Select Language

[gtranslate]
২৭শে মাঘ, ১৪৩২ মঙ্গলবার ( ১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ )

সারাভারত খেতমজুর ও গ্রামীণ শ্রমজীবি ইউনিয়নের জেলা সম্মেলন খেজুরীতে

সন্ত্রাস রুখেই সমাবেশ হল খেজুরিতে। এখন চাষের সময়। মাঠে ধান, সবজি। খেতমজুরদের এইসময়েই বেশী কাজ। কিন্তু শনিবার বেলা২টা নাগাদ খেজুরির বিদ্যাপীঠ মোড় থেকে কয়েকহাজার খেতমজুর মিছিল করে চলেছেন। লক্ষ্য সমাবেশে যোগ দেওয়া। আসলে জেদ চেপেছিল আগেই।

এদিন সারাভারত খেতমজুর ও গ্রামীণ শ্রমজীবি ইউনিয়ন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তৃতীয় সম্মেলন উপলক্ষে সমাবেশের প্রচার চলছিল খেজুরির বিদ্যাপীঠ, জনকা, বারাতলা, কামারদা, হেঁড়িয়া, কলাগেছিয়া, কুঞ্জপুর সহ বিভিন্ন এলাকায়। কিন্তু সকালের পর থেকে খবর আসে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার গাড়িকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আর বাধা দিচ্ছে কারা? বিজেপি। কোথাও তৃণমূল বিজেপি যৌথভাবে। তৃনমূল ও বিজেপির বক্তব্য এখানে বামপন্থীদের প্রচার, মিছিল চলবেনা।

বামপন্থীদের আটকাতে হবে। এটাই একমাত্র লক্ষ্য এখন পূর্ব মেদিনীপুরে। আর এই কাজে তৃনমূল ও বিজেপি ঐক্যবদ্ধ।

 

তবে সব বাধা ভেঙে হাজার হাজার খেতমজুর জমায়েত হয়ে তৃনমূল আর বিজেপির এমন সন্ত্রাস রুখেছে। সমাবেশ স্থল খেজুরির বিদ্যাপীঠ চালতাতলা থেকে একদিকে হিজলি শরীফ অন্যপ্রান্তে ডাকঘর, বন্দর। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ এই খেজুরি। যেকোনও কিছুতেই এখানকার মানুষজন সেই ঐতিহ্য নষ্ট করতে চায়না। ২০০৭ সাল পরবর্তী সময় থেকে এই খেজুরির মাটি সন্ত্রাসবিদ্ধ হয়েছিল। ২০১১ সালে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকশ বামপন্থী কর্মী আক্রান্ত হয়েছে। ঘরছাড়া, জরিমানা এসব ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। সেই অবস্থা থেকে জোটবদ্ধ হয়েছেন মানুষ। পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। কিন্তু নতুন করে খেজুরি জুড়ে আবারও সন্ত্রাসের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়াস নিয়েছে তৃণমূল। এখন নতুন ভাবে বিজেপির সাথে একত্রিত হয়ে বামপন্থীদের বাধা দিতে চাইছে। এদিন সমাবেশে এই দুর্বৃত্তায়ন সহ রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের বঞ্চনার প্রতিবাদ করেন বক্তারা।

 

খেতমজুর নেতা নিরাপদ সর্দার, কৃষক আন্দোলনের নেতা নিরঞ্জন সিহি, হিমাংশু দাস, প্রতিকুর রহমান, আইনজীবী ফেরদৌস শামিম বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন আশীষ প্রামাণিক। উপস্থিত ছিলেন কৃষকসভার নেতা মহাদেব মাইতি, রামকৃষ্ণ রায়চৌধুরী, চিত্ত দাস, অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি শান্তিপদ দাস, অভ্যর্থনা কমিটির সম্পাদক অশনী পাত্র সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সভায় নিরাপদ সর্দার বলেন “খেতমজুরদের জন্যই জমিতে ফসল হয়। অথচ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত খেতমজুররাই। সঠিক মজুরি মিলছে না। সরকারি প্রকল্প বন্ধ। কিভাবে সংসার চলবে ভাবছেনা কোনও সরকার। কাজ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার খেতমজুর পরিযায়ী শ্রমিক রয়ে অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছে। গ্রামের গরীব খেতমজুরদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য একমাত্র ভরসা সরকারি স্কুল। কিন্তু সরকারের অবহেলায় কয়েকশ স্কুল ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়েছে। একদিকে কাজ নেই অন্যদিকে শিক্ষার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এমন ব্যবস্থার আমদানি করা হচ্ছে যেখানে সমস্ত ক্ষেত্রেই বেসরকারিকরণ একমাত্র পথ। আদালতের নির্দেশ স্বত্বেও একশ দিনের কাজ চালু না করে প্রকল্পের নাম বদলে দিয়ে জি রাম জি রাখা হল। এই প্রকল্পে গরীব মানুষদের কোনও অধিকার থাকবেনা। সরকার তার ইচ্ছামতো কাজ শুরু করবে ইচ্ছামতো মজুরি ঠিক করবে।”

