Select Language

[gtranslate]
১৪ই চৈত্র, ১৪৩২ শনিবার ( ২৮শে মার্চ, ২০২৬ )

।। স্পর্শকাতর ।।

অমিত রায় :- কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোরী একটি মেয়ে সোমা। ছোট থেকে সোমা খুব ধর্মপরায়ন। সোমা পুজা অর্চনা, উপোস, ব্রত এমনকি বিভিন্ন আচার নিয়ম কানুন মেনে ঠাকুর সেবা করতো। সোমা ধীরে ধীরে বড় হয়। তখন সোমার বাবা মা ঠিক করে যে, মেয়ে বড় হয়েছে তাই তাকে এবার বিয়ে দিতে হবে। তাই সোমার কাছে গিয়ে তার মা বাবা তার কাছে বিয়ের সম্মতি জানতে চাইলে সোমা বলে তোমরা যেটা ভালো মনে করবে সেটা করবে আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। সোমার এই কথাগুলো শুনে তার বাবা মা খুব খুশী হয়।

এরপর সোমার অভিভাবক সোমার জন্য পাত্র ঠিক করেন। পাত্রের নাম অজয়। অজয় ছিলো পেশায় একজন সরকারী চাকুরীজীবি। দুই পরিবারের মাঝে দেখাশোনা হয়। আর দুটি পরিবারের সম্মতিক্রমে বিয়ের দিন ধার্য হয়ে যথাসময়ে বিয়ের সব আয়োজন করা হলো। কনের সাজে সাজিয়ে সব নিয়ম কানুন মেনে সোমা বিয়ে হয় আর সোমা শ্বশুর বাড়ী চলে যায়। এরপর বাসর রাতের সেই কাঙ্খিত সময় এলো। বাসর ঘরে অজয় প্রবেশ করে সোমাকে বলে আমায় তোমার কি পছন্দ হয়েছে? না কি তুমি জোর করে বাবা মায়ের কথা রাখবার জন্য আমায় বিয়ে করলে! আর আমি তো অতো সুন্দর নই। তখন সোমা বললো না না তা কেন আর তুমি এমন কথা বলছো কেন আর এমন ভাবছো বা কেন! আসলে আমার মা বাবা যেটা করেছেন তারা আমার ভালো চায় আর আমার জীবনের ভালো হোক সেটা বুঝেই করেছেন। যেখানে আমারও সম্মতি ছিলো। আর পুরুষ মানুষের দর্শন সব নয় বরং তার কর্ম, তার গুন, ব্যবহার আর একটা মেয়ের উপর তার দায়িত্ব ও তার হৃদয়ের গহীনে থাকা ভালোবাসা প্রকাশ যে শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি একজন নারীর কাছে। তাই তুমি নিজেকে এতো ছোট ভেবোনা। তখন অজয় বললো সোমাকে সত্যি তোমার এমন পরিনত মানসিকতা জেনে আমি খুশী হলাম। সোমা কথা দাও তুমি আমায় ছেড়ে তুমি কখনও কোথাও যাবেনা। আর আমরা দুজনে বন্ধু হয়ে নিজেদের সকল সুখ দুঃখ সব ভাগ করে নেবো। নিজেদের মাঝে কোন কথা লুকাবোনা। সংসারের সব কষ্ট দুঃখ ভালোবাসা দিয়ে সমাধান করবো। আর তুমি মন দিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করবে আর আমার পাশে থাকবে। কথাগুলো শুনে সোমা আবেগে অজয় কে জড়িয়ে ধরে বললো হ্যাঁ কথা দিলাম আমরা আজ থেকে দুজন দুজনের সুখ দুঃখের সাথী আর তুমি আমার স্বামী তাই আজ তোমায় পেয়ে আমার নারী জীবন পূর্ন হলো।

