তন্বী চ্যাটার্জি:-দুপুরে খাওয়াদাওয়া করার পর সবেমাত্র ছেলেকে নিয়ে একটু শুয়েছে রূপসা। প্রচণ্ড গরম বলে দরজা জানলা খুলেই রেখেছে ও। পাশের ঘরে শ্বশুর শাশুড়ি শুয়ে আছেন। শ্বশুর মশাই রিটায়ার করেছেন, শাশুড়ি মায়ের এখনো রিটায়ারমেন্টের বয়স হয় নি অর্থাৎ বেশ শক্ত সমর্থ রয়েছেন। সংসারের পুরো দায়িত্ব এখনো পর্যন্ত ভীষন সুন্দর ভাবে পালন করে যাচ্ছেন তিনি।রূপসার উপর তাই বিশেষ চাপ পড়ে নি এখনো।
তন্দ্রাটা সবে এসেছে, হঠাৎ শাশুড়ি মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। শোনে, শাশুড়ি মা বলছেন,”আসছি দাদা। দাঁড়াও”।দরজা খোলার শব্দ পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে গেল রূপসা।দেখে,মা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন আর বলছেন,”কোথায় গেল দাদা? আমি যে বললাম আসছি”। রূপসা বললো,”কি বলছো তুমি? কোথায় মামা? তুমি ভুল শুনেছো। মামা কি করে আসবেন?”
“না, আমি ঠিক শুনেছি।ওটা দাদার গলার আওয়াজই ছিল। এতো বড়ো ভুল আমি করতেই পারি না।”শাশুড়ি মায়ের বক্তব্য।
কিন্তু রূপসা জানে এটা মায়ের ভুল, কারণ প্রায় মাসখানেক আগে মামা মারা গেছেন। একমাত্র বোন কে ভীষন ভালোবাসতেন উনি। তাই হয়তো মা এখনো মামার মৃত্যু টা মেনে নিতে পারেন নি।
অনেক কষ্টে মাকে বুঝিয়ে ঘরে পাঠালো রূপসা। শ্বশুর মশাইয়ের কপালে সামান্য চিন্তার ভাঁজ দেখে আশ্বস্ত করলো তাঁকে। সেদিনের মত মিটে গেল ব্যাপার টা। সন্ধ্যেবেলা সুমিত অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর পুরো ঘটনাটা বললো রূপসা।
সুমিত কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিলো না ব্যাপারটাকে।মা ও ততক্ষণে পুরোপুরি স্বাভাবিক। নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতে গেলো সকলেই।
সমস্যা দেখা দিলো পরদিন দুপুর থেকে। বাড়িতে যথারীতি ওরা চারজন। শ্বশুর,শাশুড়ি,রূপসা আর ওর দেড় বছরের ছেলে।সুমিত অফিসে গেছে, যাওয়ার আগে অবশ্য বারবার বলে গেছে মায়ের দিকে খেয়াল রাখতে। সকাল থেকে সব ঠিক ছিল, হঠাৎ করেই রূপসা লক্ষ্য করলো মায়ের চোখেমুখে অস্বাভাবিক একটা কিছু অভিব্যক্তি।
মায়ের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে যে মা কাউকে চিনতে পারছেন না। অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। বিকেলের পর থেকে আবার নতুন উপসর্গ দেখা দিলো। সুমিতের ছোটবেলায় চলে গেছেন উনি। কিছুতেই তাঁকে বিশ্বাস করানো যাচ্ছিলো না যে সুমিত এখন আর ছোট নেই। রূপসাকে তো চিনতেই পারছেন না আর সবচেয়ে বড় কথা হলো যে নাতি তাঁর প্রাণ,সেই নাতিকে পর্যন্ত চিনতে পারছেন না। বারবার বলে চলেছেন,”ঐ বাচ্চাটা কে?ও আমার সমুর সব খেলনা নিয়ে নেবে। যেতে বলো এখান থেকে।”
কিছুতেই ধরে রাখা যাচ্ছে না তাঁকে, গায়ে যেন অমানুষিক শক্তি ভর করেছে।