 

নিরঞ্জন সিহি বলেন “খেজুরির মানুষ খেজুরির সন্ত্রাস সম্পর্কে জানেন। এখানকার বহু বামপন্থী মানুষদের ঘরছাড়া করা হয়েছে। কত মামলা দেওয়া হয়েছে। খুন হতে হয়েছে। জরিমানা, লুট এতকিছুর পরেও এখানকার মানুষ লালঝান্ডাকে ভূলে যায়নি। আসলে একশ দিনের কাজ মজুরি এসব নিয়ে কথা বলেনা কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকার। এখন এদের একমাত্র লক্ষ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করা। এর বিরুদ্ধেই লড়াই আমাদের।”

 

সভায় হিমাংশু দাস বলেন “এই খেজুরি জুড়ে এখন লুট চলছে পঞ্চায়েতে। সাধারণ মানুষের অধিকার খর্ব হচ্ছে। স্বাভাবিক সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করছে তৃণমূল ও বিজেপি। আসলে বিপদে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। একশ দিনের কাজ বন্ধ, মজুরি মিলছেনা, ফসলের দাম নেই, কর্মসংস্থান নেই কি চলছে রাজ্যে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব লালঝান্ডার উপর।”

প্রতিকুর রহমান বলেন “এই জেলায় একসময় নিদান ছিল লালঝান্ডার পার্টি করা যাবেনা। তৃণমূলের যিনি এমন হুমকি দিয়েছিলেন তিনি এখন বিজেপির বড় নেতা। উনি নিজের দল ধরে রাখতে পারেননি কিন্তু গ্রামের গরীব মানুষ লাল ঝান্ডা ধরে রেখেছে। বিজেপি বড় বড় কথা বলে এই প্রশ্ন ওদের করতে হবে একশ দিনের কাজ কেন বন্ধ রয়েছে। কেন রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ, সরকারি প্রকল্প, কয়লা, বালি চুরি যারা করল তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছেনা। বুঝতে হবে এই তৃনমূল আসলে আরএসএস এর একটি দল। যারা ভাবছেন এই দুই দল লড়াই করছে। তারা ভূল ভাবছেন। একশ দিনের কাজ চালু করার দাবিতে আদালতে মামলা করেছিল বামপন্থীরা। আদালতের নির্দেশ এল কাজ চালু করতে হবে। চাকরি চুরির বিরুদ্ধে আদালতে লড়াই করেছে বামপন্থীরা। এই তৃণমূল আর বিজেপিকে রুখতে পারে একমাত্র বামপন্থীরা।”

 

সমাবেশ শেষে কমরেড মদন ঘোষ নগরের (বিদ্যাপীঠ চালতাতলা) কমরেড নরুল আলি ও কমরেড রামকুমার মাইতি মঞ্চে সংগঠনের সম্মেলন শুরু হয়। উদ্বোধন করেন নিরাপদ সর্দার। সম্পাদকীয় প্রতিবেদন পেশ করেন হিমাংশু দাস। ২৫টি ব্লকের তিন শতাধিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে ৬৮ জন কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে সভাপতি আশীষ প্রামানিক সম্পাদক হিমাংশু দাস ও কোষাধ্যক্ষ শচীনন্দন কাপ পুনরায় নির্বাচিত হন। সম্মেলনের সমাপ্তি বক্তব্য রাখেন রাজ্য সংগঠনের সভাপতি তুষার ঘোষ। আগামী ২৮ – ২৯ -৩০শে ডিসেম্বর পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসাতে তৃতীয় রাজ্য সম্মেলনে নির্বাচিত ২৯জন প্রতিনিধি সহ পাঁচ জন রাজ্য কমিটির সদস্য উপস্থিত থাকবেন। সম্মেলনে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন রাজ্য নেতৃত্ব রামকৃষ্ণ রায় চৌধুরী, শ্রমিক নেতা সুব্রত পন্ডা, কৃষক নেতা মহাদেব মাইতি এবং ছাত্র নেতা শেখ জাকির হোসেন মল্লিক। অভ্যর্থনা কমিটির সকল সদস্য, সম্পাদক, সভাপতি, কোষাধ্যক্ষ গৌরাঙ্গ উকিল, গণ আন্দোলনের নেতা রত্নেশ্বর দলুই, প্রদীপ মণ্ডল সহ সকল কর্মী, সমর্থক, দরদী, নেতৃত্ব দের সংগ্রামী অভিনন্দন জানিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা কমিটি ।

Related News

Also Read