Select Language

[gtranslate]
১৫ই চৈত্র, ১৪৩২ রবিবার ( ২৯শে মার্চ, ২০২৬ )

গর্ভজাত

গৌতম নারায়ণ দেব:-সেই পনেরো বছর আগে কবে শেষবার ট্রেনে চেপে বেড়াতে গেছিলেন বিভাদেবী! স্বামীর সাথে পুরীতে। তারপরে গত দশ বছরের বৈধব্যে কোথাও আর বেড়াতে যাওয়ার কোন সুযোগ আসে নি ওনার জীবনে। তাই ছেলে যখন বলল “মা,সামনের মাসে তোমাকে বেনারস নিয়ে যাবো,তখন পচাত্তর বয়সের বৃদ্ধার সে কী আনন্দ।
“সত্যি আমায় নিয়ে যাবি? কতদিন ধরে আমার যে একটু ওখানে যাওয়ার ইচ্ছে, বাবার শরীরটাকে একটু স্পর্শ করবো,তা আর হয়ে উঠছে না। আমি যে তোকে কী বলে আশীর্বাদ করবো বাবা!” এইভাবে নিজের তৃপ্তি প্রকাশ করে একটু থেমে চারপাশটা দেখে নিয়ে ছেলের কানের কাছে আস্তে করে বললেন,”বউমা আবার কিছু বলবে না তো তোকে?”
-“না,না, তোমার বউমাই তো বলল তোমাকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে। ও কেন রাগ করতে যাবে? তবে এখন পাঁচ কান করতে যেও না। আবার যদি কোন বাধা-টাধা চলে আসে।”

ছেলের এই বারণ আর কে শোনে? কতদিন পরে একটা সুযোগ এসেছে একটু পুণ্যি করার, তা কি কাউকে না জানিয়ে পারা যায়? এক সপ্তাহের মধ্যেই পাশের বাড়ীর গোপালের মা’কে বলাও হয়ে গেল। তারপরে তো আছে পেটের মেয়ে সুলেখা, যাকে আবার কিছু না জানিয়ে উনি একদিনও থাকতে পারেন না। অবশ্য মেয়েকে সব খবর জানাতে হয় ভালোবাসার টানেই। একমাত্র ও-ই তো এখন ওনার খোঁজখবরটা রাখে, ভালোমন্দের কথা ভাবে। আবার সুলেখাকেও মায়ের খোঁজখবরটা রাখতে হয় সম্পূর্ণ দুশ্চিন্তার কারণেই। কারণ দাদা-বৌদির কাছে মা যে কতখানি সুখে-শান্তিতে থাকে, তা একমাত্র ও-ই জানে। বিভাদেবীর শরীরে বার্ধক্য আসলেও চিন্তা-চেতনায় এখনও তার কোন ছাপ পড়েনি। উনি ভালোই বুঝতে পারেন অবহেলা জিনিসটা যে কী বিষম বস্তু।
*************
মায়ের থেকে তো সুলেখা আগেই জেনেছিল বেনারস থেকে মা কবে নাগাদ ফিরবেন। তাই নির্দিষ্ট দিনেই দাদাকে ফোন করল সুলেখা। মায়ের খবর নিতে। কিন্তু, বারংবার ফোন করলেও সেই সময় কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছিল না দাদাকে। শুধুই বলছে ‘নট রিচেবল’। এর ফলে সুলেখার মধ্যে অস্থিরতাটা যেন ক্রমেই বাড়তে লাগল।” কিছু আবার হল নাকি?” খারাপ চিন্তাটাই তো প্রথমে ভীড় করে মানুষের মনে। সন্ধ্যেবেলায় ও আবার ফোন করল। হ্যাঁ, এবারে দাদার ফোনটা পেল ঠিকই,তবে খুবই খারাপ একটা খবর। ওই মুহূর্তে সুলেখার মনে হল মাথায় যেন একটা গোটা আকাশটাই ভেঙে পড়ল। বেনারসে মা’কে খুঁজে না পেয়ে দাদা একা একাই বাড়ী ফিরে এসেছে। খবরটা শোনামাত্রই কান্নার সাথে সাথে ওর হাত-পা’টাও যেন ঠান্ডা হযে যাওয়ার উপক্রম হল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শেষে ফোনটা কেটে দিয়ে মাটিতেই বসে পড়ে একমনে চিন্তা করতে লাগল মায়ের কথা। ‘এই বয়সে এসে এটাও ছিল মায়ের কপালে’- সেই কথাটাই কেবল ভাবছিল সুলেখা। যাই হোক, একটু ধাতস্থ হওয়ার পর দাদার ভরসায় না থেকে নিজেই থানায় গিয়ে একটা মিসিং ডায়েরিও করে আসল।

সপ্তাহ খানেক বাদে এক ভদ্রলোক সুলেখাদের বাড়ীতে দেখা করতে এলেন। নিজেকে একজন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,”বিভাদেবী আপনার কে হন?”

