মৌসুমী ব্যানার্জি-বোবাকান্না
মাকে দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গেল পাখির। কার সঙ্গে জানি কথা বলছে হেসে হেসে। ওহ সেইজন্যই! সেজন্যই এতক্ষণ পাচ্ছিলই না মাকে ফোনে। বাবাও বলল একই কথা। কিন্তু সেতো দুপুর বেলা। আর পাখি চেষ্টা করেছিল কলেজ থেকে বেরোনোর আগে আগে। ছ’টা হবে হয়ত। তার মানে এতক্ষণ ধরে ফোন কথা বলছে মা! এত খোশ গল্প? কার সাথে?
তেমন কোনো তো বন্ধু নেই মায়ের! নিজের নিয়েই থাকে। আর যারা আছে তাদের খুব ভালো মতই জানে, চেনে পাখি। ওই তো মানি আন্টি, মায়ের কলেজের বেস্ট ফ্রেন্ড পিউ আন্টি আর সাকুল্যে দু চারজন। তাহলে এ কে, যার সঙ্গে এত কথা বলছে মা? আজই বলছে, নাকি রোজই বলে? আজকাল অবশ্য মোবাইলে খুব ব্যস্ত থাকে মা। ফেসবুক করে। অনেক বন্ধু হয়েছে ফেসবুকে। তারাই কেউ? কদিনেই এত বন্ধু হয়ে গেছে তারা? একের পর এক প্রশ্নরা উত্তরহীন অস্থিরতায় হুড়োহুড়ি করে পাখির মনে।
এক অদ্ভুত দোটানা চলে পাখির ভেতর ভেতর। একেকবার মনে হয়, এতে এত ওভার রিএক্ট করার কি আছে? হ্যাঁ হয়েছে বন্ধু। সে যেই হোক, হতেই তো পারে। একটা মানুষ তার মনের কথা কাউকে না কাউকে তো বলবে। মনের মধ্যে এত শব্দ জমিয়ে কি বাঁচতে পারে মানুষ?
বাবাকে যতদূর চিনেছে পাখি, মানুষটা আর পাঁচজনের সঙ্গে যেমন, মায়ের সঙ্গে ঠিক তার উল্টো। হাতে গুনে কটা কেজো কথা। না বললেই নয় যখন। মাও কেমন যেন গুটিয়েই রাখে নিজেকে বাবার সামনে। অকারণেই গম্ভীর। রোবটের মত কর্তব্য করে। খুব প্রয়োজন হলেই কথা বলে, নইলে হ্যাঁ, হু আর ঘাড় হেলিয়েই কাজ সারে। মায়ের কি কিছুই বলার থাকে না বাবাকে? নাকি বাবারও কিছু জানার থাকে না, সারা দিন কি করেছে মানুষটা? এতো যান্ত্রিক সম্পর্ক কেন এদের? অথচ ওর বন্ধু শ্রীময়ীর বাবা মা ত, একে অপরের ঠিক বন্ধু যেন। দেখে মনে হয় কত সুখী আঙ্কেল আন্টি দুজনেই। যেন আলাদাই একটা পৃথিবী আছে ওদের নিজস্ব। দুঃখের সেখানে নো এন্ট্রি!
পাখির ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কুলোয় না মাকে কি করে জিজ্ঞেস করবে, কে সেই মানুষ, যার সঙ্গে কথা বলে এত সুখ পায় মা? এত প্রাণ খুলে হাসে হো হো করে? শুধু এটুকু বোঝে, আজকাল বেশ অন্যমনস্ক থাকে মা। কি সব জানি লেখে পুরোনো ডায়েরিতে, সবার নজর বাঁচিয়ে। আচ্ছা মায়ের যদি সত্যি একটা ভালো বন্ধু হয় তাহলে ক্ষতি কি? মন ভালো থাকবে, আর এই নিয়ে জিজ্ঞেস করতে যাবেই বা কেন পাখি! রাগই বা করবে কেন অকারণে? মাও তো মানুষ!
