অনিন্দিতা :-একটা লাল টুকটুকে ব্যালেরিনা শ্যু আমার পছন্দ হয়েছে মা| বাবাকে বল না কিনে দিতে! প্রতিবার কিসব ধাব্বা ধাব্বা জুতো কিনে দেয় আমার একদম ভালো লাগে না| আজকাল ওসব কেউ পরে নাকি! পায়ের দিকে তাকিয়ে বন্ধুরা হাসে| মোড়ের মাথার দোকানের কাঁচের শোকেসে দেখলাম| কি সুন্দর দেখতে গো মা|
মেয়ের আলোজ্বলা মুখ দেখে মা প্রমাদ গোনেন| দুপুরবেলা ফাঁকা ঘরে ফিসফিসিয়ে দাম জিজ্ঞেস করেন| কিশোরী কন্যার কাছ থেকে টাকার অঙ্কটা জেনে চিন্তিত গলায় বলেন, বড্ড দাম তো রে! মা জানেন অত টাকা দিয়ে জুতো আসলে বাড়িতে তুলকালাম বেঁধে যাবে| তাঁর স্বামী যা রাগী মানুষ| বৃহৎ সংসারের নীতি অনুযায়ী সবাই এক খাবে, এক পড়বে, একই রকম সাজবে-গুজবে| নিয়মের বেড়াজাল কেটে তার কিশোরী কন্যা বেনিয়ম হতে চাইলেই বা মানছে কে?
কিন্তু কিশোরী মন কি মানতে চায়? রোজ স্কুল থেকে ফেরার পথে লাল টুকটুকে জুতোজোড়া দেখে, মনে হয় জুতো জোড়া যেন তাকে ডেকে বলছে, কবে থেকে তো তোমার অপেক্ষায় বসে আছি, আমাকে নেবে না বুঝি! আর কতদিন অপেক্ষা করব?
দিনে দিনে কন্যার মুখ শুকিয়ে আসে| শুকনো মুখ দেখে মা সবই বুঝতে পারেন কিন্তু উপায় কি! সময়টা তো আর এখনকার নয়, সেই সত্তর দশকের| তখনও প্রিয়া গিন্নি হয়ে ব্রক্ষ্মলোক কাঁপানোর দক্ষতা অর্জন করতে পারেন নি| বড়কর্তাই মুকুটহীন রাজাধিরাজ| দর্পভরে সংসার সিংহাসনে আসীন| বিচারের যাবতীয় ভার তার কাঁধে ন্যস্ত| বাড়ির বাকি রোজগেরে সদস্যরা তুশ্চু প্রজা| আর যৌথ পরিবারের বাচ্চাপার্টি? তাদের অবস্থা নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভাল! বাচ্চারা বোঝেই বা কি? তাদের আবার ইচ্ছে অনিচ্ছে… ওসব শুনতে গেলে তো সংসার লাটে উঠবে!
এদিকে মায়ের মন! যতই রান্নাবান্না ঘরের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে দেন, ততই ওদিকে মন চলে যায়| মেয়েটার শুকনো মুখ তাঁকে শান্তি দেয় না| সাহসে ভর করে অবশেষে তিনি এক কাজ করে বসেন|
চলমান দূরাভাসের নাম তখনও অবধি কেউ শোনে নি| ল্যান্ডফোনে কথা বলাও যথেষ্ট খরচসাপেক্ষ| তাছাড়া কেউ আড়িপাতার ভয় তো রয়েছেই| কিন্তু মেয়ের গোপনে গুমরে মরা মাকে দুঃসাহসী করে তোলে| সময় বুঝে বাপের বাড়িতে ফোন করে বসেন|
ভাগ্য ভাল একমাত্র ভাই ফোনটা তোলে| তিনি যথাসংক্ষেপে বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেন| টাকাটা দিয়ে দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন| কিন্তু ভাই প্রবল বিরক্ত হয়, মেয়েদের এত আহ্লাদ দেওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারে না, যতই যাইহোক সেও তো একজন পুরুষ সমাজের প্রতিভূ| তবুও মাতৃহৃদয় বারংবার অনুরোধ করে মরে, এ জাঁতাকল যে বড্ড কঠিন, সজ্ঞানে পার করা মুশকিল, একবার পার করলে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়| তাঁর শ্বশুরবাড়ি সচ্ছল হলেও উদারতার বড়ই অভাব! তাই ভাই যদি শুধু কিনে আনাটুকু… বোনের এটুকু উপকার কি ভাই করবে না! অনেক মান অভিমানের পথ পেরিয়ে ভাই রাজি হয়| দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায়ান্ধকার হেঁসেলে প্রবেশ করেন জননী, বধূর দায়িত্ব পালনের তাগিদে| বেলা যে বয়ে যায় রাতের আহারের প্রস্তুতি নিতে হবে না! আলতাগোলা দুধে পা ডুবিয়ে এ বাড়ির বধূ হওয়া ইস্তকই তিনি হাসিমুখে হেঁসেলের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন| সংসার বাঁচাতে হলে ছলচাতুরি ছাড়া উপায় কি? বধূর দায়িত্ব, স্ত্রীর কোমলতা, মায়ের ভালোবাসাই যেন তাঁর নারী রূপকে পরিপূর্ণ করেছে|