সংসার শুরু হলো সোমার। সংসারের সব দায়িত্ব তুলে নিলো নিজের কাঁধে। যত কষ্ট হোক না কেন সংসারে সারাদিন খাটা খাটুনির পরে অজয়ের ভালোবাসা পেয়ে সোমা পেতো শান্তি। নিজেদের মাঝে ভালোবাসা এতো ছিলো যে অফিস থেকে অজয় বাড়ী ফিরেই সোমার মুখ আগে দেখবে। তারপর অজয়ের অন্য কিছুর আবদার। আর সোমাও অজয় ছাড়া কিছু বুঝতোনা। সোমা যতটা দায়িত্ববান নারী ছিলো ঠিক অভিমানিও ছিলো ততটা। কারও খারাপ ব্যবহার বা একটু কেউ জোর গলায় কথা বললে সেটি সহ্য করতে পারতোনা। বাবার ঘরে থাকাকালীন একবার সোমার বাবা কোন কারনে সোমার উপর একটু রাগ করেছিলো। যার কারনে তিন দিন সোমা অভিমান করে ঠাকুর ঘরে দরজায় খিল লাগিয়ে উপোস করে কাটিয়েছিলো। তাই সোমাকে এই জায়গায় খুব ভয় করতো তার বাবা মা। কিন্তু সোমা ছিলো অসাধারন মনের মেয়ে। মিথ্যা কথা বলা আর অশান্তি একদম পছন্দ করতোনা। রাগ হলে কারও সাথে কথা বলতোনা সোমা বরং চুপ করে তখন একা থাকতো। অজয় সোমার এই ব্যাপারটা জানতো। তাই অজয় কখনও সোমার মনে কষ্ট দিতোনা। সব সময় সোমাকে আনন্দের মাঝে রাখতো। কারন অজয় জানতো যে সোমা অভিমানী হলেও মানুষ হিসাবে সে অসাধারণ ।

এমন করে দিন চলছিলো। এরপর সোমার মেয়ে হলো। মেয়ের আদর করে নাম রাখা হলো শ্যামা। মেয়েটা দেখতে সোমার মতো হয়েছিলো। ধীরে ধীরে সোমার দায়িত্ব সংসারে আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এর মাঝেও সোমা ঈশ্বরের সেবা থেকে কখনও বিরত হতোনা। দুনিয়া এদিক ওদিক হলেও গোপালের সেবা করে সে মুখে অন্ন দিতো। যার ফলে সোমার এই অতিরিক্ত ঠাকুর সেবা করা সংসারে অনেকে ভালো চোখে দেখতোনা। সোমার উপর তার শ্বাশুড়ি একটু ক্ষুদ্ধ ছিলেন। তিনি বলতেন ঠিকাছে তুমি পুজো করো সমস্যা নেই কিন্তু এতো সময় নিয়ে ঠাকুর ঘরে থাকলে সংসারের সব কাজ যে দেরী হয়ে যায়। যার কারনে তার ছোট ছেলেটাকে রাতে খাইয়ে শুইয়ে দিতে দেরী হতো। এটা সোমার শ্বাশুড়ির পছন্দ হতোনা। বৌমাকে বলতো অজয় তোমাকে খুব ভালোবাসে বলে কিছু বলেনা। কিন্তু তোমার কথা ভেবে অজয়ের নিজের ক্ষুদা পেলেও সে মুখ ফুটে বলেনা। বৌমা এটা তো তোমার বোঝা উচিত। সোমা বলতো মা আমি ঈশ্বরের সেবা না করে তো কিছু পারবোনা। এটা আপনার ছেলেও জানে। বরং আমি আপনার ছেলেকে বলি আগে আগে খেয়ে নিতে। আপনার ছেলে আমায় ছাড়া খেতে বসবেনা আমার কি করার আছে বলুন? আমারও তো খারাপ লাগে ব্যাপারটা। শ্বাশুড়ি একটু রেগে গিয়ে বলে যা ভালো বোঝ করো।

এরপর একদিন অজয় সোমাকে বলে আমার অফিসের বস আমার বাড়ী খাবেন বলে আবদার করেছেন। তুমি কি পারবে সব ব্যবস্হা করতে! তাহলে আমি একদিন বাড়ীতে বসকে খেতে বলি। সোমা বললো অবশ্যই বলো। তোমার বস যখন আবদার করেছেন কেন পারবোনা। আমি সব ব্যবস্হা করবো তুমি বলো। এই শুনে খুব খুশি হয়ে অজয় বললো আগামী রবিবার তাহলে বসকে খেতে বলি বাড়ী। আর তাহলে তুমি সুন্দর করে বিভিন্ন রান্নার প্রস্তুতি নাও। সোমা বললো ঠিকাছে আমি সব ব্যবস্হা করছি। আর আমি কি রান্না করবো সেটা বলে দাও! তখন অজয় বললো তোমার যেগুলি ভালো লাগে সেগুলি রান্না করবে। শুধু মাথায় রাখবে ওনি আমার বস। সোমা বললো ঠিকাছে। তুমি কাল ওনাকে নিমন্ত্রন করো। এই শুনে অজয় বেরিয়ে গেলো।