মাঝেমধ্যেই চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সেই সময়ে প্রচণ্ডভাবে হাত পা ছুঁড়ছেন। খুব চীৎকার চেঁচামেচি করছেন।বেশ খানিকক্ষণ এরকম অসহায় একটা পরিস্থিতিতে থাকার পর রূপসা সুমিত কে ফোন করার সিদ্ধান্ত নিলো।
কিন্তু তারপরেই চিন্তা করলো সুমিতকে এখন টেনশন দিলে ওরই বিপদ। রূপসার একমাত্র ননদ শাশ্বতী কাছাকাছিই থাকে, ওকে ফোন করলো অবশেষে।সমস্ত ঘটনা সবিস্তারে জানিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে বললো রূপসা। ততক্ষণে শ্বশুর মশাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন শাশুড়ি মা কে হসপিটালে নিয়ে যাবার। সত্যিই, এছাড়া আর কোনো সমাধান রূপসারও মাথায় আসছে না।কিছুক্ষণের মধ্যেই ননদ শাশ্বতী এসে হাজির।
মাকে দেখে প্রথমে ভীষন ভেঙ্গে পড়লো শাশ্বতী, কিন্তু খানিকক্ষণ পর একটু স্থির হয়ে রূপসাকে বললো”বৌমণি,যা শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে না হসপিটালে নিয়ে গিয়ে কোনো লাভ হবে। মায়ের শরীর এমনিতে ঠিকই আছে কিন্তু কোনোরকম ভাবে মামার আত্মা মায়ের শরীরের মধ্যে ঢুকে গেছে।”কথাটা শুনে রূপসা হতভম্ব।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে লেখাপড়া জানা একটা মেয়ে যে এরকম ধরনের কথা বলতে পারে সেটা ভেবেই রূপসা অবাক হয়ে যাচ্ছে।ওর শ্বশুরমশাই এর বেশ বয়স হয়েছে, প্রায় সত্তরের কোঠায়। তিনি এই সব কুসংস্কার একদম মানেন না অথচ তাঁর মেয়ে হয়ে শাশ্বতী এই কথা বলছে?
শাশ্বতী বললো,”তুমি আমাকে আজকের রাতটুকু সময় দাও বৌমণি, আগামীকালের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।।”ওর কথা শুনে রূপসা বললো,”সেসব ঠিক আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে মাকে শান্ত করা খুব জরুরি আর তারজন্য একজন ডক্টরের প্রয়োজন। আগে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”
“হ্যাঁ, দাঁড়াও। এক্ষুনি ডক্টরকে ফোন করছি।”এই বলে শাশ্বতী ওর ফোন থেকে ডক্টর কে ফোন করে। খানিকক্ষণের মধ্যে ডক্টর আসেন, উনি এসে রোগীকে দেখে আপৎকালীন চিকিৎসা করে বললেন খুব তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে নাহলে বেশ চাপের ব্যাপার হয়ে যেতে পারে।
ইতিমধ্যে সুমিতও বাড়ি ফিরে এসেছে, সবটুকু শুনে প্রচণ্ড রাগ করলো ওকে কিছু জানানো হয়নি বলে। তবে ডাক্তার দেখানো হয়েছে জেনে একটু আশ্বস্ত হয়েছে।
ওষুধের প্রভাবেই হোক বা অন্য কোনো কারণে রাতটুকু আর কোনো রকম সমস্যায় পড়তে হয় নি ওদের।
পরদিন ভোরবেলা শাশ্বতী এসে হাজির।ওর চেনাজানা কে একজন আছেন যিনি ঝাড়ফুঁক করেন তাঁর কাছে মাকে নিয়ে যাবে। রূপসা সত্যিই ভাবে নি শাশ্বতীর মধ্যে এতো অন্ধ বিশ্বাস কাজ করছে। কিন্তু রূপসা কিছু বলতেও পারছে না,শত হলেও ওর মা। তবে ঠিক করলো মাকে শাশ্বতীর সাথে একলা ছাড়বে না,ও সঙ্গে যাবে।