-” উনি তো আমার মা। কেন বলুন তো?”

-“হ্যাঁ, দিন দশেক আগে বেনারস স্টেশন থেকে আমরা ওনার দেখা পাই। তা উনি অসুস্থ ছিলেন বলে এতদিন ওনার ব্যক্তিগত তথ্যাদি সেরকমভাবে আমরা জোগাড় করতে পারিনি। এখন একটু সুস্থ হওয়াতে ওনার থেকে আমরা সব জানার চেষ্টা করি। আপনার মোবাইল নাম্বারটা উনি বলতে না পারলেও আপনার বাড়ীর লোকেশনটা মোটামুটি বলতে পেরেছেন বলেই আজ আমি এখানে আসতে পারলাম। এই কার্ডটা রাখুন আপনার কাছে। বেনারসে গিয়ে কার্ডে উল্লিখিত জায়গায় গিয়ে দেখা করলে আপনি বিশদে সব জানতে পারবেন এবং আপনার মাকেও ফেরৎ নিয়ে আসতে পারবেন। দরকার হলে আপনি ফোনে মায়ের সাথে আগে কথা বলেও নিতে পারেন।”

“-দাদা, আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো!”

-“না,না,ঠিক আছে।”
************
ওখানে গিয়ে সুলেখা যেটা জানতে পারলো, তা যে কোন সুস্থ মানুষের কল্পনাতেও আসবে না, এই বিষয়ে ও একপ্রকার নিশ্চিত। কোন ছেলে যে তাঁর নিজের গর্ভধারিনীকে এইভাবে অবহেলার আস্তাকুঁড়ে এইরকম অবলীলায় ফেলে আসতে পারে, তা ভাবলেও যেন শিউরে উঠতে হয়। বিভাদেবী নিজের মুখেই যখন শোনাচ্ছিলেন ওই অভিশপ্ত দিনটার ধারাবিবরণী, সুলেখার দুচোখ বেয়ে একটার পর আরেকটা অশ্রুবিন্দু সমানেই ঝরে পড়ে যাচ্ছিল।
“ট্রেন ছাড়ার অনেকক্ষণ বাদেও অনেক ডাকাডাকি করেও যখন বিকাশকে পেলাম না, ভয়ে আমার তো কান্নাই পেয়ে গেল। ভাবলাম, ছেলেটার আবার খারাপ কিছু হল না তো? আশপাশের যাত্রীরা তখন আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। আমার প্রতি খুব নজর রাখছিলেন ওনারা। তারপর বেনারস স্টেশনে নেমে এক ভদ্রলোক যখন ফোন করে এই সংস্থায় খবর দিলেন, এনারাই আমায় এখানে নিয়ে আনলেন। এনাদের সেবা-শুশ্রুষায় আজ আমি অনেক ভালো আছি রে।”

হ্যাঁ,এখন হয়তো বৃদ্ধা শারীরিকভাবে সুস্থই আছেন, কিন্তু মনের ভিতরটা যে ওনার এখনও তোলপাড় করছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজের সন্তানের থেকে এমন আঘাত উনি কি কোনদিনও ভেবেছিলেন না কি তা ভাবা যায়?

বাড়ীতে ফিরে সুলেখা যে থানায় মিসিং ডায়েরিটা করেছিল, সেখানেই সমস্ত কিছু বিশদে জানাল, মায়ের বারণ সত্ত্বেও। ছেলের শাস্তি হয়তো মা চান না, কিন্তু মানবিকতার ওপর এর’ম অমানবিক আঘাত সহ্য করাটাও এক ধরনের অপরাধ। সুলেখা অন্তত সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি চেয়েছিল।

মা ও ছেলের দুজনেরই আস্তানা এখন পরিবর্তিত। মায়ের বর্তমান আবাসস্থল মেয়ের বাড়ী, আর ছেলের হল শ্রীঘর।



সৌজন্যে – প্রতিলিপি

Related News

Also Read