পাখিকে অবাক করে পরমাই একদিন বলল মেয়েকে, আচ্ছা বল তো, কেমন মানুষকে জীবনসঙ্গী করতে চাস তুই? পাখি একটুও চিন্তা না করে হাসতে হাসতে বলল, শাহরুখ খান। শুনে তো হেসে বাঁচে না পরমা। ভাবে, গায়ে হাত পায়ে বড় হলে হবেটা কি, মেয়েটা এখনো সেই ছোট্টটিই আছে।
ধুর বোকা মেয়ে, শাহরুখ খানকে তুই কতটুকু চিনিস জানিস? জীবন সঙ্গী মানে একটা গোটা জীবন তার সাথে সুখের দুখের ভাগীদার হয়ে কাটানো। সোজা কাজ নয় কিন্তু মোটে। ভুল মানুষ বাছলে সারা জীবনের কষ্ট। বোবা কান্না কাঁদতে হয় নীরবে। আর ঠিক মানুষ বাছলে, এক জন্ম কম পড়ে যায়, সাথে থাকার জন্য। মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে পরমা। একটু বুঝি বা উদাস গলায়।
মায়ের সাথে এত খোলামেলা কথা কতদিন যে হয়নি পাখির। কতদিন পরে মাকে এমন করে হাসতে দেখল। সাহস করে সেও জিজ্ঞেস করে তাই, তোমার কেমন মানুষ পছন্দ মা? বাবার মতো নয় নিশ্চই। তবে কার মত? বলো না মা?
তোর বাবা মানুষ খারাপ না রে পাখি। শুধু সমস্যা হল আমরা কেউই একে অন্যের জন্য নই আসলে। আমাদের মধ্যে কোনো ন্যূনতম কমন ইন্টারেস্ট নেই। আমার যা যা ভালো লাগে ওর বেজায় অপছন্দ। প্রকৃতি ভালো বাসে সে, তবে এডভেঞ্চার নয়। খেতে ভালোবাসে খুব। খাওয়ার পরে একটা কমপ্লিমেন্ট দিতেই ভুলে যায় শুধু। মনেই থাকে না যে মানুষটা এত খেটে খুটে বানালো সেটা, তারও কিছু আশা থাকে। আসলে কি বলতো, তোর বাবা জানেই না দুবেলা পেট ভরে খাওয়া, মাথা গোঁজার একটা নিশ্চিন্ত ঠিকানা আর পরনের বস্ত্র জোটাবার পরেও যেটা চায় কেউ কেউ, সেটা শুধুই তার আত্মার ভালো থাকার জন্য। দিনের পর দিন সমঝোতা করতে করতে আত্মা বিদ্রোহী হয়।
আমারও আজকাল দমবন্ধ লাগত জানিস। মনে হত একটা খোলা জানলা চাই মনের ঘরে রোদ আলো হাওয়া নিয়ে আসার জন্য। তারই খোঁজ দিল সে। অনেকদিন পরে খুঁজে পেলাম সেই মানুষটাকে, যে বাঁচতে শেখাল আমায় নতুন করে। দ্যাখ এগুলো। ডায়েরির পাতা উল্টে উল্টে মেয়েকে দেখায় পরমা।
এই এত গল্প কবিতা? কখন লিখলে এত মা? অবাক স্বরে বলে পাখি। পরমা একটু হাসে শুধু। বলে সে আমি নিজেও জানি না জানিস। শুধু এটুকু বলতে পারি, দিনের পর দিন আমার হাবি জাবি লেখা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছে তীর্থ। গর্ব করে বলেছে, কে বলেছে খারাপ লেখো! অনেকের থেকে অনেক ভালো লেখ তুমি। ওইটুকু কথায় যে কত জোর কে জানত! আমি ঘাড় গুঁজে লিখে গেছি পাতার পর পাতা। আর ও পড়ে বলেছে, তাহলে?এবার বলো, ভালো আছো তো এখন? খারাপ থাকলে তোমার মুখটা একেবারে পেঁচির মত লাগে….
