।। সেলাই মেশিন।।
তমোঘ্ন নস্কর আগষ্ট মাস পড়লেই রুমি কাকীমাদের বাড়ির ঘড়ঘড়ে আওয়াজটা বেড়ে যেত। বুঝতাম পূজা আসছে। এইবার জোর জোর ঘুরবে; মা-বেটির সেলাই মেশিন দুটোর চাকা …
কাকু ক্যান্সারে চলে যাবার পর অনেক দেনা হয়েছিল। তার উপর দুটো পেট, দিদির পড়াশোনা। শায়া-ব্লাউজ, বেবি ফ্রকের অর্ডার নিতেন কাকীমা।
পূজার সময় রাত রাত জেগে কাজ করতেন মা-বেটি। কমিটমেন্টের দাম ছিল। বড় বাজারের বড় সাপ্লায়াররাও আসতো তাঁর টিনের এক চিলতে ঘরটাতে। নিতুদিকে গ্রাজুয়েট করেছিলেন। তারপর আধা সরকারি চাকুরে, সুদর্শন, সুকুমার দেখে নিতুদির বিয়েও দিয়েছিলেন।
ঠিকঠাকই চলছিল। তারপর এক শ্রাবণে অকালবৈশাখী উঠল। সব ভেঙেচুরে গেল। শ্বশুর বাড়ি থেকে আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে লেপ্টে নিতুদি ফিরে এসেছিল।
জামাইয়ের বাইক দিতে পারেননি, অফিস পেট্রোলের পয়সা দেয়। তাই ফ্রী-র পেট্রোলটা নিতুদির গায়েই ঢেলেছিলেন ক্লীব বীরপুঙ্গব!
কাকীমা কিন্তু কাঁদেননি, উল্টো নিথর হয়ে গিয়েছিলেন মেয়ের নিথর শরীরের মতো। মেয়ের শ্রাদ্ধ করে উঠে, মেসিনের প্যাডেলে পা রেখেছিলেন… টেনেহিঁচড়েও তোলা যায়নি।
নিতুদির মেশিনের চাকাটা তো থেমেই গিয়েছিল। মাসখানেক পর কাকীমার মেসিনটাও থেমে গেল। অনেক বেলাতেও দরজা খোলেন না দেখে, ভাঙা হল দরজা। মেশিনের টেবিলেই মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন কাকীমা। নাক থেকে বেরিয়ে জমেছিল দুফোঁটা কালচে রক্ত। ম্যাসিভ হার্টএটাক অথচ মুখে এতটুকু যন্ত্রণার ছাপ নেই।
বুড়ো ডাক্তার বাবুও ভারি হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নিতু(মেয়ে) ডেকে নিল রুমিদিকে, তাই কষ্ট হয়নি…
বহুবছর ঘড়ঘড় শুনি না, ভুলেই গেছি। কেবল পূজা একা একা আসে যায়। বন্ধ ঝুরঝুরে, পোড়ো ঘরটাকে পাশ কাটাই আর মাঝেমধ্যে ভাবি যদি কোনও অলৌকিক হয়… যদি আবার চাকাটা চালু হয়… তাহলে কী ভয় পাব? কী জানি…
বই- পান্থপাদপ
প্রকাশক- শব্দ প্রকাশন