অতঃপর সময় অনুযায়ী ঠিক রবিবার অজয়ের বাড়ী তার অফিসের বস এলেন। তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালো সোমা ও অজয়। এরপর খেতে দেওয়ার টেবিলে অজয় আর তার বস একসাথে খেতে বসলো। সোমা অজয়ের বসের জন্য নিজের হাতে করা খাবারগুলি আস্তে আস্তে আনতে শুরু করলো। বস বললো আজ বোধহয় দারুন ব্যবস্হা হয়েছে। তাই আমি কবজি ডুবিয়ে আজ সব খাবো। এরপর প্লেট রেডি করে প্রথমে ভাত দিতে শুরু করলো সোমা। তারপর যথারীতি বসের পাতে মুগডাল আর পাঁপড় দিলো, এরপর মোচার ঘন্ট, তখন অজয় সোমাকে বললো এরপর কি আছে! সোমা বললো আজ একাদশী তাই আমি সব খাবার সবজী দিয়ে সুন্দর করে রান্না করেছি। এই শুনে অজয়ের মুখ কালো হয়ে গেলো। অজয় বসের সামনে চুপ রইলো। সোমা এরপর আলুর দম এনে বসের পাতে দিলো। বস তখন বললো ঠিকাছে আমাকে আর দিতে হবেনা আমি চেয়ে নেবো। ওদিকে অজয় একদম গম্ভীর মুখে আস্তে আস্তে খাচ্ছে। এরপর সোমা ছানার ডালনা এনে বসকে দিলো। ওটা খাওয়ার পরে আমড়ার চাটনী দিলো। শেষে গিয়ে দই, মিষ্টি দিলো। কোন কথা না বলে বস আর অজয় চুপচাপ খেতে লাগলো। সোমা অজয়ের বসকে জিজ্ঞেস করলো রান্না কেমন হয়েছে স্যার! বস বললেন খুব সুন্দর হয়েছে অনেক দিন পরে বেশ সুন্দর নিরামিষ খাবার খেলাম। অজয় বললো স্যার আজ একাদশী তো তাই সোমা নিরামিষ করেছে জানিনা কেমন খেলেন তবুও বলি স্যার কিছু মনে করবেন না। অজয়ের বস বললো না মনে করবো কেন? সব খাবার ভালো লেগেছে। খুব সুন্দর খেয়েছি। এরপর খাওয়া দাওয়া শেষে সোমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বস চলে গেলো। বস চলে যাওয়ার পরে সোমাকে গিয়ে অজয় বললো তোমার কি কোন বুদ্ধি বা কোন কান্ডজ্ঞান নেই। যে তুমি আমার বসকে নিরামিষ খাওয়ালে। হ্যাঁ মানলাম আমি বলেছিলাম তোমার যেটা মনে চায় তাই রান্না করো। তাই বলে বাড়ীতে আসা অতিথিকে নিরামিষ খাওয়াবে। আর ওনি আমার রুটি রুজির মালিক। এই বলে খুব জোর গলায় অজয় সোমাকে রাগ করতে লাগলো। সোমা তখন বললো আজ একাদশী ছিলো তাই আমি এগুলো করেছি। আর তোমার বস যে আজকে খাবেন তা আমি কি করবো বলো? আর তোমার বস তো রান্না খেয়েও ভালো বলেছে। তখন অজয় বললো তা ওনি কি মুখের উপর বলবে যে মাছ, মাংস কেন দাওনি? মনে মনে ওনি আমার উপর খারাপ ভাবলেন। অজয় তখন বললো তোমার আজকের দিনটা একাদশী না করলে হতোনা। আর একদিন একাদশী না করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো। আর আমাকে তুমি তো একবার জিজ্ঞেস করতে পারতে? আর আজ একাদশী সেটা তো তুমি আমাকে বলতে পারতে! তাহলে আজ আমি বসকে কোন না কোন বাহানা করে কাটিয়ে দিতাম। অজয় বললো আমার সম্মান আর চাকরি থেকে কি তোমার একাদশী বড়ো হলো। এই বলে তখন সোমাকে রাগ করে অজয় বলে একটা আনকালচার, মুর্খ আর আর নির্বোধ। অজয় সোমার ঈশ্বর ভক্তি নিয়েও তখন গালিগালাজ করে। সোমা তখন বলে আমায় গালি দিলে। অজয় বলে বেশ করেছি। তোমাকে অনেক ছাড় দিয়েছি বলে তুমি যা খুশি তাই করো। আমার অনেক আগেই তোমায় কিছু বলা উচিত ছিলো। তখন সোমার শ্বাশুড়ি বলে ঠিক বলেছিস অজয়। তোর বউকে আমিও এগুলো বলেছি। কিন্তু তোর বউ তা কানে নেয়না। যার জন্য এতো ঝামেলা হচ্ছে। সোমা কথাগুলো শুনে কোন কথার উত্তর না দিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়।

