ আর উত্তেজনায় রাত কেটে ভোরের আলো ফোটে। সাবেক দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা জানান দেয় ভোর চারটে। এবার স্নানে যেতে হবে একেক করে। পেল্লাই তিনতলা বাড়িটার ঘরগুলোয় এক এক করে আলো জ্বলে ওঠে যার মানে সবাই ঘুমের রেশ কাটিয়ে উঠছে। এমনসময় সদর দরজায় একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা যায়। এই কাক ডাকা ভোরে কে এলো রায়চৌধুরীদের বাড়ি? একটুখানির মধ্যেই সব পরিষ্কার হয় দারোয়ান রামহরির হাঁকডাকে, “বুড়োকর্তা দেখে যান কমলেন্দুবাবু কাকে নিয়ে এসেছে, আর কোনো চিন্তা নেই আমাদের।”

চশমার কাঁচটা ভালো করে মুছে নিয়ে নীচে নেমে দিগ্বিজয়বাবু দেখেন কমলেন্দু ওর বাবা ব্রজকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুড়োকর্তার পিছন পিছন বাড়ির অন্যরাও এসে জড়ো হয় একে একে। ভরাট কণ্ঠে দিগ্বিজয় বলেন,”কী হে ছোকরা নিজের উপর ভরসা রাখতে পারলে না বুঝি! এখনকার প্রজন্মের এই এক দোষ, খালি মুখেই হম্বিতম্বি! আমি ঠিক জানতাম চক্ষুদান করা তোমার কম্মো নয়। যাইহোক ব্রজ তুমি এসেছ আমি খুশিই হয়েছি। কিন্তু তুমি নিজের এই ঝাপসা চোখ নিয়ে প্রতিমার চক্ষুদান করবে কী করে?”

শান্ত নির্বিকার কণ্ঠে ব্রজ বলে,”বাবু এতদিন আপনার বাড়িতে কাজ করছি, কোনোদিন কারুর মুখে মুখে কোনো কথা বলিনি। আজ বলছি সবটা না দেখে, শুনে আপনি আমার কমলকে কথাগুলো নাই শোনাতে পারতেন। কমল আমাকে এখানে এনেছে আমাকে দিয়ে চক্ষুদান করানোর জন্য নয়, এক পিতার হাত ধরে পুত্রের উত্তরণ দেখার জন্য। ছোটবেলা আমার থেকে ওর কাজ শেখার হাতেখড়ি। তাই ও চেয়েছিল পুজোর আগে আমার চোখের ছানি অপারেশন করিয়ে দেবে। আমি যাতে পরিষ্কার করে দেখতে পাই ও নিজের হাতে প্রতিমার চক্ষুদান করছে, মৃন্ময়ী প্রতিমা প্রাণ পাচ্ছে ওর হাত ধরে। এটা পিতা, পুত্রের পরম্পরা বলতে পারেন। অভিজাত পরিবারের আচার, বিচারের মতো আমাদের শিল্পীদেরও তো কিছু পরম্পরা আছে বলুন বুড়োকর্তা? কিছুদিন আগেই ও আমাকে টাকা পাঠিয়ে বলেছিল চোখের ছানি অপারেশন করিয়ে নিতে।”

বাবাকে থামিয়ে কমলেন্দু বলে,”হুম সম্পূর্ণ একার দায়িত্বে মাতৃমূর্তি বানানো আমার এই প্রথমবার। তাই মাস তিনেক আগে এই রায়চৌধুরী বাড়ির প্রতিমা বানানোর অগ্রিম হিসেবে যে টাকাটা পেয়েছিলাম সেটা দিয়েই বাবার চোখটা অপারেশান করিয়ে নিতে বলেছিলাম। বাবা আমার কথা রেখেছিলেন, গতমাসে বাবার অপারেশন হয়। আজ মাটির প্রতিমার চক্ষুদান হবে আর আর আমার বাবার চোখদুটি আঁধারে থেকে যাবে এটা তো হতে দেওয়া যায়না। এটা ভগবান মানে বাবাকে আমার গুরুদক্ষিণা থুড়ি চক্ষুদান। সন্তান হিসাবে এটাই আমার নিবেদন, আমি গতকাল রাতে নিজে গিয়ে বাবাকে নিয়ে এসেছি গাড়ি করে। চলো বাবা স্নান সেরে আসি। তুমি একটা চেয়ারে বসবে আর আমি আমার কাজ শুরু করব। আপনারাও যান সবাই স্নান সেরে যে যার জায়গায় গিয়ে বসুন এবার।”

শরতের টুপটাপ ঝরে পড়া শিউলিরাজির মতো বৃদ্ধ ব্রজবাবুর দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জলের ধারা। দিগ্বিজয়বাবুর চোখেও তখন জল, একটা ভুল ধারণা ভেঙে গেছে। এখনকার প্রজন্ম শুধু মুখেই বলেনা কাজেও করে দেখায়, দায়দায়িত্বের ভার ঝেড়ে ফেলে নয় বরং আগের প্রজন্মকে যথাযথ সুযোগ্য সম্মান নিয়ে নতুন, পুরনোর মেলবন্ধন করে একসাথে মহামিলনের উৎসবের সুর গায়। দুহাত বাড়িয়ে দিগ্বিজয়বাবু ওনার বুকে জড়িয়ে ধরেন কমলেন্দুকে। প্রাণখোলা পরিচিত হাসি হেসে বলেন,”বাবার যোগ্য উত্তরসূরি তুমি কমলেন্দু। আমার বয়স হয়েছে। এই ভেবে মরার আগে নিশ্চিত হলাম যে আমি না থাকলেও এই বাড়ির প্রতিমা গড়া নিয়ে আমার ছেলেপুলেদের চিন্তা করতে হবেনা। মা দুগ্গা নিজেই তার লোককে খুঁজে নিয়েছেন। জয় মা, মা গো! এই নাও কমল তোমার নতুন জামা। স্নান সেরে এসো। আমরাও যাই।”

স্নান সেরে যে যার জায়গায় এসে বসেন। ব্রজবাবু দুচোখ ভরে দেখতে থাকেন ছেলে কমলের হাত ধরে মা উমা জাগ্রত হচ্ছেন। রায়চৌধুরী বাড়ির বাগান থেকে ভেসে আসে সদ্য ফোটা শিউলির গন্ধ। সবার চোখে বিস্ময়, ভক্তি ভরা অনুভূতি কাজ করে, তরুণ শিল্পী কমল সুনিপুণ দক্ষতায় কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়। রেডিও থেকে ভেসে আসে আবহমানকালের সেই সনাতনী সুর,

“আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি
অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে
আনে নবভাবমাধুরীর সঞ্জীবন
তাই আনন্দিতা শ্যামলী মাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন। “

সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read