–বাবা গো বাবা, কী এমন বলেছি বৌমা যে তুমি এমন রে রে করে উঠলে?
–রে রে করে ওঠার তো এখনো কিছুই দেখেননি, ফের যদি…!
–ওমা গো মা, এ যে দিনে দুপুরে হুমকি দিচ্ছে গোওওও!!
–চমৎকার! আর আপনি যে দিনে দুপুরে রক্ত মাংসের মানুষের দর কষাকষি করছেন, তার বেলা কী??
পুত্রবধূ রুদ্রাণীর কথা শুনে ওর শাশুড়িমায়ের রীতিমত চোখ কপালে ওঠে। কোনোরকম সামলে বললেন,
–ছিঃ ছিঃ, দিনে দুপুরে এক্কেবারে জলজ্যান্ত মিথ্যে কথা কইছো বৌমা।
শাশুড়ির কথায় রুদ্রাণী আরো রুদ্র মূর্তি ধারণ করে।
–আমি মিথ্যে বলছি? আপনি এইমাত্র আমার ছাত্রী ঈশানীর জন্য আপনার দাদার নাতির বিয়ের প্রস্তাব দেননি? বলেননি ঐ বাড়িতে বিয়ে হলে এক্কেবারে রাজরানী হয়ে থাকবে? ওকে আর ভাবতে হবে না। বলেননি এসব?
–তা যা সত্যি তাই বলেছি। সত্যিই তো চিন্ময় আমাদের সোনার টুকরো ছেলে। ভীষণ ভীষণ ভালো। কত মোটা মাইনে পায়। আর আমার দাদা বৌদিও তাই, একেবারে মাটির মানুষ।
–বাহ খুব ভালো। তা মাটির মানুষদের রক্ত মাংসের মানুষ সইবে তো? কুমোরটুলিতে গেলে ভালো বন্দোবস্ত হয় না কি?
একটু ব্যাঙ্গাত্মক সুরে কথাগুলো বলার পর রুদ্রাণী বেশ গম্ভীর গলায় বলে,
–ঈশানী যে এত কষ্ট করে পড়াশুনো করলো – নার্সিং-ডিপ্লোমা কমপ্লিট করলো- চাকরীর জন্য চেষ্টা করছে। আর সেটা হয়েও যাবে শীঘ্রই। এই জায়গাটা তৈরির জন্য কম তো লড়াই করেনি ও। আর সেসব আপনিও জানেন। ওর মা নিজের বিয়ের হার বিক্রি করে ওকে পড়িয়েছে। ও নিজে রাতদিন টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে।
–সেই জন্যই তো চাইছি মেয়েটার একটা হিল্লে হোক। শুধু হিল্লে কেন, একেবারে রাজরানী হয়ে থাকুক।
রুদ্রাণীকে মাঝপথে থামিয়ে বলে বসলেন রাধারাণী দেবী।
–হিল্লে!! কেমন তরো হিল্লে? ও পা দুলিয়ে দুলিয়ে আয়েশ করে ভালোমন্দ খেতে পরতে পাবে – গায়ে গয়না ঝুলিয়ে হেলেদুলে চলতে পারবে, এই-ই হিল্লে তো? এত পড়াশুনোর তো তবে দরকার ছিল না। বাপ-মায়ের অর্থের শ্রাদ্ধ করে যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত স্বার্থপরের মতো নিজের আখেড়ই গোছানোতেই হয় তবে সামান্য মাধ্যমিক পাশ দিলেই চলতো। নিজের একটা পরিচিত গড়বে – ওর বাবা মাকে একটা সুন্দর জীবন দেবে, এই স্বপ্নই বরাবর দেখে এসেছে মেয়েটা। আর আজ তাকে আমি বলবো “আয় তোর একটা জবরদস্ত হিল্লে করে দিই। আয়েশ করবি আয়েশ।” এমন পাপ আমি অন্তত করতে পারবো না।
–সে কি গো? বিয়েকে তুমি পাপ বলছো?
লম্বা সুর টেনে চোখ গোলগোল করে বলেন রাধারাণী।
–আজ্ঞে না, বিয়েকে পাপ বলছি না। সে আজ যদি ঈশানী বা আমার অন্য কোনো ছাত্রী নিজে কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করে বসে, তা করতেই পারে। তাতে আমার বলা কওয়ার কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমি মরে গেলেও বলতে পারবো না ওরা নিজেদের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে একটা অলীক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নেশায় মশগুল হোক।
–অঅঅ, বিয়েটা তবে অলীক অনিশ্চিত হলো বুঝি?
–নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার চাইতেও বিয়েকে নিশ্চিত বলছেন আপনি? তা বলতেই পারেন, একথা যে যতই বলুক আমি মানতে নারাজ।
–তা তুমি মানবে কেন বৌমা! ওমন ভালো ছেলে হয় না বুঝলে, তাই বলছি…
শাশুড়ির একথা শুনে একটা বাঁকা হাসি খেলে গেল রুদ্রাণীর ঠোঁটে।
–ভালো ছেলে!! হাসালেন বটে। লোকে নিজের পেটের সন্তানের গ্যারান্টি দিতে পারে না আর আপনি কিনা অন্যের সন্তানের গ্যারান্টি কার্ড নিয়ে ঘুরছেন। মস্ত একটা চাকরী আর অঢেল পয়সা ইকুয়েল টু ভালো ছেলে। তাই তো? উফফ কী সাংঘাতিক আবিষ্কার।
–বৌমা!! বড্ড বেশি আস্পর্ধা হয়ে গেছে তোমার। বিচ্ছিরি ভাবে ঠাট্টা করছো আমার সাথে।
–ঠাট্টা? ঠাট্টা আমি আর করলুম কই। ঠাট্টা তো করছেন আপনি। একটি মেয়েকে তার বাবা মা রক্ত জল করে মানুষ করবে আর সে নিজের স্বপ্ন – পায়ের তলার মাটি সব বিকিয়ে আরেক বাড়ির শোভা বর্ধন করবে। এর চাইতেও বড় ঠাট্টা আর কী আছে!! আর আপনার ঐ সবে ধনে নীলমণি চিন্ময়বাবুর শুনেছি চাকরী ওয়ালা মেয়েতে ভারী আপত্তি। তা থাকতেই পারে, ও নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু ঈশানীর মতো মেয়ে যে চিরকাল চাকরী করার – নিজের পায়ে দাঁড়ানো – বাবা মাকে একটা স্বচ্ছল সুন্দর জীবন দেওয়ার কথা ভেবে এসেছে এবং আপনি নিজেও যখন সেটা জানেন তাহলে ঠিক কোন সমীকরণে এহেন প্রস্তাব রাখেন??
–সে যদি চাকরি নাও করে দু-একটা টিউশানি করররর্…
–ব্যাস্ !!
রাধারাণী আর তার বক্তব্য শেষ করার সুযোগ পাননা। তাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দেয় রুদ্রাণী।
–এত কিছু করলো কেবল ঐ দু চারটে টিউশনি করবে বলে? আমি টিউশনি করাকে খাটো করছি না। অবশ্যই সেটা সম্মানীয় পেশা। যেখানে আমি নিজেই একজন হোম টিউটর, সেখানে একথা বলি কোন মুখে। কিন্তু যে মেয়ে তার লক্ষ্যের এক্কেবারে দোড় গোড়ায় দাঁড়িয়ে তাকে বলবো,”ছাড় তো নার্স হওয়ার স্বপ্ন। তোর জন্য ঝা চকচকে রেডিমেড জীবনের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। সেখানে তুই ‘টাইম পাস’-এর জন্য টিউশন করতে পারিস — দু চারটে।” আর তাছাড়া ঐ দু চারটে টিউশনের টাকায় সত্যিই কি ও পারবে ওর বাবা মাকে ভালো রাখতে? আপনার দাদা বৌদি কিংবা তাদের পুত্র সহ্য করতে পারবে বাড়ির বৌ যা উপার্জন করছে তার সিংহভাগ বাপের বাড়িতে দিচ্ছে?
–ওমা সেটা ওদের সাথে কথা বলে নিতে হবে। তাছাড়া চিন্ময় বিশাল মাইনে পায়, ওকে বললেও যথেষ্টই দেবে।
–আর তা ভিক্ষিরির মতো মাসে মাসে ঈশানী হাত পেতে নেবে? মেয়ে এমন শিক্ষিত ভিক্ষিরি হবে, এমনটাই বুঝি ওর বাবা মা ভেবেছিল?
–তোমার সবেতেই বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি।
–বাড়াবাড়ির কিছু নেই। সোজা আর সহজ কথা। যে ছেলে চাকরি ওয়ালা মেয়ে বিয়ে করতেই গররাজি তার সাথে কীসের কী কথা হবে এক্ষেত্রে?
–উফফ বলেই ভুল হয়েছে আমার। বাব্বা নিজে চাকরি করো না তাতেই এত ঝাঁঝ তোমার, করলে যে কী করতে কে জানে বাপু। তাও যদি নিজের মেয়ে হতো!
রুদ্রাণী মৃদু হেসে বলে,
–এমন ঝাঁঝ চাকরি করলেই আসে না। তার জন্য ঐ মেরুদন্ডটা সোজা থাকা চাই, সরীসৃপ হলে চলে না। আর রইলো নিজের মেয়ের প্রসঙ্গ। আমার প্রতিটি ছাত্রী আমার কাছে কন্যাতুল্য। আমি নিজে যা পারিনি জীবনে ওরা পারবে। আর সেক্ষেত্রে কেউ এমন শুভ প্রস্তাব এনে উটকো উপকার করতে এলে তাকে আমার ঝাঁঝ সইবে হবে বৈকি।
তবে আপনার চিন্তা নেই আপনার ঐ চিন্ময়ের জন্য কোনো না কোনো উচ্চ শিক্ষিতা সুন্দরী পেয়েই যাবেন। এমন আজও অনেকে আছে যাদের কাছে ওসব পায়ের তলার মাটি টাটি শক্তপোক্ত করার জন্য মরিয়া হওয়া জাস্ট ননসেন্স। তার চাইতে ব্রেন্ডেড রেডিমেড জীবনের হাতছানি অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এই গোত্রীয় কাউকে না কাউকে ঠিক পেয়ে যাবেন। তাহলে আর ঈশানীর মতো মেয়েদের ঘরে তুলে বাড়তি ঝক্কি নিয়ে কাজ নেই। এরা শোপিস হওয়ার জন্য জন্মায়নি।
কথাগুলো বলে সেখান থেকে উঠে চলে যায় রুদ্রাণী। বাইরে তখন গোধূলির ম্লান সূর্য। অথচ ভেতরে বড়ই আলো। সেই আলোয় অদ্ভুত ঝলমলে হয়ে উঠছে চারিদিক।
সৌজন্যে – প্রতিলিপি