সোমা মনে মনে ভাবলো যে অজয় আমায় এতো ভালোবাসে। যে আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেনা। আমার কষ্ট যার কাছে বড়। সে আমার উপর এই প্রথম রাগ করলো। আমায় সবার সামনে যা নয় তাই বললো। তাহলে আমার জীবনের কি মূল্য রইলো! এরপর সোমা ঠাকুর ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ওখানে বসে থাকলো। কিছুক্ষন পর অজয়ের রাগ কমলে যখন সোমাকে খুঁজতে শুরু করলো। তখন অজয় দেখলো ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ। সোমা ঠাকুর ঘর থেকে আর বের হচ্ছেনা। অতঃপর অজয়ের মাও সোমাকে ঠাকুর ঘরে দেখতে পেয়ে বললো বৌমা অভিমান করোনা বেরিয়ে এসো ঠাকুর ঘর থেকে। সংসারে থাকতে গেলে অনেক কিছু হয় তাই বলে তুমি ছেলেমানুষী করোনা। বেরিয়ে এসো ঠাকুর ঘর থেকে। আর ওদিকে অজয়ও অস্হির হয়ে উঠে বললো সোমা তুমি বেরিয়ে এসো। কিন্তু সোমা কোন কথা বলছেনা। একদম চুপ হয়ে আছে। এরপর অজয় ঠাকুর ঘরের দরজা নাড়ানাড়ি করেও যখন সোমা কোন কথা বলছেনা তখন ভয়ে অজয় দরজা ভেঙ্গে ফেললো। তারপর দেখলো সোমা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তখন অজয় সোমার শরীরে হাত দিয়ে দেখে সোমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। অজয়ের বুঝতে বাকী নেই সোমা আর নেই। অজয় তখন চিৎকার করে অসহায়ের মতো কাঁদছে আর বলছে হায় ঠাকুর এ কি করলে তুমি আমার! সোমাকে কেঁড়ে নিলে আমার থেকে। আসলে অজয়ের ব্যবহারে সোমা মনে খুব দুঃখ পেয়েছিলো যে ঠাকুর ঘরে কাঁদতে কাঁদতে একসময় হার্ট অ্যাটাক করে সেখানে তার মৃত্যু হয়। আর অজয়ের উপর অভিমান করে সোমা চলে যায় চিরনিদ্রায় ঈশ্বরের কাছে।



অভিমান জিনিসটা বড্ড খারাপ। নারী পুরুষের মাঝে কম বেশি সবার একটু অভিমান থাকে। কিন্তু অভিমানটা মেয়েদের মাঝে একটু বেশী হয়। মেয়েরা ওটা মনের মাঝে রাখে। অভিমান জিনিসটা মনের মাঝে পুষে না রেখে প্রকাশ করাটা উত্তম। অভিমান প্রকাশ না করে মনের মাঝে ধীরে ধীরে বাড়লে সেটা পরবর্তীতে এক সময় রাগ, ক্ষোভ আর ঘৃণায় রুপান্তরিত হয়। ফলে সম্পর্কের মাঝে অনীহা আসে। অভিমানের কারনে সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে। এমনকি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আসলে সম্পর্ক ধরে রাখতে বা সুন্দর রাখতে হলে মনে অভিমান কখনও পুষে রাখতে নেই। ওটা প্রকাশ করা উত্তম। কখনও সেটাকে হালকাভাবে দেখতে নেই। যার কারনে অজয়ের একটু খানি ভুলের খেসারত সোমাকে দিতে হলো প্রান দিয়ে। মনে কষ্ট পেয়ে সেটা সহ্য করতে না পেরে চলে গেলো সোমা পরপারে। তাই অভিমান করলে সেটাকে একটু মানিয়ে নিতে হয়। যদিও সবাই সমান হয়না। এখানে সোমা আত্মহত্যা করেনি বরং মনের অভিমানে তার জীবনের হলো অবসান। পরিশেষে জগতে স্পর্শ কাতর সম্পর্ক হারিয়ে গিয়ে সবার মাঝে মনের ভালোবাসায় প্রতিটি সম্পর্ক চিরস্হায়ী ও সুন্দর হয়ে সমাপ্তি হোক ভয়ংকর আগ্নেয়গিরির দাবানলের মতো শত অভিমান।

সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read