বরাহরূপধারী ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু হিরণ্যাক্ষ নামক রাক্ষসের হাত থেকে ভূদেবী পৃথিবীকে উদ্ধার করেন।
মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথি ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণুর দশ অবতারের তৃতীয় অবতার শ্রীশ্রী বরাহদেবের আবির্ভাব তিথি।
সত্যযুগে ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু বরাহ অর্থাৎ শূকরের রূপে প্রকট হন। শ্রীশ্রী বরাহদেবের চারটি হাত; চার হাতে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম; এবং বরাহদন্তে ধরা থাকে পৃথিবী। শ্রী হরি বিষ্ণুর বরাহ অবতার প্রলয়ের পর পৃথিবীর নবজন্ম ও নতুন কল্পপ্রতিষ্ঠার প্রতীক।
পুরাণে শ্রী হরি বিষ্ণুর বরাহ অবতারের পূর্ণাঙ্গ উপাখ্যান —
গোলোকে শ্রী হরি বিষ্ণুর দ্বাররক্ষী ছিলেন তাঁর দুই পরম ভক্ত জয় এবং বিজয়। একদিন ব্রহ্মার চার সন্তান এলেন শ্রী হরি বিষ্ণু সমীপে। এই চারজন আকারে ছিলেন বালকের মতো, কিন্তু তাঁরা চার ঋষি। জয় এবং বিজয় তো তাঁদের বালক জ্ঞানে গুরুত্ব দিলেন না বললেন‚ ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু বিশ্রাম করছেন সাক্ষাৎ হবে না।
একে‚ চার ঋষিকে বালক ভেবে গুরুত্ব না দেওয়া তার উপর বৈকুণ্ঠে প্রবেশে বাধাদান। প্রজাপতি ব্রহ্মার চার পুত্র সনকা‚ সদানন্দ‚ সনাতন এবং সনৎকুমার তো কুপিত হলেন প্রবল। তাঁরা অভিশাপ দিলেন জয় এবং বিজয়কে। বললেন‚ কৃতকর্মের ফল হিসেবে তোমাদের দেবত্ব হরণ করা হবে। দেবলোক ছেড়ে তোমাদের চলে যেতে হবে। তোমাদের স্থান বৈকুন্ঠে নয় পাতালে যাও। সেখানে তোমরা তোমাদের এই দম্ভের বাসনা মিটিয়ে এসো।
উদ্ধার পেতে শ্রী হরি বিষ্ণুর পায়ে কেঁদে পড়লেন জয় ও বিজয়। তাঁদের করুণ প্রার্থনায় শ্রী হরি বিষ্ণু নারায়ণের মন দ্রব হল। বললেন অভিশাপ তো দূর হবে না। কিন্তু তোমাদের দুটি সুযোগ দিচ্ছি। হয়‚ তোমরা আমার ভক্ত রূপে পৃথিবীতে সাত জন্ম কাটাবে। নয়তো শ্রী হরি বিষ্ণু নারায়ণের শত্রু হয়ে তিন জন্ম অতিবাহিত করবে। তিন বারই জয়-বিজয়কে নানা অবতারে হত্যা করে উদ্ধার করবেন শ্রী হরি বিষ্ণু নারায়ণ। এভাবেই মোক্ষপ্রাপ্তি হবে তাঁদের।
জয় এবং বিজয় জানালেন‚ তাঁরা ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু নারায়ণকে ছেড়ে সাত জন্ম দূরে থাকতে পারবেন না। বরং তার থেকে তাঁর শত্রু হয়ে জন্মগ্রহণ শ্রেয়। তাহলে তিন জন্ম দূরে থাকতে হবে। তারপর বরাবরের জন্য এখানে ফিরে আসতে পারবে।
প্রথম জন্মে ওরা হয়েছিল কশ্যপ-তনয়। দিতির ছেলে হিরণ্যাক্ষ আর হিরণ্যকশিপু। দ্বিতীয় জন্মে হয়েছিল, সুকেশিনীর ছেলে রাবণ আর কুম্ভকর্ণ। তৃতীয় অর্থাৎ শেষ জন্মে হয়েছিল শিশুপাল আর দন্তবক্র। আর প্রতিবারেই স্বয়ং ভগবানকে বিভিন্ন অবতার রূপে আসতে হয়েছিল তার প্রিয় অনুচরদের উদ্ধার করে নিয়ে যাবার জন্য।
দেবতারা তাদের আপন ভাই অসুরদের হত্যা করেছিল অমৃতপান করে। তাই মাতা দিতি অত্যন্তকষ্ট পান। তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় তার পতি কশ্যপ মুনির কাছে যান। কশ্যপমুনি তখন ধ্যানরত ছিলেন। মাতা দিতি কশ্যপ মুনির কাছে বর চান; তার যেন পুষনরায় এমন পুত্র হয় যারা ইন্দ্রকে পরাজিত করে আপন ভাইদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারে।
মুনি কশ্যপের বরে মাতা দিতির দুইটি যমজ পুত্র হয়। তারা হলেন মহা-পরাক্রমশালী হিরণ্যাক্ষ আর হিরণ্যকশিপু। বাল্যকাল থেকেই তারা যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠে। তারা নিরীহ প্রাণীদের নির্দয়ভাবে বধ করত। তারা দুই ভাই ইন্দ্রকে পরাজিত করার ইচ্ছা পোষণ করত। আর দেবতাদের শত্রু মনে করত।