গতকালের তুলনায় সকালে অনেক টা সুস্থ বোধ করছেন শাশুড়ি মা, সেটা দেখে রূপসা একবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু শাশ্বতী নিয়ে যাবেই মাকে ওর চেনাজানা ওঝার কাছে। বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কাছাকাছির মধ্যে যে এরকম ধরনের কার্যকলাপ হয় সেটা রূপসার জানা ছিল না। প্রচণ্ড কৌতুহল হতে লাগলো ওর। অনেক কিছু শুনেছে এদের বিষয়ে, আজকে প্রত্যক্ষ একটা অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।
খুব উত্তেজিত রূপসা,দেখলো কিসব ওষুধ দিয়ে ঢাউস আকৃতির একটা মাদুলি তৈরী করে দিলো,অদ্ভুত উচ্চারণে কিছু মন্ত্র বলে মাথায় বিশাল বড়ো একটা পাখা দিয়ে হাওয়া করে তিনবার ঠুকে দিলো আর বললো মাদুলি টা পরে থাকতে হবে, তাহলে আর কোনো সমস্যা হবে না।
সবশেষে পাঁচশো টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিলো শাশ্বতী ভদ্রলোকের হাতে।
ওটা ওনার মিনিমাম চার্জ,শাশ্বতীর সাথে চেনাজানা আছে বলে অন্যদের থেকে কমই নাকি নিলেন। রূপসা সবটুকু শুধু দেখলো, কোনো মন্তব্য করলো না।
মাদুলি পরারও নিয়মকানুন আছে, বাড়িতে ফিরে সেসব পালন করে মাদুলি টা শাশ্বতীই পরিয়ে দিলো মায়ের হাতে।
রূপসা কিন্তু মাকে ওষুধ দেওয়া বন্ধ করে নি।দিন তিনেকের ওষুধ দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু, বলেছিলেন ওষুধ টা খাওয়ার পর কেমন থাকেন সেটা জানাতে। সেদিনের পর থেকে আর কোনো গণ্ডগোল হয় নি। রূপসা ভাবছে ওষুধ টা কাজে দিয়েছে আর শাশ্বতী ভাবছে মাদুলি টা কাজ করছে।
এরপর হঠাৎ দিন পাঁচেক পর আবার মায়ের আগের দিনের মত অবস্থা।
এবার অতোটা বাড়াবাড়ি না হলেও দেখা গেল খাওয়ার ইচ্ছে একদম চলে গেছে। জোর করে খাওয়ানো হচ্ছে আর তারপরেই সেটা বমি হয়ে যাচ্ছে।যা খাচ্ছে তাই বমি হয়ে যাচ্ছে।আর সেইসঙ্গে কাউকে চিনতে না পারা বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলো আবার। তখন দ্বিতীয়বার না ভেবে সোজা হসপিটালে ভর্তি করা হলো মাকে। ডাক্তার বাবু আগে স্যালাইনের ব্যবস্থা করলেন, এরপর অনেক গুলো পরীক্ষা করতে দিলেন রক্তের। রিপোর্ট গুলো এলে চিকিৎসা ঠিকঠাক শুরু করতে পারবেন তিনি।
সকালে ভর্তি করা হয়েছিল মাকে, সারাদিন ধরে বমি করে শরীরের সব শক্তি তখন নিঃশেষ। স্যালাইন দেওয়ার পর বিকেলে দেখা গেল অনেকটাই সুস্থ উনি। তবে তখনো কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে আসেন নি।সারা রাত সুমিত আর শাশ্বতীর বর হসপিটালে থাকলো। সুমিতের বাবাও থাকতে চাইছিলেন কিন্তু জোর করে তাঁকে শাশ্বতীর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলো সুমিত।
এদিকে রূপসা বাড়িতে রয়ে গেছে ছেলেকে নিয়ে।কোনো খবর পাচ্ছে না মায়ের,চিন্তায় চিন্তায় ওর মাথা খারাপ হবার জোগাড়। শেষে সন্ধ্যেবেলা শাশ্বতী আর ওর শ্বশুরমশাই ফিরে এসে মায়ের সুস্থতার খবর দিতে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো। তবে আরো কয়েকটা দিন হসপিটালে থাকতে হবে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য। পরদিন সকালে সুমিত বাড়ি ফিরে জানালো মা এখন অনেক সুস্থ।সুমিতকে দেখতে পেয়েই খেতে চেয়েছিলেন কিন্তু তখনো স্যালাইন চলছে তাই সলিড কিছু খাবার দেওয়া যাবে না, ডাক্তারের বারণ।