এমন একটা মানুষকেই হয়ত জীবন সঙ্গী হিসেবে চাইবে সব মেয়েরা। থেমে থেমে বলল পরমা। যেন পাঁজরের ভাঁজ থেকে বার হল কোনো অব্যক্ত কথামালা, মনের গভীরে চিরনির্বাসিত থাকাই নিয়তি ছিল যাদের।
তীর্থ আঙ্কেলের কথা সবই বলল সেদিন মা। খুব ভালো বন্ধু ছিল মায়ের। কদিন পরে দুজনেই বুঝল, ঠিক বন্ধু নয়, বন্ধুর চেয়েও আরেকটু বেশি কিছু মনে হয় ওদের, একে অন্যকে। এক সাথে থাকতে ভালো লাগে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করতে ইচ্ছে করে হাবি জাবি যাহোক কিছু নিয়েই। দুজনের পছন্দ গুলোও যেন একই রকম অনেকটা। আর যেটুকু আলাদা, সেটুকুও সন্মান করে দুজনেই। একে অন্যের কথা শোনে মন দিয়ে।
কিন্তু এত কিছু সত্বেও গল্পটা অন্তমিলের হয় না শেষ বেশ। বাবার এন্ট্রি হয় ক্লাইম্যক্সে আর শুরু হয় আর একটা নতুন গল্প। এই পর্যন্ত মায়ের মুখেই জানা হয়েছে পাখির। বাকিটা জানবার জন্য সেই মানুষটাকেই একদিন ফোন ঘোরায় পাখি।
তীর্থ আঙ্কেল শুনে হাসে মুচকি মুচকি। বলে পারোর মেয়েটাও দেখি মায়েরই জুড়িদার। ছোটবেলায় তোর মতই অবুঝ ছিল তোর মা। এমন এমন সব আবদার জুড়ত মাঝে মাঝে! আরে বাবা, আমার মনের কথা এখন জেনে হবেটা কি বল? যা আছে তা থাক না মনেই। জীবন এগিয়ে চলুক নিজের ছন্দে। তোর মা কিন্তু এখন বেশ ভালো আছে রে পাখি। মনের কথা কলমে ব্যক্ত করে। আজকাল বেশ জ্বলজ্বল করে ওর মুখটা। দেখেছিস? আমি শুধু সেটাই চেয়েছিলাম মন থেকে। সব অঙ্কে তো ভাগশেষ শূন্য হয় না, বল। আমাদের অঙ্কটাও ওরকমই। হাসতে হাসতে বলে আঙ্কেল।
অনেকদিন পরে মায়ের কোল ঘেঁষে বসে পাখি। পরমা হেসে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে রে, কিছু বলবি আমায়? মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খুব কান্না পায় পাখির। কত ভুল ভেবেছে মাকে। ঠিক ভাববে কি, মায়ের কথা ও জানতোই বা কতটুকু? আসলে এটাই সত্যি। যে মায়েরা আমাদের জন্য এত ভাবে, তাদের মনের খবর জানার, তাদের না বলতে পারা কষ্ট শোনার, কতটুকু চেষ্টা করি আমরা? ভাবি, মা মানেই একটা একতরফা দাবি। অনেকটা জোরজুলুম, অনেকটা স্বার্থপরতা। মা মানেই একটা চূড়ান্ত আদর্শ। যার ভুল হওয়াই উচিত নয়। আমরা ভুলে যাই মায়েরাও মানুষ। তাদেরও কান্না পায়। কান্না পেলে তারাও একটা কাঁধ খোঁজে। মন ভিজিয়ে চান হবার জন্য।
আজ সব বুঝতে পেরেছে পাখি। মায়ের গলা জড়িয়ে সে বলে, ঠিক, ভুল তুমি যেমনই হও মা, আমি তোমার পাশেই থাকব সবসময়। আর হ্যাঁ, শাহরুখ খান নয়, আমারও না আঙ্কেলের মত জীবনসঙ্গীই পছন্দ। রিল হিরো নয়, রিয়েল হিরো টাইপ। আমাকে কাঁদতেই দেবে না সে। দুহাতে আগলে ভালো রাখবে শর্তহীন ভালোবেসে।
পরমা হেসে বলে আমার পাগলী মেয়েটা তো দেখছি বড় হয়ে গেছে কদিনেই। এবার পাত্র পাত্রী কলামটা দেখতে হবে রোজ। আর তীর্থকেও বলতে হবে খুঁজে পেতে ওর একটা জুনিয়র ভার্সন আবিষ্কার করতে, আমার মেয়ের মুখের এই লাখ টাকার হাসিটা বজায় রাখার জন্য, কি বল!!
সৌজন্যে – প্রতিলিপি