অসুরগুরু শুক্রাচার্যের পরামর্শে হিরণ্যাক্ষ ভগবান ব্রহ্মার ঘোরতর তপস্যা শুরু করেন। কঠোর তপস্যার পর ভগবান ব্রহ্মা তাকে ইচ্ছানুসারে বর চাইতে বললেন। হিরণ্যাক্ষ বর চাইলেন; কোন রক্ষ-যক্ষ, দেব-দানব, মনুষ্য-কিন্নর, পশু-পাখি (তিনি বিভিন্ন পশুর নাম বললেন) কর্তৃক যেন তার মৃত্যু না হয়।
ব্রহ্মা তাকে তার ইচ্ছানুসার বর দান করলেন। বরদান পেয়ে সে অহংকারী ও অত্যাচারী হয়ে ওঠে। সে স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য তথা ত্রিলোক দখল করে নেয়। হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীর দেবী বসুমতীকে ও সমুদ্রের অভ্যন্তরে আটকে রাখেন।
বিতাড়িত দেবগণ ভগবান ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে ব্রহ্মা ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণুর কাছে আকুল প্রার্থনা করেন যেন তিনি এই সংকট মোচন করেন।
বিষ্ণু হঠাৎই এক হাঁচি দিলেন। তখন তাঁর হাঁচির সাথে একটি ক্ষুদ্র বরাহ বেরিয়ে আসেন – যা একটি পোকার সমান। এবং বরাহটি চারপাশে দৌড়াচ্ছিলেন; সকলের চোখের সামনে তিনি একটি বিড়ালের ন্যায় বৃহৎ হলেন। খুব তাড়াতাড়ি তিনি বাঘ অথবা সিংহের মতো বৃহৎ হলেন। তারপর তিনি হস্তীর চেয়ে বৃহৎ আকার ধারণ করেন। এরপর তিনি আকাশে উত্থিত হলেন। তিনি আরও আরও এবং আরও বৃহৎ হলেন। তারপর তিনি এতটাই বৃহৎ হলেন যে, তিনি তাঁর দন্তে পৃথিবীকে ধারণ করতে পারতেন।
হিরণ্যাক্ষ বর দান লাভের সময় এক পশুর নাম বলতে ভুলে গিয়েছিল আর তা হল বরাহ বা শুকর। পশুদের মধ্যে বরাহ বেশ শক্তিশালী। ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু ব্রহ্মার আহ্বানে বরাহ বা শুকরের রূপ ধারণ করেন। আর এটাই ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণুর বরাহ অবতার।
বরাহের মুখের সামনের দিকে দুটি বড় দাঁত থাকে। বরাহদেব ঐ দাঁত দিয়ে ভূমি দেবীকে ধারণ করে জলের উপরে তুলে ধরেন। পৃথিবী রক্ষা পায় প্রলয়ের হাত থেকে। তারপর হিরণ্যকশিপুর ভ্রাতা হিরণ্যাক্ষ ও বরাহদেবের মধ্যে একটি বড় যুদ্ধ হয়। এটি ছিল একটি দীর্ঘ যুদ্ধ।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে বরাহদেব পৃথিবীতে তাঁর চরণ রাখলেন এবং অন্য চরণ হিরণ্যাক্ষের বুকে রেখে বরাহদেব তার সামনের তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে হিরণ্যাক্ষর হৃদয় বিদীর্ণ করিয়া হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন।
এইভাবে শ্রী হরি বিষ্ণু বরাহরূপে হত্যা করলেন হিরণ্যাক্ষরূপী জয়কে। মৃতপ্রায় হিরণ্যাক্ষরূপী জয় দেখলেন তাঁর সামনে দণ্ডায়মান শ্রী হরি বিষ্ণু নারায়ণ স্বয়ং। এভাবেই মোক্ষপ্রাপ্তি হল হিরণ্যাক্ষরূপী জয়ের প্রথম জন্মে। ভক্তকে উদ্ধার করতে অবতীর্ণ হলেন ভগবান নিজে।
ইন্দ্রদেব পুনরায় স্বর্গরাজ্যের রাজা হল। চারদিকে ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণুর জয়গান ধ্বনিত হল। বরাহ রূপ ধরে ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু ভূদেবী পৃথিবীকে উদ্ধার করে এনে তাঁকে বিবাহ করেন। শ্রী হরি বিষ্ণুর দশ অবতারের তৃতীয় অবতার বরাহ এবং ভূ-দেবীর সন্তান ছিলেন নরকাসুর। ভূ-দেবীর গর্ভ হতে নরকাসুরের উদ্ভব হয়েছিল।
পরবর্তীকালে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে ও হিরণ্যাক্ষর ভ্রাতা হিরণ্যকশিপুকে বিনাশ করতে শ্রীহরি বিষ্ণুর দশ অবতারের চতুর্থ অবতার নৃসিংহদেবের আবির্ভাব ঘটে বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে।
পৃথিবীকে উদ্ধারকারী বরাহরূপে অবতীর্ণ
ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণুকে প্রণাম।
ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণুর প্রণাম মন্ত্র —
নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণ হিতায় চ।
জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ॥