প্রায় উনিশ-কুড়ি বোতল স্যালাইন দেওয়া হয়েছে মাকে।স্যালাইন দেওয়া শেষ হয়ে গেলে হসপিটাল থেকেই হালকা কিছু খাবার দেওয়া হবে মাকে।এই কথাটা শুনে রূপসার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, মানুষটার খিদে পেয়েছে অথচ এখন খেতে পারবে না। কয়েকটা দিন প্রায় না খেয়েই ছিলেন মা। কিন্তু ডাক্তারের কথা তো শুনতেই হবে,যা কষ্ট পেলেন উনি।
রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট গুলো এলে দেখা গেল মায়ের শরীরে সোডিয়াম পটাশিয়াম এর লেভেল অনেক খানি কমে গেছে যার জন্য এই সব সমস্যা।
সাধারণত সোডিয়াম আর পটাশিয়ামের ব্যালেন্স ঠিক না থাকলে বা লেভেল কমে গেলে মানুষ সবসময় ভাবে কেউ তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।একা থাকতে ভয় পায়, কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে যায় এবং অনেক সময়ে স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। সুমিত ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে এসব জানতে পারে।রূপসাকে এসে কথাগুলো বলতেই ও বললো,”দাঁড়াও, শাশ্বতী কে কথাগুলো জানানো দরকার।
ওর মধ্যে যে কুসংস্কার গুলো দানা বেঁধে উঠেছে সেগুলো সময় থাকতেই নির্মূল করতে হবে, নাহলে সাংঘাতিক বিপদ হবে। যদিও অল্পক্ষণের জন্য হলেও আমিও ভেবেছিলাম হয়তো ঐ ঝাড়ফুঁকের কারণে মা সুস্থ হয়ে উঠছেন তবু শাশ্বতীর মতো ডাক্তারের উপর থেকে ভরসা হারাই নি।”
শাশ্বতী কে ফোন করে ডাকলো সুমিত।শাশ্বতীও খুব দুশ্চিন্তায় ছিল মাকে নিয়ে। হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করেছে দাদার সঙ্গে।এখন মা অনেকটা সুস্থ আছেন দেখে ও নিজেও চিন্তামুক্ত। তবে রক্তের রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু জানে না এখনো।
তাই সুমিত ডাকতেই ও হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো বাপের বাড়িতে।সব শুনে চুপ করে বসে রইলো শাশ্বতী। কিছুক্ষণ পর কাঁদতে কাঁদতে বললো,”আমায় ক্ষমা করে দে তোরা, আমার জন্য যদি মায়ের কিছু হয়ে যেতো আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না। তবে আর কক্ষনো এরকম কাজ করবো না। সত্যিই তো,বাবা বয়স্ক একজন মানুষ হয়ে এসব বিশ্বাস করেন না আর আমি এখনকার মেয়ে হয়ে কি করে এরকম একটা কাজ করতে পারলাম?”রূপসা আর সুমিত ওকে জড়িয়ে ধরলো,যতোই বিয়ে হয়ে যাক এখনো যেন সেই ছোট্টটিই আছে শাশ্বতী।
শাশুড়ি মা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন। এখন আর সেই ভয় পাওয়ার ব্যাপার টা নেই, নাতিকে কাছে টেনে নিয়েছেন আবার আগের মতো।
সবাই নিশ্চিন্ত হয়েছে।শুধু মায়ের জন্য নয়,শাশ্বতী যে ওর ভুল বুঝতে পেরে এতোদিন বুকের মধ্যে লালন করা কুসংস্কার গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে তার জন্যও।
সৌজন্যে প্রতিলিপি