আলো ফোটে, সন্ধ্যে নামে| দিন কেটে যায় নিজস্ব গতিতে| ভাইয়ের আশায় পথ চেয়ে থাকা এক মাতৃহৃদয় রোজ খুঁজে বেড়ায় প্রার্থিত পায়ের শব্দ| কিশোরী মেয়ের মুখের দিকে তাকানো কঠিন হয়ে ওঠে| এই প্রথমবার মেয়েটা মুখ ফুটে কিছু চাইল কিন্তু উপায় কই! স্বামীকে বলার উপায় নেই, উপায় নেই বেড়ি খোলার! কয়েক বছর বাদে মেয়েটাও হয়ত আরেক সংসারে গিয়ে হেঁসেল ঠেলতে শুরু করবে|অযত্নে বানানো প্রায়ান্ধকার ঘরের মধ্যে জ্বলন্ত উনুনের তাতে পর্বতপ্রমাণ ভারী শিলে পিষে মায়ের মত হয়ত তারও শখ-আহ্লাদগুলোও মরে যাবে আলোবাতাসের অভাবে|
অবশেষে একদিন চেনা পদশব্দ দরজায় থামে| কাজ থামিয়ে ছুটে যায় আকুল মাতৃহৃদয়| সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকেন ভাইয়ের হাতের দিকে| পরম আকাঙ্খিত বস্তুটি কিন্তু চোখে পড়ে না| মুখে কিছুই বলেন না তিনি| এতদূর থেকে ভাই এসেছে, তার খাওয়ার আয়োজনে লেগে পড়েন| কুশল বিনিময়, ষোড়শপচারে খাওয়া-দাওয়া শেষে ভাই বোনের ঘরে আসে| একটু হেসে বলে, অনেক ভেবে দেখলাম দিদি সুকেশিনীকে এত আহ্লাদ দেওয়া ঠিক হবে না| এ বাড়িতে আর কদিন? শ্বশুরবাড়ি তো যেতেই হবে| সেখানে গিয়ে আহ্লাদীপনা করলে জামাইবাবুরই তো বদনাম হবে| মেয়েদের এত প্রশ্রয় দিতে নেই! বুঝলি!
দিদি সব বোঝেন| নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন| সম্পর্কের সুতোগুলো যেন গিঁটের মতো গলায় ফাঁস হয়ে চেপে বসতে থাকে| ছোট থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা ভাইটাকেও ঠিক চিনতে পারে না! বড় হলে বুঝি মানুষ এতটা বদলে যায়! ছোট ভাইটার শখ আহ্লাদ পূরণের জন্য তিনি কি না করেছেন! ভাই দুষ্টুমি করেছে তিনি বাপের হাতে মার খেয়েছেন, ঠাকুমার কাছে অনামুখী, সৃষ্টিছাড়ি… এত মানুষের মরণ হয় তোর হয় না, দু কান ভরে শুনেছেন! তখন ভাই ছোট্ট ছোট্ট হাতে দিদির চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছে, আধো গলায় বলেছে দিদ্দি তুই কানবি না, আমি তোকে ভাওবাসি| দিদিও ছোট্ট ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন|

সূর্য ডোবার পালা সাঙ্গ করে বিদায় নিল ভাই| প্রতিবার বিদায় নেওয়ার সময় সে দেখে দিদির নয়ন অশ্রুসিক্ত, কিন্তু আজ সে নয়ন শুষ্ক| কেন নয়ন অশ্রুহীন, সে খবর নেওয়ার সময় তার হল না| বাবার প্রতিনিধি হয়ে সে আজ দিদির সংসারে এসেছে, এখন তার অনেক দায়িত্ব, সামান্য ভুলচুকে অনেক জটিলতা তৈরি হতে পারে| দিদির ব্যকুল হৃদয়ের যন্ত্রণা উপলব্ধি করার চাইতে সামাজিক আচার বিধি পালন করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ| বিদায় শেষে শুকনো মুখে ঘরে এসে বসতেই মেয়ে যেন কোথা থেকে ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে| মলিন হেসে বলে, লাল টুকটুকে জুতো আমার চাই না মা, সারাজীবন শুধু তোমাকে চাই, এভাবেই আমায় বুকের মাঝে আগলে রেখো| আর কখনো কাউকে কোন অনুরোধ করবে না| না আমার জন্য, না কারুর জন্য| আবেগ ভরে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মা, চোখের জলে ধুয়ে যায় নীরব বঞ্চনার ইতিহাস| অনুভব করেন তাঁর অগোচরে কখন যেন কিশোরী মেয়েটা নারী হয়ে উঠেছে|
সৌজন্যে প্রতিলিপি






